সাধারন স্বাস্থ্য সুস্থতা

ভাবনার বিষয় – কীভাবে খাবার বিষমুক্ত করবেন

Written by Maya Expert Team

ভাবনার বিষয় – কীভাবে খাবার বিষমুক্ত করবেন

আমাদের খাবারে মিশে থাকা বিভিন্ন রকমের বিষ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়ে গেছে। প্রায় সবধরনের খাবারে নিষিদ্ধ কীটনাশক পাওয়া গেছে। কীটনাশক ছাড়াও মাছ, সব্জি, ফলমূলে ফল পাকানোর কেমিকেল এবং ফর্মালিন পাওয়া গেছে। ফর্মালিন, যেটি আমরা আমাদের খাবারে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, ব্যবহার করা হয় মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য। এছাড়াও এটি ল্যাবরেটরি এবং হাসপাতালের মর্গে বিভিন্ন নমুনা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়। শিল্পকারখানা এবং বৈজ্ঞানিক কাজে এই বিষাক্ত পদার্থটির বিভিন্ন রকম ব্যবহার রয়েছে, কিন্তু

বাংলাদেশে এটি মূলত ফলমূল, সব্জি ও মাছ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফর্মালিন ফলের পঁচন বন্ধ করতে পারেনা, তবে সেটি ধীরগতির করে দিতে পারে। আমরা যে তাজা দেখতে ফলমূলগুলো বাসায় নিয়ে আসি সেগুলো, কয়েকদিনের ভেতর পচে না গেলেও তার কোন পুষ্টিগুন থাকেনা। এর ভেতরে থাকা ফর্মালিনের কারনে লিউকেমিয়ার মত ক্যান্সার হতে পারে। আমরা পত্রিকায় যে রিপোর্টগুলো দেখি সেগুলো আমরা বাজার এবং সুপারমার্কেট থেকে যেসব খাবার কিনি তার উপর হয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে যে বেকারি, রেস্টুরেন্ট, এবং ফাস্টফুডের দোকান থেকে যেসব খাবার আমরা কিনি সেগুলোর অবস্থাও একই রকম শোচনীয়। এখন কথা হচ্ছে আমরা তাহলে কী খাব? যেহেতু খাওয়া বন্ধ করতে পারব না, তাই আমরা আমাদের শরীরে এসব বিষের প্রভাব কমানোর জন্য বাড়িতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি।


সব্জি ও ফলমূল পরিষ্কার করা

· আমসহ সব ধরনের ফলের ৩৫%-এর মধ্যে ফর্মালিন পাওয়া গেছে।

· খাওয়ার আগে যে কোন ধরনের ফল একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে একঘণ্টা ডুবিয়ে রাখুন। এতে ফর্মালিন বেরিয়ে যাবে এবং ফলের স্বাদের কোন পরিবর্তন হবে না। মনে রাখবেন এভাবে ফর্মালিনমুক্ত করা ফল তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে হবে, কারন এগুলো ফর্মালিন দেয়া ফলের মত অনেকদিন ধরে ভাল থাকবে না।

· রঙ এবং কেমিকেল দেয়া তরমুজ, যা খেয়ে দু’টি শিশু মারা গেছে, কেনা এড়াতে দোকানেই একটুখানি কেটে দেখে নিন যে তরমুজে অতিরিক্ত রঙ দেয়া আছে কিনা। খেয়ে দেখুন যে কোন রকম কেমিকেল দেয়া মনে হচ্ছে কি না।

· ফলমূল ও শাকসব্জি পানিতে বা হালকা গরম পানি এবং ভিমের মত বাসন মাজার সাবানে ডুবিয়ে রেখে সেগুলোতে থাকা অন্যান্য কীটনাশকের পরিমাণ কমিয়ে নিতে পারেন।

· সাবান ব্যবহার করতে না চাইলে লবণ-পানি (প্রতি কাপ পানির জন্য এক চা-চামচ লবণ) দিয়েও ধুয়ে ফেলতে পারেন। খেয়াল করে পরে সেগুলো ভালভাবে ধুয়ে তা থেকে লবণ-পানি বের করে নেবেন।

· আপনি ভিনেগারের দ্রবনেও (diluted vinegar) ফলমূল ধুয়ে নিতে পারেন। প্রতি তিন কাপ পানির সাথে এক কাপ ভিনেগার মিশিয়ে তা ফল ও সব্জির ওপর স্প্রে করে দিন। এভাবে ত্রিশ মিনিট রেখে সেগুলো ভালভাবে ধুয়ে ফেলুন।

· ফলমূল ও শাকসবজি ধোয়ার জন্য পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মত কিছু জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। এগুলো বেশিরভাগ ফার্মেসি এবং মুদির দোকানে “পটাশ” নামে কিনতে পাওয়া যায়। এক বালতি পানিকে হালকা গোলাপি রঙের করার মত যথেষ্ট পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশিয়ে তাতে ফলমূল এবং সব্জি ৫ মিনিটের জন্য ডুবিয়ে রেখে, সেগুলো খুব ভালভাবে ধুয়ে ফেলুন। বেশি পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মেশালে সেটি ক্ষতিকর হতে পারে তাই পানি যেন হালকা গোলাপি রঙের চাইতে গাঢ় রঙ ধারন না করে তা খেয়াল রাখুন।

· সম্ভব হলে ফলের খোসা ছাড়িয়ে নিন। গাজরের মত সব্জিগুলোর বাইরের আবরন ছিলে ফেলুন।


মাছ
আপনি ঢাকায় থাকলে হয়ত “এখানে ফর্মালিনমুক্ত মাছ পাওয়া যায়” লেখা ট্রাকগুলো দেখে থাকবেন। সুপারমার্কেটগুলোতেও এই বিজ্ঞাপন দেখতে পাবেন। যেহেতু আপনি কখনই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারবেন না, তাই মাছ খাওয়ার আগে নিচের পদ্ধতিগুলো মেনে চলাই ভাল।

· যে কোনো ধরনের মাছ এক ঘণ্টা কলের পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। এতে ৬০% পর্যন্ত ফর্মালিন বের হয়ে যাবে এবং স্বাদের কোন পরিবর্তন হবে না। যদি পানিতে লবণ মিশিয়ে নেন তাহলে মাছ ৯০% পর্যন্ত ফর্মালিনমুক্ত করা সম্ভব।
· ৯০% ভিনেগারের সাথে ১০% পানি মিশিয়ে নিলে ১৫ মিনিটের মাছ পুরোপুরি ফর্মালিনমুক্ত করা সম্ভব, তবে এতে স্বাদের হেরফের হতে পারে।


কেনাকাটার নিয়ম

· স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মৌসুমি ফলমূল খাওয়ার চেষ্টা করুন। আমদানি করা ফল এবং শাকসবজি আকর্ষণীয় হলেও এগুলোতে কীটনাশক এবং ফর্মালিনের মত প্রিজার্ভেটিভ থাকার সম্ভাবনা বেশি।

· নিয়মিত ফর্মালিন পরীক্ষা করা হয় এমন দোকান খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।

· জায়গা থাকলে আপনার নিজের প্রয়োজনীয় সব্জি নিজেই চাষ করতে পারেন। বারান্দা বা ছাদের টবে বিভিন্ন ধরনের শাক সহজে তাড়াতাড়ি জন্মায়। এগুলো সুস্বাদু এবং আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে এগুলো নিরাপদ। আপনার বাচ্চাদেরকে এগুলো লালন-পালনে উৎসাহিত করুন, যাতে তারা নিজেকে এই প্রক্রিয়ার অংশ মনে করে। আপনার শিশু যদি নিজেকে এগুলো বড় করার প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করছে বলে মনে করে, তাহলে তাকে এগুলো খাওয়ানোও সহজ হবে।

· আপনি ছোট শহরে বা মফঃস্বলে থাকলে ফর্মালিনমুক্ত শাকসবজি কেনা আপনার জন্য সহজ হবে। যারা শহরে থাকেন তারা গ্রামের কোন আত্মীয়-সজন বা বন্ধু-বান্ধবকে রাজি করাতে পারেন যেন, তারা প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি পনের দিন পর পর নিজের বা বিশ্বাসযোগ্য কারো ক্ষেত থেকে উপযুক্ত মুল্যের বিনিময়ে সরাসরি আপনাকে সব্জি বা ফল পাঠায়।

· মাছ কেনার সময় আঙ্গুল দিয়ে টিপে পরীক্ষা করে টাটকা এবং আঁশটেগন্ধযুক্ত মাছ কেনার চেষ্টা করুন। জ্যান্ত মাছ কেনাটাও একটা ভাল উপায়। খেয়াল রাখবেন, ফর্মালিন দেয়া মাছ রাবারের মত শক্ত হবে এবং এর চোখ স্বচ্ছ ও কানকো লাল হবে। এ থেকে কোন আঁশটে গন্ধও আপনি পাবেননা এবং এর চারপাশে মাছি উড়তে দেখবেন না। ফর্মালিন মাছি তাড়িয়ে দেয়। ভোক্তা হিসেবে ফর্মালিনমুক্ত জিনিস কিনতে পারাটা আপনার অধিকার, এবং সুপারমার্কেট ও খোলা বাজারের বিক্রেতারা যা বিক্রি করছেন তার জন্য আপনি তাদেরকে দায়ী করতে পারেন। এটি কেবল কোন খারাপ মার্কেট থেকে কেনা কাটা বন্ধ করা বা দোকান বদলে নেয়ার বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেটি নিশ্চিত করার বিষয়। আমরা সচেতন হলে ফর্মালিনমুক্ত খাদ্য যোগান দেয়া ছাড়া উৎপাদক ও বিক্রেতাদের আর কোন উপায় থাকবে না।

খাদ্য বিষয়ে আরও তথ্য এবং চিকিৎসার পরামর্শের জন্য মায়া এন্ড্রয়েড এপ ডাউনলোড করুন এখান থেকে: https://bit.ly/2VVSeZa

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment