টাকের কারণসমূহ

প্রত্যেক রকম টাকেরই নানা ধরনের কারণ থাকতে পারে, যদিও কিছু কিছু টাকের কারণ এখন পর্যন্ত ঠিক স্পষ্ট না।

১)পুরুষালি এবং মেয়েলি টাক

পুরুষালি টাক বংশগত, অর্থাৎ এটা বংশ পরম্পরায় হয়ে থাকে। মেয়েলি টাকের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য কিনা, তা এখনো স্পষ্ট না। মনে করা হয়, পুরুষালি টাকের কারণ হচ্ছে চুলের অতি সংবেদনশীল গ্রন্থিকোষ (ত্বকের ছোট ছিদ্র, যেখান থেকে একটি চুল গজায়)। অন্য দিকে এটি আবার হরমোনের ডিহাইড্রোটেসটোসটেরন (ডিএইচটি)-এর সাথে সম্পর্কিত, যা পুরুষদের হরমোন টেসটোস্টেরন থেকে সৃষ্টি হয়।

শরীরে অতিরিক্ত মাত্রায় ডিএইচটি থাকলে, চুলের গ্রন্থিকোষ এর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়। এতে চুলের পরমাণ কমে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত সময়ের চেয়ে কম সময়ের জন্য চুল গজায়। এই ক্ষেত্রে টাক পড়ার গতি ধীর হয়, কারণ চুলের নানান গ্রন্থিকোষ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আক্রান্ত হয়।

মেয়েলি টাকের কারণ এখনো ঠিক স্পষ্ট নয়। যেসব নারীদের মাসিকচক্র বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের মেয়েলি টাকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কারণ তাদের দেহে মেয়েলি হরমোন কম থাকে।

মাঝে মাঝে হরমোনের তারতম্যের জন্য পিসিওএস (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম) এ আক্রান্ত নারীদের মেয়েলি টাক দেখা দিতে পারে। সন্তান জন্মদানের পরেও নারীদের টাকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি একটি সাধারণ ঘটনা, কারণ গর্ভাবস্থায় নারীদের চুল পড়ার মাত্রা কম যায়। ফলে, স্বাভাবিকভাবে যে চুল পড়ার কথা ছিল, সন্তান জন্মদানের পরে সেই চুলগুলো পড়ে যায়।

২)অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা

অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতার ফলে দেখা দেয়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হচ্ছে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা শরীরকে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

সাধারণত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সংক্রমণের কারণকে আক্রমণ করে, তবে অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটায় এটি চুলের গ্রন্থিকোষকে আক্রান্ত করে। এমনটা কেন ঘটে তা এখনো স্পষ্ট না। আশার কথা হচ্ছে, এতে চুলের গ্রন্থিকোষগুলো স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায় না এবং অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস পর আবার চুল গজায়।

অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দূর্বলতা আছে এরকম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা অধিক হারে দেখা যায়:

  • থাইরয়েডের রোগ: এ অবস্থায় আপনার থাইরয়েড গ্রন্থি আক্রান্ত হয়, যেমন- প্রয়োজনাতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড (হাইপারথাইরয়েডিজম)
  • ডায়াবেটিস: রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজের (চিনির) ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়।
  • ভিটিলিগো: এই অবস্থায় ত্বকে সাদা ছোপের মত দাগ দেখা দেয়।

ডাউন সিনড্রোম আছে এরকম মানুষের ক্ষেত্রে অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা খুব সাধারণ বিষয়। এটি একটি জিনগত সমস্যা, যার ফলে কোন কিছু শিখতে কষ্ট হয় এবং শারীরিক বৃদ্ধিও আক্রান্ত হয়। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত প্রতি ২০ জন মানুষের মধ্যে একজনের অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা আছে।

জিনের কারনে

বংশগত ভাবেই কিছু লোক অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে। নির্দিষ্ট কিছু জিন এই সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটায় আক্রান্ত প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রেই সমস্যাটির কারন বংশগত, অর্থাৎ অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বংশগতি সম্পর্কিত। আপনার পরিবারের কেউ যদি উপরে উল্লেখিত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার দূর্বলতাগুলোর মধ্যে কোন একটি দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে আপনার অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

৩) স্কারিং অ্যালোপেশিয়া

চুলের গ্রন্থিকোষ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেলে স্কারিং অ্যালোপেশিয়া দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এমনটা কেন হয় তা স্পষ্ট নয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে এটা অন্য সমস্যার ফলস্বরূপ দেখা দিতে পারে।

যেসব অবস্থায় স্কারিং অ্যালোপেশিয়া দেখা দিতে পারে:

  • স্ক্যালেরোডার্মা: এই অবস্থায় দেহের যোজক কলা আক্রান্ত হয়, ফলে ত্বক শক্ত, স্ফীত হয়ে যায় এবং চুলকনি দেখা দেয়।
  • লাইক্যান প্ল্যানাস: এটা সংক্রামক নয় এবং এর ফলে শরীরের নানা অংশে চুলকানি দেখা দেয়।
  • ডিস্কয়েড লুপাস: ত্বকের মৃদু প্রদাহ , এর ফলে ত্বকে শল্কাকার দাগ দেখা দেয় এবং টাক পড়ে।
  • ফলিকিউলাইটিস ডিক্যালভানস: একট বিরল প্রকৃতির অ্যালোপেশিয়া, এত সাধারণত পুরুষরা আক্রান্ত হয়। এর ফলে টাক পড়ে এবং আক্রান্ত অংশে দাগ হয়ে যায়।
  • ফ্রন্টাল ফাইব্রোজিং অ্যালোপেশিয়া: এক ধরনের অ্যালোপেশিয়া যা মাসিকচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়া নারীদের আক্রমণ করে। এর ফলে চুলের গ্রন্থিকোষগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং টাক পড়ে। এটা স্থায়ী টাক সৃষ্টি করে।

৪)অ্যানাজেন এফ্লুভিয়াম

অ্যানাজেন এফ্লুভিয়াম সাধারণত ক্যান্সারের চিকিৎসা, বিশেষত কোমোথেরাপির ফলে ঘটে থাকে।তবে, কেমোথেরাপির সব ঔষধ টাক সৃষ্টি করে না এবং কিছু ক্ষেত্রে টাকের পরিমাণ এত কম হয় যে তা বুঝা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের অন্যান্য চিকিৎসা, যেমন- ইমিউনোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি- টাক সৃষ্টি করতে পারে।

৫)টেলোজেন এফ্লুভিয়াম

এটা এক ধরনের অস্থায়ী টাক, যা সাধারণত কোন কিছুর প্রতি আপনার দেহের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়, যেমন:

হরমোনের বিভিন্ন পরিবর্তন, যেমন মহিলাদের গর্ভাবস্থায় ঘটা পরিবর্তনগুলো

  • তীব্র আবেগজাত মানসিক চাপ
  • তীব্র শারীরিক চাপ, যেমন- সন্তান প্রসব করা
  • স্বল্পমেয়াদি অসুস্থতা, যেমন- একটি দু:সহ সংক্রমণ বা একটি অস্ত্রপ্রচার
  • একটি দীর্ঘ মেয়াদি অসুস্থতা, যেমন- ক্যান্সার বা যকৃতের রোগ
  • খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, যেমন- অতিরিক্ত ডায়েটিং

কিছু ঔষধ, যেমন- অ্যান্টিকোয়াগুলান্টাস (এটি রক্তের জমাট বাঁধার ক্ষমতা হ্রাস করে), বা বেটা-ব্লকারস (এটি উচ্চ রক্ত চাপের মত কিছু অবস্থার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়)।

৬)গর্ভাবস্থায় টাক

সাধারণত গর্ভাবস্থায় চুল পড়ার মাত্রা কমে যায়। ফলে গর্ভকালীন সময়ে আপনার অনেক বেশি চুল গজাতে পারে। সন্তান জন্মদানের পর, যে চুলগুলো আগে পড়ার কথা ছিল, সেগুলো পড়া শুরু করে। ফলে, মনে হতে পারে আপনার টাক পড়ছে। কিন্তু, এটা আসলে আপনার গর্ভাবস্থার সময়কার না পড়া চুল, এখন পড়ে যাচ্ছে। যেসব মহিলা পিসিওএস (পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম)-এ ভুগছেন, হরমোনের তারতম্যের জন্য তাদেরও টাক পড়তে পারে।