অনকোলজি

ক্যান্সার নিয়ে মিথ্যা তথ্য

ক্যান্সার ! ছয় বর্ণের একটি শব্দ যা মানুষের মনে ভীতির সৃষ্টি করে।

যদিও ক্যান্সার বিশ্বে অসুস্থতার মাঝে একটি সর্বাপেক্ষা পরিচিত অসুখ, তবে ক্যান্সার কে নিয়ে রয়েছে অনেক মিথ্যা তথ্য । বাংলাদেশে আমরা ডাক্তারদের থেকে শুনে থাকি যে উভয় পুরুষ এবং মহিলা তাদের নিজের দেহ সম্বন্ধে খুব অল্প জানে। তাই তারা ক্যান্সারের একদম শেষ দশাতে চিকিৎসা পেতে চেষ্টা করে । তাই অস্বাভাবিকতা যদি আগে সনাক্ত করা যায় তবে তীব্রতা এড়িয়ে চলা সম্ভব। চিকিৎসা-শাস্ত্রগত‌ জীবনবীমা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য যত্নের অভাবের কারনে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা পরিবারের একটি প্রধান বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের মানুষ দেখা যায় ডাক্তারের পরামর্শ নিতে চায়না বিশেষ করে ক্যান্সারের ক্ষেত্রে। আরেকটি কারনে মহিলারা ডাক্তারের পরামর্শ নিতে চায়না প্রথমত মহিলা ডাক্তারের অভাব এবং দ্বিতীয়ত তাদের দেহের গোপন অংশের কথা জানাতে সংকচবোধ করে। ফলে দেখা যায় যে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে নানা ভুল রোগ নির্নয়, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা রোগকে আরো খারাপ পর্যায়ে নিয়ে যায়

৪ ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ক্যান্সার দিবস এবং এই বছর, এই দিবসের স্লোগান ‘’ ক্যান্সার নিয়ে সকল ভুল ধারনা দূর করা ‘’ আরও বেশি তথ্য, আরও বেশি কথোপকথন, আরও বেশি জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা একত্রে ্ক্যান্সার জয় করতে পারি ! Maya Apa Ki Bole ( মায়া আপা কি বলে) এর ডাক্তারদের অভিজ্ঞতা ভিত্তিক, আমরা ক্যান্সার নিয়ে নানা ভুল ধারনার একটি সেট একত্র করা হয়েছে । এই ভুল ধারনাগুলো নিয়ে আপনাদের মতামত আমাদের কাছে প্রকাশ করুন। আপনি কি কোন ভুল ধারনা করেছেন? সেগুলো কি ছিল? আমাদেরকে বলুন।এই রোগ প্রতিরোধ করতে আমাদের সাথে যোগদান করুন ।

ভুল ধারনা ১ – তরুন দের ক্যান্সার হয় না

সত্য এই যে ১৮ বছরের নিচের মানুষদের যে ক্যান্সার হয় তা খুব ই ভয়াবহ। ২২০ রকম ক্যান্সার অনেক অল্পবয়স্ক শিশুদের প্রভাবিত করতে পারে। যদিও ক্যান্সার কিশোরদের মাঝে বিরল, প্রস্টেট ক্যান্সার এবং osteosarcoma ( অস্টিওসারকোমা) এর মত কতিপয় ক্যান্সার আছে যেগুলো অল্পবয়স্কদের প্রভাবিত করে। এ জন্য ফোলা গ্রন্থি, দুর্বলতা, জ্বর, ওজন হ্রাস, ব্যথাএবং ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত নয়। যদি আপনার শিশু অথবা কিশোর হঠাৎ করে মূর্ছা যায়, মারাত্মক মাথা ব্যাথা, ঘনঘন বমি অথবা যদি আপনি আপনার সন্তানের চোখে যেকোন পরিবর্তন লক্ষ্য করেন দেখেন অথবা তার হাটায় বা চলাফেরায় পরিবর্তন দেখেন তবে অবশ্যই একজন শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে শীঘ্রই যেতে হবে

আমাদের দেশের তরুন সমাজ এমনকি সারা বিশ্বের তরুণগণ এমনভাবে জীবনযাপন করে যেন তাদের সিদ্ধান্ত কখনোই তাদের শরীরের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবেনা। একজন ২০ বছরের তরুন ইচ্ছামত ধূমপান, খাওয়াদাওয়া করে। যদিও তারা সবাই জানে যা এই জীবনধারা বদল করলে ক্যান্সার রোধ করা সম্ভব

ধূমপান ত্যাগ করুন

খাবার তালিকায় শাক সব্জির পরিমান বৃদ্ধি করুন এবং দিনে অন্তত ৫ বার ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

স্বাস্থ্যচর্চা

নিয়মিত ব্যায়াম স্বাস্থ্যসম্মত ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে । ওজন হারাতে চেষ্টা করা ভালো , কিন্তু এইটি আরও বেশি খারাপ যদি আপনি না খেয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করেন ।

সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এইটি আপনার ত্বক উজ্জ্বল রাখার চেয়ে গুরুত্বপুর্ন । এইটি নিয়ে একটি ভুল ধারনা আছে যে গায়ের রঙ কালো হলে ক্যান্সার হয় না। যে কারো ত্বক এ ক্যান্সার হতে পারে। আপনার ত্বক প্রতিরক্ষা করতে সান্সক্রিন ব্যবহার করুন। (বিশ্বের একটি প্রাকৃতিক সান্সক্রিন কোনটি ? কোন ধারনা?)

ভুল ধারনা ২ – ক্যান্সার বৈকল্পিক চিকিৎসার মধ্যে ভালো করা সম্ভব

আপনি কি ১০০% সমস্যা ব্যতীত ক্যান্সারের চিকিৎসার নানা বিজ্ঞাপন টেলিভিশনে দেখেছেন? এবং পোস্টার ও রয়েছে নানা অলৌকিক ঘটনা দিয়ে ক্যান্সার নির্মুলের। হাজারো রোগী মাস অথবা বছর সঠিক চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে না গিয়ে অন্যান্য যেকোন বৈকল্পিক চিকিৎসা যেমন হোমিওপ্যাথিক, অথবা আয়ুর্ভেদিক চিকিৎসা নেয় । যার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। রোগী প্রায়শই বিকল্প কৌশলে খরচ করার পরে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের কাছে খুব দেরিতেতে উপস্থিত হয়। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবের দরুন, টিউমার বিশাল মাপের দিকে প্রায়শই বৃদ্ধি পায় অথবা প্রসারিত হয়ে। অনেক মহিলা প্রথম বার স্তন ক্যান্সার রোগনির্ণয় করার পরে ও সঠিক চিকিৎসা নেয় না বরং ৩ অথবা ৪ টি টিউমার \ আবির্ভূত হবার পর অপারেশন করতে রাজী হয়। কারণ তারা শল্যবিদ্যার/ অপারেশন বাদে বৈকল্পিক চিকিৎসা বেছে নিয়েছিল।

ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি অথবা যেকোন অপারেশন সবই অনেক বছর ধরে ডাক্তারদের নিরলস গবেষণার ফল। এই চিকিৎসায় নানা পার্শবপ্রতিক্রিয়া আছে ঠিকই তবে চিকিৎসার পরে রোগীরা ভাল ফল ভোগ করছে। এইসব পার্শবপ্রতিক্রিয়ার ও সমাধান রয়েছে। যেমন কেমোথেরাপি দিলে বমি বমি ভাব হয় তাই রোগী কে অবশ্যই বমির ওষুধ দেওয়া হয়। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় তারা জানেন ই না কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে তাই কোন পুর্ব প্রস্তুতি নিতে পারেন না। তাছাড়া এই চিকিৎসার কোন সফলতার খবর ও দেখা যায়না। তাই যথাযথ চিকিৎসা বাদ দিয়ে অন্য পদ্ধতিতে সময় ব্যয় না করাই ভালো । কারন আপনার সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং সঠিক চিকিৎসা ই পারে ক্যান্সার কে পরাজিত করতে

ভুল ধারনা ৩ – ক্যান্সারের কথা শুনব না, ক্যানসারের কথা বলব না, কোন ক্যান্সার দেখব না

আমাদের দেশে মানুষদের মাঝে ক্যান্সারের নানা অক্ষণ দেখা দেওয়ার পরেও তারা ডাক্তারের কাছে যেতে বিলম্ব করে। বিশেষ করে মহিলারা তাদের স্তনে অনেক বড় লাম্প থাকা স্বত্বেও ডাক্তার দেখান না। অথবা যদি তাদের মিলনের পর রক্তপাত হয় যেটি জরায়ু মুখ ক্যান্সারের প্রধান লক্ষণ তারপর ও সংকোচ বোধের কারনে তারা ডাক্তার দেখান না। আমরা নিশ্চয়ই অনেককেই বলতে শুনেছি যে ,’’ বর্তমান প্রজন্ম বেশি পড়ে , বেশি বোঝে ‘’

আমরা বিশ্বাস করি যে আমরা যদি ক্যান্সার নিয়ে আলোচনা না করি তবে আমরা ক্যান্সার থেকে দূরে থাকতে পারব । তাই আমরা সঠিক উৎস থেকে ক্যান্সার নিয়ে জানতে চাইনা। এমনকি কেউ আমাদের ক্যান্সার নিয়ে বোঝাতে আসলে আমরা তা শুনিনা কারন এটা খুব ই দুঃখের একটা বিষয়।

এটাই আমরা ভুল করি। ক্যান্সার সম্পর্কে জানাটা খূবই জরুরি। যত তাড়াতাড়ি ক্যান্সার নিয়ে জানা যাবে তত তাড়াতাড়ি সঠিক চিকিৎসা নেওয়া যাবে। এভাবে আমরা নিজেদের এবং আমাদের কাছের মানুষদের ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন করতে পারি এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারি

ভুল ধারনা ৪ – ক্যান্সার হলে মৃত্যু অনিবার্য

বাংলাদেশ পরিসংখান অনুসারে, ক্যান্সার মৄত্যুর ৬ষ্ঠ কারন। এবং এতে মৃত্যুর ঝুকি ৭,৫% (২০০৫) থেকে ১৩% (২০৩০) হবার সম্ভাবনা আছে। ক্যান্সারের ফলে মৃত্যু ঘটছে তবে এই না যে সব ক্যান্সার রোগীদেরই মৃত্যু হচ্ছে । ক্যান্সার দ্রুত সনাক্ত করা গেলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। নতুন নতুন ওষুধ, উন্নত চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত পরীক্ষা করার সুযোগ ক্যান্সার চিকিৎসাকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে। ক্যান্সার ধরা পরার পর ও তাই অনেক মানুষ সুস্থ্য জীবন ধারন করছে

ক্যান্সার হলে অবশ্যই আশাহত হওয়া যাবেনা বরং তৎপর এবং আশাবাদী হতে হবে, যদিও এটা খুবি কঠিন একটা ব্যাপার। তবে মনে রাখতে হবে ক্যান্সার হলেই সবাই মারা যায়না। এমন অনেকে রয়েছেন যারা ক্যান্সার জয় করেছেন এবং ভালো আছেন । এখন অনেক প্রতিষ্ঠান ক্যান্সার রোগী দের জন্য টাকা যোগাড় করছেন, তাদের নিয়ে নানা সংগঠন তৈরি করছেন ।

আমরা হয়তোবা ক্যান্সার প্রতিকার করতে পারবনা কিন্তু তাই বলে আমরা ক্যান্সার নিয়ে কথা বলবনা তা নয় । এই বছরের ক্যান্সার দিবসে তাই আপানারা আমাদের ক্যান্সার নিয়ে ভুল ধারনা ঝেড়ে ফেলার মুহুর্ত গুলো আমাদের জানান এবং এটি কিভাবে আপনাকে এবং আপনার পরিচিত মানুষদের আরো বেশি সচেতন করেছে তা জানান।

About the author

Maya Expert Team