মনোসামাজিক মাদকাসক্তি মানসিক স্বাস্থ্য

ড্রাগ বা মাদকের প্রভাব

Written by Maya Expert Team

ড্রাগ বা মাদকের অপব্যবহার শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। সবচেয়ে বেশি গৃহীত অবৈধ মাদক দ্রব্যগুলো কি এবং কিভাবে সেগুলো ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়, এ বিষয়ে এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

ক্যানাবিস (ভাং বা সিদ্ধি, গাঁজা, ঘাস, স্কাংক, মারিজুয়ানা)

ক্যানাবিস কি-
ক্যানাবিস বা ভাং হচ্ছে শিথিলকারক ঔষধ যা চেতনাকেও পরিবর্তন করে দেয়। এটি “স্বাভাবিক” হিসেবে ধরে নেয়া হয় কারণ এটি ভাং গাছ থেকে তৈরি করা হয়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এটি নিরাপদ। তামাকের সাথে যুক্ত করে অথবা তামাক ছাড়া বিশেষ পাত্রে নিয়ে ইহা ধূমপানের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। চা’এর মতো পানীয় হিসেবে এটি গ্রহণ করা যায়, অথবা বিস্কুট অথবা কেকের সাথে মিশিয়েও খাওয়া হয়।

ভাং গ্রহণে কি ধরনের অনুভূতি হয়?
ক্যানাবিস বা আফিম জাতীয় মাদক গ্রহণে শিথিল ও আনন্দ বোধ করতে পারেন, কিন্তু কিছু কিছু সময় গ্রহণকারীরা অবসন্ন হয়ে পড়তে পারেন বা দুশ্চিন্তা এবং প্যারানয়াতে ভুগতে পারেন এবং এমনকি মানসিক সমস্যায়ও আক্রান্ত হতে পারেন।

এ জাতীয় মাদকদ্রব্যে শরীরে কি ধরনের প্রভাব পরে?
সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যার পিছনে ক্যানাবিস জড়িত থাকে এবং ধূমপানের সাথে গ্রহণ করলে অ্যাজমার মতো ফুসফুসের রোগ সৃষ্টি হয়। এটি মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ওপর প্রভাব ফেলে, তাই নিয়মিত ব্যবহারে মনোযোগদানে সমস্যা এবং কোন কিছু শেখা বা পড়ালেখা করা কঠিন হয়ে উঠে। নিয়মিত গ্রহণের ফলে ফার্টিলিটিতে নেতিবাচক প্রভাব পরে। এটি সেবনের পর গ্রহণের পর গাড়ি চালানো বিপজ্জনক। তামাকের সাথে মিশিয়ে সেবন করলে হৃদরোগ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।

ক্যানাবিসে আসক্ত হওয়া কি সম্ভব?
হ্যাঁ, মানসিকভাবে এ জাতীয় মাদকে নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া সম্ভব। এবং সেবন করা বন্ধ করে দিলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

কোকেইন (কোকেইন পাউডার, কোক, ক্র্যাক )

কোকেইন কি?
কোকেইনের পাউডার (গুড়া), ফ্রি বেইস ও ক্র্যাক এসব গুলোই হচ্ছে কোকেইনের বিভিন্ন ধরণ এবং উক্ত সব ধরণই হচ্ছে শক্তিশালী উদ্দীপক। ফ্রি বেইস ও ক্র্যাক ধূমপানের মাধ্যমে এবং কোকেইন গুড়ো নাক দিয়ে টেনে নেয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। পাউডার ও ক্র্যাক উভয় ধরনের কোকেইন ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা যায়।

কোকেইন গ্রহণ কি ধরনের অনুভূতি দেয়?
সেবণকারীকে কোকেইন কর্মোদ্দীপনা, আনন্দের অনুভব প্রদান করে এবং পূর্ণজাগ্রত হওয়ারও অনুভূতি দেয়। এটি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এনে দেয় যা ঝুঁকি গ্রহণের অনুপ্রেরণা দেয়। এই প্রভাবগুলো ক্ষণস্থায়ী, তাই অধিক পরিমাণে সেবন করা হয় যার ফলাফল দাঁড়ায় একটি বিশ্রী সমাপ্তি যা সেবনকারীকে বিষন্ন ও অসুস্থ করে তোলে, যা বেশ কিছুদিন স্থায়ী হয়।

স্বাস্থের উপর কোকেইন কিরূপ প্রভাব ফেলে?
কোকেইন অত্যাধিক পরিমাণে গ্রহণের কারনে হৃদপিন্ড ও স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত উদ্দীপিত হয়, তাই যারা কোকেইন সেবন করেন, অধিক পরিমাণে গ্রহণের কারণে তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে অথবা হৃদপিন্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর এর প্রভাবের ফলাফল হতে পারে হৃদযন্ত্রের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া (হার্ট অ্যাটাক)। উচ্চ রক্তচাপ বা ইতোমধ্যে হৃদপিন্ডের সমস্যায় ভুগলে কোকেইন গ্রহণ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। সেবনকারী যদি গর্ভবতী হোন, তাহলে কোকেইন সেবন অনাগত শিশুর ক্ষতির কারণ হবে, এমনকি গর্ভপাত (মিসক্যারেজ) হতে পারে। পূর্বে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত থাকলে, কোকেইন গ্রহণের কারণে সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে। যদি শ্বাসের মাধ্যমে সেবন করা হয়, তাহলে কোকেইনের সেবনের ফলে সময়ের সাথে সাথে নাকের তরুণাস্থি (কার্টিলেজ) ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যদি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে গৃহীত হয়, তাহলে অতিরিক্ত ডোজ বা পরিমাণ গ্রহণের কারণে মৃত্যু হতে পারে বা শরীরের ধমণী ও শিরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যদি সুঁই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নিজেকে এইচআইভি’তে অথবা ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলবেন।

কোকেইনে আসক্ত হওয়া কি সম্ভব?
হ্যাঁ, কোকেইন অত্যন্ত আসক্তিপুর্ণ হতে পারে এবং এর কারণে খুবই শক্তিশালী মানসিক নির্ভরতা সৃষ্টি হয়।

মেফেড্রোন (মিয়োও মিয়োও, মিয়াও মিয়াও, মেফ)

মেফেড্রোন কী?
মেফেড্রোন হচ্ছে অ্যাম্ফিটামিন-জাতীয় শক্তিশালী উদ্দীপক যার কিছু প্রভাব এক্সটেসি এর অনুরূপ হয়ে থাকে। স্পীড অথবা এক্সটেসির মতো এই ড্রাগটিও একদা ইন্টারনেটে বিকল্প ‘বৈধ’ ঔষধ হিসেবে ক্রয়ের জন্য পাওয়া যেত। মেফেড্রোন এবং এ জাতীয় অন্যান্য ক্যাথিনোন বর্তমানে ‘বি’ শ্রেণির ড্রাগ হিসেবে পরিচিত যা নিজের কাছে রাখা ও অন্যের কাছে বিক্রয় করা অবৈধ। মেফেড্রোন হচ্ছে সম্পূর্ণ সাদা অথবা সাদার ন্যায় পাউডার বা গুঁড়া যা সাধারণত নাক দ্বারা টেনে অথবা কাগজে মুড়িয়ে গিলে গ্রহণ করা হয়। কখনো কখনো এটি ইনজেকশন দ্বারাও গ্রহণ করা হয়।

মেফেড্রোন গ্রহণে কী ধরণের অনুভূতি হয়?
এটি সেবণে নিজেকে জাগ্রত, আত্মবিশ্বাসী ও সুখী মনে হয়। তবে এটি সেবনের ফলে কেউ কেউ প্যারানয়েড ও দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হতে পারেন। কিছু কিছু সেবনকারীরা মেফেড্রোন গ্রহণের ফলে বমি হওয়া ও মাথা ব্যথা অনুভব করেন।

মেফেড্রোন শরীরের উপর কী প্রভাব ফেলে?
মেফেড্রোনের কারণে হৃদপিন্ড ও স্নায়ুতন্ত্র অত্যধিক উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এর কারণে অনিদ্রা (ইনসোমোনিয়া) ও অজ্ঞান হওয়া দেখা দিতে পারে, সেই সাথে বিচলিত হওয়া ও হ্যালুসিনেশন হতে পারে। এটা অসংখ্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এক্সটেসি (এমডিএমএ, পিল বা বড়ি, ক্রিস্টাল, ই)

এক্সটেসি কী?
এক্সটেসি হচ্ছে ‘সাইকাডেলিক’ জাতীয় উত্তেজনা সৃষ্টিকারক ড্রাগ যা ট্যাবলেটের আকারে বিক্রয় করা হয়, তবে মাঝে মধ্যে এটি মাড়িতে লাগিয়ে অথবা গুঁড়ো করে নাক দিয়ে টেনে নেয়া হয়। এটি এমডিএমএ বা ‘ক্রিস্টাল’ নামেও পরিচিত।

এক্সটেসি গ্রহণে কী ধরণের অনুভূতি হয়?
এক্সটেসি গ্রহণে সতর্ক, স্নেহময় ও আলাপী ভাব বেড়ে যায়, সেই সাথে সঙ্গীত ও রঙগুলোকে অনেক বেশী তীব্র মনে হয়। এক্সটেসি সেবনের কারণে দুশ্চিন্তা, দ্বিধাগ্রস্ততা, প্যারানয়া এমনকি মানসিক সমস্যাও দেখা দেয়।

এক্সটেসি শরীরের উপর কী প্রভাব ফেলে?
দীর্ঘ সময় ধরে গ্রহণের কারণে স্মৃতিতে সমস্যা, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হতে পারেন। এই জাতীয় মাদক গ্রহণের কারণে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের উপর প্রভাব পড়ে যার ফলে বিপজ্জনকভাবে শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যেতে পারে এবং পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তবে একটি ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন কেননা অতি মাত্রায় তরল পান বিশেষ করে মস্তিষ্কের বিপদ ডেকে আনতে পারে, কারণ এক্সটেসির কারণে শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ মূত্র উৎপাদন করতে পারে না যার ফলে শরীরে তরল আটকে থাকে।

এক্সটেসি কী আসক্তিপূর্ণ?
এক্সটেসিতে আসক্ত হওয়া সম্ভব, কেননা গ্রহণকারীরা এ ড্রাগের উপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এটির প্রতি শরীরের শ্নসিলতা দ্রুত বাড়ে এবং একই প্রভাব পাওয়ার জন্য অধিক থেকে অধিক পরিমাণে গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দেয়।

ইয়াবা (অ্যাম্ফেটামিন, বিলি, হুইজ, স্পীড)

ইয়াবা কী?
অ্যাম্ফেটামিন জাতীয় ড্রাগের চলিত নাম হচ্ছে ইয়াবা এবং এটি একটি উত্তেজক ড্রাগ। এটি সাধারণত সাদাটে অথবা গোলাপি রঙের হয় যা মাড়িতে লাগিয়ে, নাক দিয়ে টেনে অথবা কাগজে মুড়িয়ে গিলে গ্রহণ করা হয়।

ইয়াবা গ্রহণে কী ধরণের অনুভূতি হয়?
ইয়াবা গ্রহণে সতর্ক, আত্মবিশ্বাসী ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ার অনুভূতি হয় এবং ক্ষুধা কমে যায়। তবে এটি গ্রহণের কারণে বিচলিত হওয়া এবং আক্রমণাত্মক অনুভূতি বেড়ে যায় এবং দ্বিধাগ্রস্ততা, প্যারানয়া এমনকি মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। সেই সাথে অত্যধিক পরিমাণে গ্রহণের পরে দীর্ঘ সময় ধরে বিষণ্ণতা ও অলসতা বাড়িয়ে দেয়।

ইয়াবা শরীরের উপর কী প্রভাব ফেলে?
ইয়াবা গ্রহণ হৃদপিন্ডের জন্য বিপদ ডেকে আনে, কেননা এর কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাক হয়। যদি অ্যালকোহলের (মদ) সাথে মিশ্রিত করা হয় অথবা উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি এটি গ্রহণ করেন, তাহলে তা আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। স্পীড ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে গ্রহণ করাও বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কেননা অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণের কারণে মৃত্যু হতে পারে। স্পীড সাধারণত খুবই অবিশুদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং এটি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে গ্রহণের কারণে ধমনী ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে শরীরে রক্ত প্রবাহে গুরুতর সংক্রমণ সৃষ্টি হয়। ইঞ্জেকশন ভাগাভাগি করে ব্যবহারের ফলে হেপাটাইটিস সি এবং এইচআইভি’তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ইয়াবা কী আসক্তিপূর্ণ?
নিয়মিত অ্যাম্ফেটামিন গ্রহণ আসক্তি সৃষ্টি করতে পারে।

About the author

Maya Expert Team