মনোসামাজিক

বাংলাদেশে ইন্টারনেটের প্রভাব

কীভাবে ইন্টারনেট বাংলাদেশের নারীদের নানা সীমাবদ্ধতা অতিক্রমে সাহায্য করছে

বাংলাদেশের নারীদের অবস্থা অনেক বদলেছে। নারীরা সমান অধিকার এবং আরও উন্মুক্ত একটি সমাজের জন্য সংগ্রাম করে গেলেও শিক্ষার দ্বারা ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ আগের চেয়ে বেড়েছে। আমার ধারনা ইন্টারনেট এই পরিবর্তনের একটি মুল চাবিকাঠি।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনি সারা বিশ্বের সব ধরনের মানুষ ও তথ্যের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে সব ধরনের নারীরা এক জায়গায় মিলিত হওয়ার মাধ্যমে তাদের চিন্তাধারা এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারছেন। সমাজ ও নারীদের জন্য এ ধরনের আদান-প্রদানের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে আরও লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে যে, এগুলো কেবলমাত্র প্রাথমিক ফলাফল।

আমরা অনেকেই জানি যে, বাংলাদেশে কীভাবে ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়ছে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে তুলে ধরার জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে, কিন্তু নারীদের উপর এর কী প্রভাব পড়ছে, তারা এটি থেকে কীভাবে লাভবান হতে পারেন তা নিয়ে খুব কম আলোচনা করা হয়। নারীদের মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ৮০,০০,০০০ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে বলে মনে করা হয়, যার মধ্যে ১৫,০০,০০০ নারী রয়েছেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে যা ২০১১ সালে আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে, এবং ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সংখ্যা থেকেও এটি বোঝা যায়।

একটি সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১২ সালের নভেম্বরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৩৩,০০,০০০, এবং প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজন মানুষ ফেসবুকে যোগদান করত বাংলাদেশে। এদের ২৫% হচ্ছে নারী। সারা বিশ্বে দেখা যায় নারীরাই ইন্টারনেটের সর্বোত্তম ব্যবহারকারী।

ফেসবুকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শেরিল স্যান্ডবার্গের মতে নারীরা কেবল ফেসবুক সবচেয়ে বেশি ব্যবহারই করেন না, তারা ম্যাসেজ, আপডেট এবং কমেন্টের মাধ্যমে এর ৬২% এবং ভক্তদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের ৭১% পরিচালনা করেন। ফেসবুকে পুরুষদের চাইতে নারীদের বন্ধু সংখ্যা ৮% বেশি হয় এবং তারা এখানে বেশি সময় ব্যয় করেন। ভিডিওগেম ছেলেরা বেশি খেলে বলে মনে করা হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গেমিং কোম্পানি জিয়াঙ্গার মতে ৬০% গেমার মেয়ে। এমনকি টুইটারও মেয়েরা বেশি টুইট করে বলে মনে করা হয়।

মেয়েরা ডিজিটাল ইকনমিতেও প্রভাব ফেলে – সারা বিশ্বে অনলাইন কেনাকাটায় এবং ওয়েবে কোন পণ্যের খোঁজ খবর নেয়ায় মেয়েরা এগিয়ে আছে। বাংলাদেশে এই চিত্র কতটা ভিন্ন?

maya.com.bd-তে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি যে মেয়েরা অনলাইনে কী পরিমাণে কর্মচঞ্চল থাকে – আমাদের প্রশ্নোত্তর বিভাগ ‘মায়া আপা’-তে মেয়েরা যে পরিমাণ প্রশ্ন পাঠায় এবং তথ্য শেয়ার করে তা উৎসাহব্যঞ্জক এবং লক্ষ্য করার মত একটি বিষয়।

বোঝাই যাচ্ছে যে বাইরের দুনিয়ায় খোলাখুলি ভাবে নিজের কথা বলার চাইতে অনলাইনে আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি ফেসবুকে আমার বন্ধুদেরও পোস্ট ঘেঁটে দেখেছি। আমার ছেলে বন্ধুদের চাইতে মেয়ে বন্ধুরা ফেসবুকে ২০০% বেশি পোস্ট করে থাকেন! ইন্টারনেট সব মেয়েদেরকে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। ইন্টারনেট নারীর ক্ষমতায়নে কী পরিমাণ ভুমিকা রাখছে তা উপেক্ষা করে যাওয়া হয় এবং আমার মতে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন।

নিজের অনুভূতি, মতামত, আবেগ এবং এরকম আরও অনেক কিছু প্রকাশ করার জায়গা তৈরির কারণে বাংলাদেশের মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে যা তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং একই মত ধারন করে এমন অন্য মেয়েদের সাথে যুক্ত হতে পারাটা তাদের জন্য আশ্বাস প্রদায়ক। এমনকি শাহবাগ আন্দলনের সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়েদের ভুমিকা লক্ষ্যনীয়।

আমেরিকা প্রবাসি বাংলাদেশি লেখক আনুশে হোসেইন ফোর্বস মাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ‘‘ফিমেইল ফ্যাক্টর’’ নিয়ে লিখেছেন। উনি দেখিয়েছেন যে ছাত্রী, গৃহবধূ, কর্মজীবী নারী, আন্দোলনকারী নারী এবং মায়েরা শাহবাগ আন্দোলনকে একটি বিশেষ মাত্রা দিয়েছেন এবং আমাদের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।

এর অনেক কিছুই অনলাইন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক না থাকলে সম্ভব হত না। তাহলে মেয়েরা এরপর কোথায় যেতে পারে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নারীরা আরও বড় ভুমিকা পালন করবে এবং বর্তমান অগ্রগতিগুলো যদি এর পূর্বাভাস হয় তাহলে ইন্টারনেটের কারণে মেয়েদের মতামত প্রকাশের বাধাগুলো দিনে দিনে আরও কমে আসবে। নারীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব আরও ন্যায়বিচারপূর্ণ সমাজের দিকে আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং এটি ঘটাতে ইন্টারনেট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে।

 

About the author

Maya Expert Team