ওজন বাড়ানো সাধারন স্বাস্থ্য

ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার ৯টি ডাক্তারি কারণ

ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার ৯টি ডাক্তারি কারণ

বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মেদবহুলতা একটি অত্যন্ত প্রকট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনের হাঁটা-চলা ও শারীরিক কাজকর্মে যে পরিমাণ ক্যালরি ব্যয় হয়, তার অধিক পরিমাণ ক্যালরির খাদ্য গ্রহণ ও পান করার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যার উপর ওজন বৃদ্ধি নির্ভর করে। এমনকি নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ করছে না এমন ব্যক্তিরও রোগজনিত কারনে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।

ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী ৯ টি শারীরিক সমস্যা এখানে তুলে ধরা হলোঃ


অল্প সক্রিয় থাইরয়েড
থাইরয়েড গ্রন্থি, যা থেকে উৎপন্ন থাইরয়েড হরমোন শরীরের রাসায়নিক কাজ পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে, তা যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করতে না পারে , তখন তাকে অল্প সক্রিয় থাইরয়েড বা হাইপোথাইরোডিজম বলে। যদিও পুরুষ-মহিলা উভয় ক্ষেত্রেই যেকোন বয়সে অল্প সক্রিয় থাইরয়েডের সমস্যা দেখা যায়, তবে বৃদ্ধ নারীদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। অপর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোনের কারনে মেটাবলিজম অর্থাৎ শরীরের রাসায়নিক কার্যকলাপ মন্থর হয়ে যায় যার ফলশ্রুতিতে ওজন বৃদ্ধি পায়। লেভোথাইরক্সিন নামক হরমোন রিপ্লেসমেন্ট ট্যাবলেট প্রত্যহ গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণত এ সমস্যার চিকিৎসা করা হয়।


ডায়াবেটিসের চিকিৎসা
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব ব্যক্তিরা ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় তা হচ্ছে ওজন বৃদ্ধি। রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন সাহায্য করে। দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিন ডোজের সাথে “মিল” রেখে খাদ্য গ্রহণকারী ব্যক্তিরাও এ সমস্যার আওতামুক্ত নন। দীর্ঘস্থায়ী ডায়াবেটিসে রক্তের শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা যাতে না কমে তা নিশ্চিত করার জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজনের অধিক খাদ্যগ্রহণ করেন – যাকে হাইপোগ্লাইকোমিয়া বা শুধুমাত্র “হাইপো” বলা হয়ে থাকে। হাইপো প্রতিহত করতে অত্যধিক মাত্রায় স্ন্যাকস খাবার ফলে অতিরিক্ত ক্যালরি গৃহীত হয় যা ওজন বৃদ্ধি করে থাকে।

বয়সবৃদ্ধি
বয়স বাড়া বা বৃদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে মানুষ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেশি হারিয়ে ফেলে, যার অন্যতম প্রধান কারণ কাজে অসক্রিয় থাকা। ক্যালরির পরিমাণ হ্রাস করার জন্য পেশি একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, তাই পেশি হারিয়ে ফেলার সাথে সাথে ক্যালরি খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হতে থাকে। যে পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পূর্বে গ্রহণ করা হত সে পরিমাণ খাদ্য যদি বর্তমানেও গ্রহণ করা হয় এবং সেইসাথে কাজ কর্মে সক্রিয় না থাকেন, তাহলে তা ওজন বৃদ্ধির কারণ হবে। সুতরাং পেশী হারিয়ে যাওয়া কমাতে কাজ কর্মে সক্রিয় হতে হবে এবং পেশীর শক্তিবর্ধনকারী ব্যায়াম নিয়মিত করার চেষ্টা করতে হবে।

স্টেরয়েড চিকিৎসা
স্টেরয়েড যা করটিকোস্টোরয়েড নামেও পরিচিত, তা অ্যাজমা, আর্থ্রাইটিস সহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। করটিকোস্টোরয়েড ট্যাবলেট দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহণের কারনে কোন কোন ব্যক্তির ক্ষুধা বেড়ে যায়, যার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়। স্টেরয়েড ডোজ যতই উচ্চ মাত্রায় ও দীর্ঘ মেয়াদে গ্রহণ করা হয়, ততোই ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা জোরদার হয়। কারন স্টেরয়েডের কারনে ক্ষুধা বাড়ে, সেই সাথে মস্তিষ্কের যেসব অংশ দ্বারা ক্ষুধা ও সন্তুষ্টি পরিচালিত হয় সেগুলোর উপরও প্রভাব ফেলে।

স্টেরয়েড চিকিৎসা গ্রহণকালে গৃহীত খাদ্যের পরিমাণের প্রতি বিশেষ সচেতন হলে, তা সাধারণভাবে আপনি যে খাদ্য গ্রহণ করেন তা থেকে অধিক খাদ্য গ্রহণ থেকে আপনাকে বিরত রাখবে। স্টেরয়েড চিকিৎসা বন্ধ বা হ্রাস করে দেয়া কোনো ভালো চিন্তা নয়। যদি ওজন বৃদ্ধির ব্যাপারে দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্যের বিষয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

কুশিং সিনড্রোম
কুশিং সিনড্রোম খুবই বিরল, প্রায় ৫০০০০ ব্যক্তির মাধ্যে ১ জন এ সিনড্রোমে আক্রান্ত হোন। উচ্চ মাত্রায় করটিসল নামক হরমোনের উপস্থিতির কারনে এ সিনড্রোম সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ মেয়াদে স্টেরয়েড চিকিৎসা গ্রহণের প্বার্শ-প্রতিক্রিয়া (আয়াট্রোজেনিক কুশিং সিনড্রোম) হিসেবেও অথবা টিউমারের প্বার্শ-প্রতিক্রিয়া (এনডোজেনাস কুশিং সিনড্রোম) হিসেবেও সমস্যাটি সৃষ্টি হয়ে থাকে। ওজন বৃদ্ধি পাওয়া এর একটি প্রচলিত বা সাধারণ লক্ষণ, বিশেষ করে বুক, মুখ ও পাকস্থলির অংশের ওজন বৃদ্ধি পাওয়া । এ সমস্যার কারণ হচ্ছে করটিসল নামক হরমোন শরীরের উক্ত অংশসমূহে মেদ পুনর্বন্টন করে থাকে। কারনের উপর ভিত্তি করে স্টেরয়েড গ্রহণ কমানো অথবা তা গ্রহণ এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে অথবা টিউমার অপসারণের মাধ্যমে সাধারণত চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

চাপ বা দুশ্চিন্তা ও মন-মেজাজ ভালো না থাকা

চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কিছু

ব্যক্তির ওজন হ্রাস পেতে পারে, আবার কারো কারো ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে। খাদ্য গ্রহণকে অনেক

ব্যক্তি বিষণ্ণতা দূরকারী পদ্ধতি হিসেবে  মনে করেন। এ খাদ্য গ্রহণ চক্র বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে যায়।

কেননা বিষণ্ণতার দরুণ ওজন বৃদ্ধি পেলে তা মনকে আরো বিষণ্ণ করে তুলে, যার ফলে ওজন আরও

বাড়ে। নিজেকে আবেগপূর্ণ হয়ে খাদ্য গ্রহণকারী হিসেবে মনে হলে, খাদ্য গ্রহণ থেকে মনোযোগ সরিয়ে

অন্যান্য পদ্ধতি, যেমন ব্যায়াম বা শখের কাজের প্রতি আগ্রহ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বন্ধুর সাথে

কথা বলা অথবা শরীরকে রিল্যাক্স করার জন্য গোসল করতে পারেন।

ক্লান্তি

গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা দিনে ৯ ঘন্টা বা তার অধিক সময় ঘুমান তাদের থেকে যারা দিনে

৭ ঘন্টারও কম সময় ঘুমান, তাদের মধ্যে ওজন বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি থাকে। এ রকম হওয়ার কারণ

এখনো অস্পষ্ট, তবে যে তত্ত্বটি একে সমর্থন করে তা হচ্ছে- ল্যাপ্টিন নামক রাসায়নিক পদার্থ ঘুম

বিহীন ব্যক্তিদের মধ্যে নিম্ন পরিমাণে ও গ্রেলিন নামক রাসায়নিক পদার্থ  উচ্চ পরিমাণে উপস্থিত

থাকে। ক্ষুধা মিটে যাওয়ার অনুভূতি ল্যাপ্টিন প্রদান করে এবং ক্ষুধা লাগার অনুভূতি গ্রেলিন দ্বিগুণ

করে দেয়। যদি সর্বদা ক্লান্তিবোধ করে থাকেন, তাহলে শরীরের শক্তি সারাদিন বেশি রাখতে উচ্চ

ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার এবং কাজ কম করার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যার অর্থ

দাঁড়ায় শরীরে ক্যালরি খুব কমই হ্রাস পাবে।

তাই প্রত্যহ সঠিক সময় ধরে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।

শরীরে পানি জমে যাওয়া

পানি জমে যাওয়ার কারনে শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়, যার ফলাফল দাঁড়ায় ওজন বৃদ্ধি। শরীরে

সঞ্চিত পানির কারনে এ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা মাসিক শুরুর

আগে পানি জমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

শরীরের একটি বিশেষ অংশ, যেমন গোড়ালিতে অথবা অন্যান্য অংশেও পানি জমে যেতে পারে।

পানি জমে যাওয়া তীব্র আকার ধারণ করলে তার কারনে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। যদি দিনের বেলা

গোড়ালি ফুলে যাওয়া পরিলক্ষিত হয়, রাতে বারবার মূত্রত্যাগের জন্য জাগতে হয় এবং শ্বাসকষ্টের জন্য

নিচু বালিশে শুতে হয়, তাহলে ডাক্তার দেখানো উচিত। কেননা পানি জমে যাওয়ার উক্ত উদাহরণসমূহ

হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যা নির্দেশিত করতে পারে এবং তা পরীক্ষা করানো উচিত।

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিও)

ডিম্বাশয়ের কার্যকলাপে প্রভাব সৃষ্টিকারী পিসিও বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম একটি সাধারন

সমস্যা। বাংলাদেশে পিসিও-তে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীদের অভিযোগ অনিয়মিত মাসিক ও

অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যান্য উপসর্গসমূহ হচ্ছে গর্ভবতী হতে সমস্যা,

মাত্রাধিক লোম ও ওজন বৃদ্ধি । পিসিও-এর সুনির্দিষ্ট কারন অজানা, তবে এ সমস্যা হরমোন

সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়, বিশেষ করে ইনসুলিন ও টেস্টোস্টেরণের উচ্চ মাত্রা। পিসিওতে

আক্রান্ত মহিলাদের ক্ষেত্রে সাধারণত কোমরের অংশে ওজন বৃদ্ধি পায়। ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে

অধিকতর ইনসুলিন উৎপন্ন হয়, যার ফলে আরো ওজন বৃদ্ধি পায়। খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসের পরিবর্তন

ও শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন হ্রাস করা যায় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওরলিস্ট্যাট-এর মতো ঔষধ

গ্রহণে চক্র ভাঙা সম্ভব হয়।

***মায়ার সাথে থাকুন, সুস্থ থাকুন***
শারীরিক, মানসিক, লাইফস্টাইল বিষয়ক সমস্যায় প্রশ্ন করুন Maya অ্যাপ থেকে।
অ্যাপের ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://bit.ly/2WkzaYR

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment