ত্বকের যত্ন মনোসামাজিক সৌন্দর্য চর্চা

আপনার ত্বকের প্রকৃতি বুঝে নিন

আপনার ত্বকের প্রকৃতি বুঝে নিন
ত্বকের প্রকৃতি বুঝতে গিয়ে, বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীরা তাদের ত্বককে তৈলাক্ত অথবা শুষ্ক হিসেবে চিহ্নিত করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, নারীরা ত্বকের ধরণ সম্পর্কে কসমেটিকের দোকানে কর্মরত বিক্রয়কর্মীর বক্তব্য শোনেন এবং তাদের পরামর্শকৃত পণ্য কিনে থাকেন। ভুল পণ্য কেনার ফলে তা সমস্যা দূর করার চেয়ে বরং আরো বাড়িয়ে দেয়।

প্রথমেই, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কারো ত্বকের ধরণ সবসময় একরকম থাকে না। আবহাওয়া অথবা দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা অনুসারে ত্বক বিভিন্ন ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ত্বকের মান তীব্রভাবে কমিয়ে দিতে পারে এমন অনেক স্বাস্থ্যগত কারণ রয়েছে। যা হতে পারে – গর্ভাবস্থা, হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা, শক্তিশালী ঔষধ ব্যবহার, অধিক খাদ্যগ্রহণ কিংবা ধূমপানের মতো বদভ্যাস। আবহাওয়ার পরিবর্তন, দূষণ এবং প্রখর রোদের কারণেও ত্বকের ক্ষতি হয়ে থাকে। তাই আবহাওয়া ও অন্যান্য বিষয় অনুসারে ত্বকের যত্নেও পরিবর্তন আনা উচিত। প্রত্যেক ২ মাসে ত্বকের ধরণ পরীক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।  ত্বকের প্রকৃতি শনাক্ত করা ও তার প্রাথমিক যত্ন সম্পর্কে জানতে নিচে একটি নির্দেশনা দেওয়া হলো।


১. তৈলাক্ত ত্বক

বৈশিষ্ট্যঃ

  • বড় ও সুস্পষ্ট লোমকূপ থাকা
  • সকালে মুখে তেল চিটচিটে, উজ্জ্বল ভাব থাকা
  • ত্বক খুব সহজেই ফেটে যায়
  • ত্বকে অনেক কালো আঁচিল ও সাদা আঁচিল থাকার সম্ভাবনা থাকে।
  • ১ বা ২ ঘন্টা পর ত্বক তৈলাক্ত হয়ে পড়ে
  • রোদে ত্বক অনেক ঘেমে যায়
  • মেকআপ গলে যায় এবং সহজে জারণ শুরু হয়ে যায়

যেরকম যত্নের প্রয়োজনঃ

  • ত্বকের জন্য তেলমুক্ত পণ্য ব্যবহার করা
  • জেল ভিত্তিক ত্বকের ক্রীম অথবা সিরাম ব্যবহার করা
  • গ্রীষ্মকালে তিন থেকে চার বার মুখ ধোয়া
  • নিয়মিত টোনার ব্যবহার করা
  • লোমকূপ উন্মুক্ত করার জন্য মাঝেমধ্যে গরম পানির ভাপ নেয়া এবং পরে গভীর ত্বক পরিষ্কারের জন্য ফেস ওয়াশ দিয়ে মুখ ধোয়া।
  • পানি ও মাটি ভিত্তিক ফেস প্যাক ব্যবহার করা
  • সপ্তাহে ২ অথবা ৩ বার মুখে স্ক্রাব প্রয়োগ করা


২. মিশ্র ত্বক

বৈশিষ্ট্যঃ

  • ত্বকের কিছু অংশ তৈলাক্ত এবং কিছু অংশ শুষ্ক থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টি- অংশ (কপাল, নাক, থুতনি অংশ) তৈলাক্ত থাকে।
  • গাল, চোখের পার্শ্ববর্তী অংশ এবং মুখ শুষ্ক থাকে।
  • তৈলাক্ত অংশে ব্রণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • লোমকূপ কখনো কখনো তৈলাক্ত ত্বকের মতো সুস্পষ্ট থাকে।

যেরকম যত্নের প্রয়োজনঃ

  • প্রকৃতি অনুসারে ত্বকের বিভিন্ন অংশের যত্ন নেয়া
  • শুধুমাত্র টি- অংশে টোনার ব্যবহার করা
  • মুখের শুষ্ক অংশে লোশন বা ময়েশ্চারাইজার ক্রীম ব্যবহার করা
  • টি- অংশে জেল ভিওিক এবং তেলমুক্ত পণ্য ব্যবহার করা
  • শুধুমাত্র তৈলাক্ত অংশে তেল শোষণকারী ফেসিয়াল মাস্ক ব্যবহার করা

মিশ্রিত ত্বকে কিছু বৈচিত্র থাকে। ত্বকের ধরণ “মিশ্রিত থেকে তৈলাক্ত” কিংবা “মিশ্রিত থেকে শুষ্ক” হতে পারে। প্রথম প্রকারের ত্বকে ক্ষেত্রে কখনো কখনো মুখের সমস্ত অংশের ত্বক উজ্জ্বল ও তেল চিটচিটে মনে হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এরকম হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, টি-অংশের ত্বকও কখনো কখনো শুষ্ক মনে হয়।


৩. স্বাভাবিক ত্বক

বৈশিষ্ট্যঃ

  • ত্বকের সবচেয়ে ভালো ধরণ, খুব তৈলাক্ত বা খুব শুষ্ক নয়
  • সকালে ত্বক তৈলাক্ত মনে হয় না এবং মসৃণ, প্রফুল্ল ও কোমল অনুভূত হয়
  • সুন্দর ও সমান গঠনের সাথে সাথে মসৃণ উপরিভাগ থাকে
  • ছোট লোমকূপ থাকা, যা চোখে পড়া কঠিন
  • ত্বকের যেকোন পণ্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া কম দেখানো

যেরকম যত্নের প্রয়োজনঃ

  • ত্বকের পণ্য অতিরিক্ত ব্যবহার ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি স্বাভাবিক ত্বকের ক্ষতি সাধন করতে পারে। ময়েশ্চারাইজার জাতীয় পণ্য অত্যাধিক ব্যবহারের ফলে অধিক তেল উৎপন্ন হতে পারে, সেইসাথে তেলমুক্ত পণ্য, টোনার অথবা অ্যাসট্রিজেন্টের অতিরিক্ত ব্যবহারও ত্বককে স্তরীভূত ও শুষ্ক করে তোলে।
  • এ ধরণের ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি ভালো সানব্লক ব্যবহার করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
  • ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে আর্দ্র রাখার জন্য নিয়মিত ব্যবহৃত ফেসপ্যাকে মধু যোগ করুন।
  • কখনো কখনো স্বাভাবিক ত্বক কিছুটা ভিন্নধর্মী আচরণ করে থাকে। মাঝে মধ্যে ত্বক তৈলাক্ত মনে হয় এবং কখনো স্বাভাবিক থেকে শুষ্ক মনে হয়। ত্বক যেরকম অবস্থা ধারণ করে সেরকম যত্ন নিন। যদি ত্বক স্বাভাবিক থেকে তৈলাক্ত মনে হয়, তাহলে মাটিযুক্ত ফেসপ্যাক ব্যবহার করুন। আর যদি স্বাভাবিক থেকে শুষ্ক মনে হয়, তাহলে ত্বক আর্দ্র করে তুলতে ভুলবেন না।
  • ত্বককে ঘন ঘন স্ক্রাব করতে যাবেন না।

৪. শুষ্ক ত্বক

বৈশিষ্ট্যঃ

  • অধিকাংশ ত্বক শুষ্ক ও ফ্যাকাশে থাকে।
  • সকাল বেলা ত্বক আঁটোসাঁটো, অত্যন্ত শুষ্ক ও টান টান অনুভূত হয়।
  • লোমকূপ প্রায়ই অদৃশ্য থাকে।
  • কখনো কখনো ত্বকের শুষ্কতার জন্য লাল শিরা-উপশিরা দেখা যায়।
  • ত্বক মসৃণ থাকে না, অধিকাংশ সময় নির্জীব ও অমসৃণ মনে হয়।
  • রোদের সংস্পর্শে ত্বক লালচে হয়ে পড়ে।
  • ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কম থাকে।
  • খুবই কম বয়সে বলিরেখা দেখা দেয়।

যেরকম যত্নের প্রয়োজনঃ

  • প্রতিবার মুখ ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার যুক্ত লোশন অথবা ক্রীম ব্যবহার করুন।
  • দীর্ঘ সময় গরম পানি দিয়ে গোসল করা পরিহার করুন কেননা গরম পানি ত্বকের সুরক্ষা প্রদানকারী তেল নিঃশেষ করে দিয়ে ত্বককে শুষ্ক, আঁটোসাঁটো এবং যন্ত্রণাময় করে দেয়।
  • ত্বকের তেলযুক্ত পণ্য ব্যবহার করুন।
  • ময়েশ্চারাইজার যুক্ত সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করুন।
  • প্রাথমিক পর্যায় থেকে নাইট ক্রীম ব্যবহার করা শুরু করুন।
  • মুখে ময়েশ্চারাইজার না দিয়ে কখনো ঘুমাতে যাবেন না।
  • তেলযুক্ত ফেসপ্যাক ব্যবহার করুন। নিয়মিত ব্যবহৃত ফেসপ্যাকের সাথে অ্যামন্ড তেল যোগ করুন।
  • শুষ্ক ত্বকের জন্য বিশেষভাবে তৈরি টোনার ব্যবহার করুন।

৫. সংবেদনশীল ত্বক

বৈশিষ্ট্যঃ

  • অতিসক্রিয় ত্বক যাতে অধিকাংশ ত্বকের পণ্য প্রয়োগে সহজে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
  • ত্বক সহজেই রোদে পুড়ে যায়, পুড়ে যাওয়া স্থান লালচে দেখায় এবং সহজে সেরে উঠে না।
  • শীতকালে ত্বক খুবই শুষ্ক হয়ে পড়ে, কখনো কখনো শুষ্ক হওয়ার কারণে চুলকানি ও অ্যালার্জি সৃষ্টি হয়।
  • ত্বকের গঠন খুবই পাতলা হয়।
  • ধোয়ার পর ত্বক আঁটোসাঁটো মনে হয়।

যেরকম যত্নের প্রয়োজনঃ

  • কোন পণ্য অথবা খাদ্য গ্রহণ ত্বকে জ্বালা যন্ত্রনার সৃষ্টি করে সেগুলো শনাক্ত করুন এবং সবসময় এসব পণ্য থেকে দূরে রাখুন।
  • হারবাল অর্থাৎ ভেষজ গুণসম্পন্ন পণ্য এবং মেকআপ ব্যবহার করুন।
  • ঔষধি ফেসওয়াস ব্যবহার করুন।
  • সুগন্ধীমুক্ত উল্লেখ করা আছে এমন ত্বকের পণ্য বেছে নিন। কারণ ত্বকের পণ্যে উপস্থিত অন্যান্য উপাদান থেকে সুগন্ধীর কারণে সংবেদনশীল ত্বকে অনেক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
  • সূর্য রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখার জন্য ভালো সানব্লক ব্যবহার করুন।
  • ফেটে যাওয়া বা ফুসকুড়ি যুক্ত ত্বকে কখনোই প্রসাধনী ব্যবহার করবেন না।
  • নতুন পণ্য ব্যবহারের সময় অন্যান্য অংশে প্রয়োগের আগে অবশ্যই ত্বকের ছোট অংশে প্যাচ টেস্ট করুন।
  • টোনার ব্যবহার বাদ দিন কেননা এতে অ্যালকোহল উপস্থিত থাকে যা ত্বককে শুষ্ক করে জ্বালা সৃষ্টি করে।

About the author

Maya Expert Team