মনোসামাজিক

বডি ইমেজ – আমাদের চিন্তাধারা, ধারণা এবং সমাজ

Written by Maya Expert Team

শারীরিক গঠন ও চেহারার ব্যাপারে কথা বলা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা যেখানেই যাই না কেন, যার সাথেই কথা বলি না কেন, আমাদের কেমন দেখাচ্ছে সেই ব্যাপারটি কোন না কোন ভাবে উঠে আসেই – আমাদেরকে কি আজ ক্লান্ত বা চনমনে দেখাচ্ছে? মোটা বা শুকনো মনে হচ্ছে? কাল বা ফর্সা লাগছে? খুশী মনে হচ্ছে? বিষণ্ণ দেখাচ্ছে? – এই তালিকার শেষ নেই। এক দিকে মিডিয়া আমাদেরকে বলে দেওয়ার চেষ্টা করে শারীরিক গঠন কেমন হওয়া উচিত – তারই সাথে সাথে আমদের পরিবার-পরিজনও প্রত্যাশা করে যে সমাজ যা স্বাভাবিক, সৌন্দর মনে করে আমরা তার সাথে তাল মিলিয়ে চলবো। শীঘ্রই তখন আমাদের মনে কিছু চিন্তাধারা গেঁথে যেতে থাকে – আমরা মেনে নেই যে জীবনে সুখী হতে চাইলে, সমাজে স্বীকৃতি পেতে চাইলে আমাদের শারীরিক গঠন ও চেহারা সমাজের বেধে দেওয়া গণ্ডির বাইরে কিছুই হতে পারবে না। ইতিবাচক “বডি ইমেজ” যেখানে আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, নেতিবাচক “বডি ইমেজ” যার বহুলতাই বেশী, আমাদের জীবনে এনে দিতে পারে খাদ্যাভাসের বিশৃঙ্খলা, মানসিক বিপর্যয় এবং সম্পূর্ণরূপে একটি অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা।

তবে তারপরও প্রশ্ন রয়েই যায় – আপনার বান্ধবী যদি একটার-পর-একটা মিষ্টি খেয়েই যেতে থাকে তাহলে কি তাকে আপনি এই ব্যাপারে কিছুই বলবেন না, এবং তার স্বাস্থ্য নষ্ট করতে দিবেন? আপনার কোন ভাই যদি আলুলায়িত ধাঁচে জীবনযাপন করে, এই ব্যাপারে কি আপনি তাকে বকাঝকা করবেন না? শারীরিক গঠন ও চিত্রর ব্যাপারে যখন কথা বলা হবে, তা কি সবসময়ই নেতিবাচক হতে হবে? আমরা কি এমন কোন ইতিবাচক “বডি ইমেজ” এর চিন্তাধারা লালন করতে পারিনা যেখানে ওজন কমানোর ঔষধ ও রং ফর্সাকারী পণ্যের কোন ভুমিকা থাকবে না? আমরা কি সব রকম শারীরিক গঠন ও চেহারা স্বাভাবিক মেনে নিয়ে সুস্বাস্থ্যের পথে অগ্রসর হতে পারি না?

আমাদের বড় একটি সমস্যা হচ্ছে আমরা কখনই আমাদের নিজেদেরকে নিখুঁত ভাবতে পারি না। এমনকি এ সমস্যাটা নাকি সে ব্যক্তিটিও উপলব্ধি করেন যার সৌন্দর্য্যের মুগ্ধ ভক্ত আছে লাখ লাখ। অথচ নিজেকে নিঁখুত করতেই আমাদের যত তোড়জোড়। আর এর জন্যই নিজের সুস্বাস্থ্যের চেয়ে শারীরিক গঠন ও রং নিয়ে আমাদের যত মাথাব্যাথা। কেউ নিজেকে বেশি ফর্সা তো কেউ নিজেকে বেশি কালো, কেউ নিজেকে বেশি লম্বা তো কেউ নিজেকে একটু বেশিই খাটো বলে ভেবে বসে। আমাদের শারীরিক কাঠামোর এমন অসংখ্য দিক নিয়ে নানা ক্ষোভ আমাদের মাঝে দানা বাঁধতে থাকে। যা ধীরে ধীরে আমাদের আরো শারীরিক ও মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়। কেননা একপর্যায়ে নিজেকে নিয়ে আমাদের বেশিই ভাবা শুরু হয়। পরিবর্তন হয় খাদ্যাভাসের এবং সে সাথে পরিবর্তন হয় চিন্তাভাবনার।

আর এ পরিবর্তন অধিকাংশক্ষেত্রেই ব্যক্তির জীবনে আস্বাভাবিক প্রভাব বয়ে নিয়ে আসে। এর প্রধান একটি নেতিবাচক প্রভাব হচ্ছে খাদ্যাভাসের বিশৃঙ্খলা (Eating Disorder)। খাদ্যাভাস বিশৃঙ্খলা হচ্ছে মূলত একধরণের মানসিক দুর্বলতা যা একধনের ব্যাধিও বটে। এ ব্যাধির প্রধান একটি ধরণ হচ্ছে ক্ষুধাহীনতা। ব্যাক্তি তার খাবার পরিমান কমাতে কমাতে এক সময় ক্ষুধাহীনতায় ভুগতে থাকে। কেননা ব্যক্তি একপর্যায়ে তার খাবার ও ওজন নিয়ে এতটাই চিন্তিত হয়ে পড়ে যে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। যথাসময়ে এর উপযুক্ত চিকিৎসা না করালে ব্যাক্তির মেজাজ বিভ্রাট, শারীরিক সমস্যা ইত্যাদির মত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে কেন এ ধরণের সমস্যার উদ্ভব হয়?

একবিংশ শতাব্দীর দোড় গোড়ায় এসেও আজও আমাদের সমাজে এমন কিছু বিষয় রয়ে গিয়েছে যেগুলোকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। কেননা ভাবতে অবাক লাগে যখন দেখা যায় যে একটি মেয়ের সমম্ত যোগ্যাতা থাকার পরও শুধুমাত্র তার শারীরিক সৌন্দর্য্যের বিচার করে দিয়ে তাকে বিয়ের যোগ্য কি অযোগ্য বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে যাকে সমাজ শারীরিক ভাবে সুন্দর ভাবছে তার প্রাপ্তি হল এই যে তাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়া যাবে। শারীরিক সৌন্দর্য্যের বাইরেও যে একটা মেয়ের নিজের অস্তিত্ব বলে কিছু আছে, কোন কিছু করবার সামর্থ্য থাকতে পারে সে বিষটা সমাজ খুব কমই আমলে নেয়। আজও এ সমাজ শারীরিক সৌন্দর্য্যকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। ব্যক্তির ভেতরকার গুণকে নয়, তার প্রতিভাকে নয়। আর সেজন্যই হয়ত নিজের সৌন্দর্য্য নিয়ে আমাদের এত মাথা ব্যাথা। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নিজের রূপচর্চা নয় বরং নিজের প্রতিভাগুলো বিকশিত করার মাধ্যমেও আমরা যে আমাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারি সে সত্য থেকে আজও আমরা অনেক দূরে।

অবশ্য সমাজে বিদ্যমান এ ধরণের মনোভাবকে টিকিয়ে রাখার পেছনে সামাজিক মিডিয়াগুলোরও একটি বড় হাত রয়েছে। এগুলোতে যে বিজ্ঞাপন গুলো দেখানো হয় তার অধিকাংশই ব্যক্তির শারীরিক সৌন্দর্যকে ঘিড়ে। যেখানে একজনকে অনেক প্রশংসা করা হয় তো অন্যজনকে বিদ্রুপাকারে তুলে ধারা হয। যেটা এক অর্থে মানবাধিকার লঙ্ঘন এর পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু আমরা এগুলো দেখেই অভ্যস্ত এবং এর ফলে সমাজে এগুলো চর্চা করেও অনেক মজা পাই। অথচ কারো শারীরিক কোন সমস্যা নিয়ে মজা করবার আগে এর পেছনে কি কারণ রয়েছে বা এর ফলাফলই বা কি হতে পারে এর কোনটাই আমরা ভেবে দেখবার প্রয়োজন মনে করি না। আমরা ভুলে যাই আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজকে আমরা কোন দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

About the author

Maya Expert Team