অনকোলজি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার

ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কারণসমূহ

ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সেই সাথে যেসব ঝুঁকি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ বলে মনে করা হয়, তাও নির্ণয় করা হয়েছে।

আমাদের শরীর কোটি কোটি ক্ষুদ্র সেল বা কোষ দ্বারা নির্মিত। সাধারণত, এই কোষগুলির জন্ম ও বৃদ্ধি একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। কোনো জায়গায় নতুন কোষ সৃষ্টির প্রয়োজন হলে শুধুমাত্র সেই জায়গাতেই তখন নতুন কোষ সৃষ্টি হয়। ক্যান্সারের ক্ষেত্রে, এই নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিটি ব্যাহত হয় এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে নতুন কোষ সৃষ্টি ও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে, ডিম্বাশয়ের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত ও জন্ম হতে থাকে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এই ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব না হয়, তবে ক্যান্সার নারীর প্রজননতন্ত্র সহ ডিম্বাশয় পার্শ্ববর্তী শরীরের সব অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উচ্চ ঝুঁকির কারণসমূহ

উচ্চ ঝুঁকির কারন সমুহের মধ্যে কিছু কারণের ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না, কিছু কারন আছে যে গুলো পরিবর্তন করা যেতে পারে। যদিও এই কারণসমূহ ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, তবে এই ঝুঁকিসমূহ আপনার মধ্যে না থাকলেও আপনি এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন।

পারিবারিক ইতিহাস

পরিবারের দুই বা ততোধিক নিকটাত্মীয়, যেমন মা, বোন বা মেয়ে যদি ডিম্বাশয় অথবা ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে আপনিও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকবেন।

যদি আপনার আত্মীয়গণ ৫০ বছর বয়সের পূর্বে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে তা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে হয়ে থাকতে পারে। বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ এর মতো ত্রুটিপূর্ণ জিনগুলো ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই জিনগুলো স্তনের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী।

তবে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত আত্মীয় থাকার মানে এই নয় যে পরিবারের মধ্যে ত্রুটিগত জিন নিশ্চিতভাবে থাকবেই। তিনি অন্য কোনভাবেও এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ১০টি কেস বা ঘটনার মধ্যে ১টি কেস ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে হয়ে থাকে বলে ধারণ করা হয়।

আপনি ত্রুটিপূর্ণ জিনের অধিকারী হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকবেন, যদিঃ

যেকোন বয়সে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া একজন নিকটাত্মীয় (মা, মেয়ে অথবা বোন) এবং স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া কমপক্ষে ২ জন নিকটাত্মীয় থাকা। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকা আত্মীয় পরিবারের একই দিকে থাকতে হবে তাদের গড় বয়স ৫০ বছরের কম হতে হবে।

যেকোন বয়সে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া একজন নিকটাত্মীয় এবং ৪০ বছরের কম বয়সী ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত অন্তত একজন নিকটাত্মীয় থাকা। এই আত্মীয়গণ পরিবারের একই দিকে থাকতে হবে।

পারিবারিক ইতিহাসের কারণে আপনি যদি ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন বলে মনে করে থাকেন, তাহলে আপনার গাইনোকোলোজিস্টের (স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ) সাথে কথা বলুন। যদি আপনি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন, তাহলে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে আল্ট্রাসাউন্ড টেস্ট বা সিএ১২৫ টেস্ট করানোর জন্য ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন।

বয়স

ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বয়সের সাথে বাড়তে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেনোপজ (রজোবন্ধ) শুরু হওয়ার পর ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। ১০টি কেসের মধ্যে ৮টি কেসের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে পঞ্চাশোর্ধ মহিলারা বেশি আক্রান্ত হোন।

ফার্টিলিটি ও ডিম্বাণু অবমুক্ত হওয়া

প্রজননতন্ত্রে প্রত্যেক বার ডিম্বাণু অবমুক্ত হওয়ার সময় ডিম্বস্ফোটনের জন্য ডিম্বাশয়ের পৃষ্ঠ ভেঙ্গে যায়। এই প্রক্রিয়াটির সময় ডিম্বাশয়ের কিছু অংশ ভেঙ্গে যায় যার সংস্কার করার প্রয়োজন হয়। এই অব্যাহত সংস্কার প্রক্রিয়ার কারনে সেখানে অস্বাভাবিক কোষ জন্ম নেয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

এই কারণে যদি আপনি জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল খেয়ে থাকেন, বেশিবার গর্ভধারণ করেন কিংবা দীর্ঘদিন শিশুকে স্তন্যপান করান, তাহলে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায় কারণ ঐ সময়ে ডিম্বাণু অবমুক্ত হওয়া বন্ধ থাকে। অপরপক্ষে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব মহিলা বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন তারা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হতে পারেন, কেননা এইসব চিকিৎসায় ডিম্বাণু বেশি পরিমাণে মুক্ত হতে পারে। তবে অন্যান্য কিছু গবেষণায় এই যুক্তিকে ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের কারণ হিসেবে গণ্য করেনি।

হরমোন রিপ্লেস্মেন্ট থেরাপী (এইচআরটি)/ হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা

যেসব মহিলা হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন, তারা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কম ঝুঁকিতে থাকেন। তবে, এই চিকিৎসা গ্রহণ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে কখনো হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা গ্রহণ করেননি এমন মহিলার ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির হার ও চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এমন মহিলার ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির হার ৫ বছর পরে সমান হয়ে যায়।

এন্ডোমেট্রিওসিস

এন্ডোমেট্রিওসিস ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এন্ডোমেট্রিওসিস একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা যাতে জরায়ুর আবরণকারী কোষ জরায়ুর বাইরে শরীরের অন্য জায়গায় বৃদ্ধি হয়। অন্য জায়গায় বৃদ্ধি পাওয়া এন্ডোমেট্রিয়াল কোষগুলো জরায়ুতে অবস্থানের মতোই কাজ করে থাকে, তাই মাসিকের সময় যেরূপ ঘন ও রক্তপাত হয়ে থাকে তা শরীরের অন্য জায়গায় হয়ে থাকে। কিন্তু এই এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যুগুলোর শরীরের বাইরে কোনোভাবে বের হতে পারে না এবং তা ঐ জায়গায় আটকে থেকে ব্যথা, ফুলে যাওয়া ও রক্তপাতের সৃষ্টি করে। যদি ডিম্বাশয়ে এন্ডোমেট্রিওসিস হয়ে থাকে, তবে তা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

About the author

Maya Expert Team