হৃদরোগ হৃদরোগ সংক্রান্ত

হৃদরোগের চিকিৎসা

Written by Maya Expert Team

হৃদরোগের চিকিৎসা

করোনারি হার্ট ডিজিজ বা CHD (coronary heart disease) পুরোপুরি ভাল করা যায়না, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে এর উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং এ থেকে আরও জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমানো যায়।


হৃদরোগের কার্যকরী চিকিৎসা

করোনারি হার্ট ডিজিজের (CHD)-এর কার্যকরী চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব। হৃদরোগের কার্যকরী চিকিৎসা বলতে বোঝায়ঃ

● ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম শারীরিক কর্মকাণ্ডের মত যেসব কারনে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় সেগুলোকে সামলানো।

● CHD-এর ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের মধ্যে CHD প্রতিরোধ করা। CHD আছে এমন রোগিদের যেন অসুখটি আরও বেড়ে না যায় সে ব্যবস্থা করা এবং সম্ভাব্য জটিলতার ঝুকি কমানো।

● ভাল একটি হৃদরোগ হাসপাতালে বা ক্লিনিকে এঞ্জিওপ্লাস্টির মাধ্যমে দ্রুত হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা করা।

● দ্রুত হৃদরোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা থাকা।

● হৃদরোগের বিশেষায়িত সেবার (কার্ডিয়াক কেয়ারের) ব্যবস্থা আছে এমন কোন জায়গায় চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ থাকা।


চিকিৎসা সম্বন্ধে ধারনা

জীবনযাত্রার ধরনের পরিবর্তন, ওষুধ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সার্জারির মাধ্যমে CHD কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে CHD-এর উপসর্গগুলো কমানো যায় এবং হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়।


জীবন যাপনের ধরনের পরিবর্তন

যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে আপনার CHD আছে তাহলে জীবন যাত্রার ধরনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে এর পরের স্তরগুলোর ঝুঁকি এড়ানো যায়। উদাহরণ সরূপ, হার্ট অ্যাটাকের পর ধূমপান বন্ধ করে দিলে আপনার আবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি একজন অধূমপায়ীর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির প্রায় সমান হয়ে যাবে। অন্যান্য অভ্যাসের পরিবর্তন, যেমন নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলেও ভবিষ্যতে আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যাবে।


ওষুধ

CHD-এর চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এগুলো দিয়ে হয় রক্তচাপ কমানোর চেষ্টা করা হয় অথবা ধমনী প্রশস্ত করা হয়। কিছু ওষুধের বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, তাই আপনার জন্য সঠিক ওষুধটি খুঁজে বের করতে সময় লাগতে পারে। আপনার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আপনার সাথে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন।

  • অ্যান্টিপ্ল্যাটেলেটস (Antiplatelets)
    অ্যান্টিপ্ল্যাটেলেট হচ্ছে একধরনের ওষুধ যা রক্তের ঘনত্ব কমানোর মাধ্যমে এবং রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। সাধারন অ্যান্টিপ্ল্যাটেলেট ওষুধের মধ্যে রয়েছে স্বল্পমাত্রার অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল (clopidogrel) এবং ট্রিকাগ্রেলর (ticagrelor)।
  • স্টাটিন্স (Statins)
    আপনার রক্তের কোলেস্টেরলর মাত্রা বেশি হলে স্টাটিন্স নামক কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ খেতে দেয়া হতে পারে। এধরনের ওষুধের মধ্যে রয়েছে অ্যাট্রোভ্যাস্টাটিন (atorvastatin), সিম্ভাস্টাটিন (simvastatin) এবং রোসুভাস্টাটিন (rosuvastatin)। এগুলো কোলেস্টেরল তৈরি হওয়া রোধ করে এবং লিভারে এল.ডি.এল রিসেপ্টর (LDL receptors)-এর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয় যা রক্ত থেকে এল.ডি.এল কোলেস্টেরল সরিয়ে দিতে সাহায্য করে। এটি CHD-র অগ্রগতি কমাতে সাহায্য করে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। সব ধরনের স্টাটিন্স সবার জন্য উপযুক্ত নয়, একারনে আপনার জন্য কোনটি উপযুক্ত তা ঠিক করার আগে আলাদা কয়েক ধরনের স্টাটিন্স খেয়ে দেখতে হতে পারে। কিছু স্টাটিন্সের কারনে লিভারের এনজাইমের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত (muscle breakdown) হতে পারে। স্টাটিন্স নেয়া শুরু করার পর ডাক্তার আপনাকে CPK এবং SGPT(ALT)-এর মত কিছু পরীক্ষা করতে দিতে পারেন, যাতে আপনার উপর ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বোঝা যায়।
  • বেটা ব্লকার (Beta-blockers)
    বেটা ব্লকার (যার মধ্যে রয়েছে atenolol, bisoprolol, metoprolol and propranolol) উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা এবং অ্যাঞ্জিনা প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরের বিশেষ ধরনের হরমোনের প্রভাব থামিয়ে দেয়, যার ফলে আপনার হৃদস্পন্দনের গতি কমে যায়, রক্ত চলাচল আরও ভালভাবে হতে পারে। বেটা-ব্লকার হাঁপানি রোগীদেরকে দেয়া হয় না, তাই আপনার হাঁপানি থাকলে ডাক্তার যেন তা অবহিত থাকেন সেটি নিশ্চিত করুন।
  • নাইট্রেটস (Nitrates)
    আপনার রক্তনালীকে প্রসারিত করার জন্য নাইট্রেট ব্যবহার করা হয়। এগুলো বিভিন্ন ধরনের হয়, যেমন ট্যাবলেট এবং স্প্রে। নাইট্রেট আপনার রক্তনালীকে শিথিল করে যার ফলে এগুলো দিয়ে আরও বেশি রক্ত চলাচল করতে পারে। এতে আপনার রক্তচাপ কমে যায় এবং হৃৎপিণ্ডে কোন ধরনের ব্যাথা থাকলে তা কমে যায়। নাইট্রেটের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যেমন মাথা ব্যাথা, মাথা ঘোরা এবং ত্বকে রক্তোচ্ছাস (flushed skin)।
  • ACE ইনহিবিটর
    আঞ্জিওটেন্সিন-কনভার্টিং এনজাইম ইনহিবিটর (angiotensin-converting enzyme inhibitors) বা ACE ইনহিবিটর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এধরনের ওষুধের মধ্যে রয়েছে র‍্যামিপিরিল (ramipril) এবং লিসিনপ্রিল (lisinopril)। এগুলো অ্যাঞ্জিওটেন্সিন-২ (angiotensinII) নামক হরমোনের কাজ থামিয়ে দেয়। অ্যাঞ্জিওটেন্সিন-২ (angiotensin II)-এর কারনে রক্তনালী সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ACE ইনহিবিটর হৃৎপিণ্ডের উপর চাপ কমানোর সাথে সাথে শরীরে রক্ত চলাচলও বাড়িয়ে দেয়। আপনি ACE ইনহিবিটর নেয়ার সময় আপনার রক্ত চাপ পর্যবেক্ষন করা হবে, এবং আপনার কিডনি ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা জানার জন্য নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করা হবে। এই ওষুধের কারনে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনের কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়। আপনাকে ACE ইনহিবিটর দেয়া হলে, ডাক্তারের সাথে কথা না বলে সেটি নেয়া বন্ধ করবেন না।এমনটি আপনার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে। ACE ইনহিবিটরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে শুকনো কাশি হতে পারে এবং মাথা ঘুরতে পারে। অ্যাঞ্জিওটেন্সিন-২ রিসেপ্টর অ্যান্টাগনিস্ট (Angiotensin II receptor antagonists) অ্যাঞ্জিওটেন্সিন-২ রিসেপ্টর অ্যান্টাগনিস্ট ACE ইনহিবটরের মতই কাজ করে। এগুলো অ্যাঞ্জিওটেন্সিন-২- এর কার্যকলাপ থামিয়ে দিয়ে রক্তচাপ কমায়। এর একমাত্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে হালকা মাথা ঘোরা। অ্যাঞ্জিওটেন্সিন-২ রিসেপ্টর অ্যান্টাগনিস্ট ACE ইনহিবিটরের বিকল্প হিসেবে দেয়া হয়।
  • ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার (Calcium channel blockers)
    ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকারও ধমনির গায়ের মাংসপেশিকে শিথিল করে রক্তচাপ কমানোর কাজ করে। এতে ধমনিগুলো প্রসারিত হয়ে যায় এবং রক্তচাপ কমে যায়। এধরনের ওষুধের মধ্যে রয়েছে ভেরাপামিল (verapamil) এবং ডিলিটিয়াজেম (diltiazem)। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হচ্ছে মাথা ব্যাথা এবং মুখে রক্তোচ্ছাস (facial flushing), কিন্তু এগুলোর প্রকোপ খুব কম হয় এবং সময়ের সাথে সাথে কমে যায়।
  • সার্জারি এবং অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি
    আপনার রক্তনালী যদি অ্যাথেরমা নামক চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে যাওয়ার কারনে সঙ্কুচিত হয়, বা ওষুধের মাধ্যমে আপনার শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনিগুলো খুলে দিতে বা প্রতিস্থাপন করতে সার্জারির প্রয়োজন পড়তে পারে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনির চিকিৎসা কিছু পদ্ধতি নিয়ে নিচে আলোচনা করা হল:
  1. করোনারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি (Coronary angioplasty)
    করোনারি অয়াঞ্জিওপ্লাস্টিকে পার্কিউটেনিয়াস করনারি ইন্টারভেন্সন বা PCI (percutaneous coronary intervention) পার্কিউটেনিয়াস ট্রান্সলুমিনাল করোনারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি (percutaneous transluminal coronary angioplasty (PTCA)) বা বেলুন অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বলা হয়। অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি পরিকল্পনা করে বা হঠাৎ করে অবথা অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয়ে পড়লে তাৎক্ষনিক ভাবে করা হতে পারে। করোনারি এঞ্জিওগ্রামের দ্বারা আপনি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি চিকিৎসার উপযুক্ত কিনা তা নির্ধারণ করা হবে। করোনারি এঞ্জিপ্লাস্টি হার্ট অ্যাটাকের সময় তাৎক্ষনিক চিকিৎসা হিসেবেও করা হতে পারে। অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির সময় একটি ছোট বেলুন আপনার ধমনীর ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়, যাতে ভিতরে জমে থাকা চর্বি বাইরে বেরিয়ে আসে। এতে রক্ত চলাচল করতে সুবিধা হয়। ধমনীটিকে খুলে রাখার জন্য ধাতব একটি নল (stent) এর ভিতরে লাগিয়ে দেয়া হয়।
  2. করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফট (Coronary artery bypass graft)
    করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফট বা CABG-কে বাইপাস সার্জারি, হার্ট বাইপাস বা করোনারি আর্টারি বাইপাসও বলা হয়। রোগীর ধমনী সঙ্কুচিত বা বন্ধ হয়ে গেলে এই চিকিৎসাটি দেয়া হয়। আপনি এই চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত কিনা তা ঠিক করতে করোনারি এঞ্জিওগ্রাম করা হবে। এতে বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনী ছাড়িয়ে কোন একটি অংশ এবং এওর্টা (হার্ট থেকে বেরিয়ে আসা প্রধান ধমনী)-এর মধ্যে একটি রক্তনালী লাগিয়ে দেয়া হয়। এতে বন্ধ ধমনীটিকে পাশ কাটিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে।
  3. হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন বা হার্ট ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট (Heart transplant)
    খুব কম ক্ষেত্রেই, যখন হৃৎপিণ্ড খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ওষুধে কাজ হয় না বা বাইপাস গ্রাফট করার মত অবস্থাও থাকে না এবং হৃৎপিণ্ড শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন করতে না পারে না (heart failure), তখন হার্ট ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট বা হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করআর প্রয়োজন হতে পারে। হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন হলে ক্ষতিগ্রস্ত বা অকেজো হৃৎপিণ্ডটি বদলে কারো দান করা একটি সুস্থ হৃৎপিণ্ড লাগিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশে হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন এখনও শুরু হয়নি।

About the author

Maya Expert Team