উদ্বেগ মনোসামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য

অ্যাংযাইটির চিকিৎসা

Written by Maya Expert Team

অ্যাংযাইটির চিকিৎসা
GAD বা জেনারালাইযড অ্যাংযাইটি ডিজঅর্ডার একটি দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা। তবে বেশ কয়েকপ্রকার চিকিৎসার দ্বারা আপনি উপকৃত হতে পারেন। যেকোন চিকিৎসা শুরু করার আগে আপনার ডাক্তার আপনার সাথে আলোচনা করে নিশ্চিত করবেন যে আপনি বিকল্প সবরকম চিকিৎসা এবং সেগুলোর সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত আছেন। আপনি আপনার চিকিৎসকের সাথে কথা বলে আপনার পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন ধরনের চিকিৎসা সবচেয়ে উপযুক্ত হতে পারে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

বলে রাখা ভাল যে GAD-এর সাথে বিষণ্ণতা বা মাদকাসক্তির মত অন্য কোন সমস্যা থাকলে GAD-এর চিকিৎসা করার আগে সেগুলোর চিকিৎসা করা লাগতে পারে।


প্রাথমিক চিকিৎসা
প্রথমে আপনার ডাক্তার আপনাকে এক বা দুই মাসের জন্য, নিজে নিজেই অ্যাংযাইটি বা দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রন করার ওপর কোন কোর্স (self-help course) করতে বলতে পারেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখবেন যে আপনি নিজে থেকেই আপনার অ্যাংযাইটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কিনা। এতে কাজ না হলে আপনাকে আরও গুরুতর সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা মেডিকেশন (ওষুধ) দেয়া হতে পারে।


সাইকোলজিকাল ট্রিটমেন্ট
আপনার GAD থাকলে সাধারণত আপনাকে মেডিকেশন (ওষুধ) দেয়ার আগে সাইকোলজিকাল ট্রিটমেন্ট করতে বলা হবে।


কগ্নিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (CBT)
GAD-এর সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসার মধ্যে একটি হচ্ছে CBT বা কগ্নিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি। গবেষণায় দেখা গেছে GAD-এর ক্ষেত্রে এই থেরাপির উপকারিতা মেডিকেশনের চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকে। তবে সবার ক্ষেত্রে এটি সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। থেরাপি আপনাকে আপনার সমস্যা, চিন্তাভাবনা, ব্যাবহার অন্যদের কিভাবে প্রভাবিত করে তা বুঝতে সাহায্য করে। এটি আপনাকে আপনার নেতিবাচক এবং উদ্বেগজনক চিন্তাগুলোকে প্রশ্ন করতে এবং আপনি সাধারণত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের কারনে যেসব কাজ এড়িয়ে চলতেন সেগুলো করতে সহায়তা করে।

CBT-তে আপনাকে তিন থেকে চার মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে এক ঘন্টার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ থেরাপিস্টের সাথে দেখা করতে হবে। আপনার থেরাপিস্ট পরীক্ষিত উপায়ে আপনার চিকিৎসা করছেন কিনা এবং কার্যকরী চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য তিনি পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন কিনা সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।


অ্যাপ্লাইড রিল্যাক্সেশন
GAD এর চিকিৎসায় কগ্নিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপির বিকল্প হিসেবে অ্যাপ্লাইড রিল্যাক্সেশন ব্যাবহৃত হয়। এটির কার্যকারিতা CBT-র মতই। অ্যাপ্লাইড রিল্যাক্সেশন আপনাকে আপনার জন্য উদ্বেগজনক বা ভীতিকর পরিস্থিতিতে আপনার পেশিগুলোকে একটি বিশেষ উপায়ে শিথিল করতে শেখায়। একজন বিশেষজ্ঞ থেরাপিস্ট আপনাকে;

  • আপনার পেশিগুলোকে শিথিল করতে শেখাবেন
  • দ্রুত এবং নির্দিষ্ট কোন শব্দ (যেমনঃ রিল্যাক্স) শোনা মাত্রই আপনাকে আপনার পেশি শিথিল করতে শেখাবেন
  • আপনার জন্য উদ্বেগজনক বা ভীতিকর এমন পরিস্থিতিতে আপনার পেশি শিথিল করতে শেখাবেন


মেডিকেশন (ওষুধ)
সাইকোলজিকাল ট্রিটমেন্টে আপনার কোন উপকার না হলে বা আপনি এগুলো করতে না চাইলে আপনাকে ওষুধ খেতে দেয়া হবে। দুশ্চিন্তার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন রকম ওষুধ আছে। এর মধ্যে কিছু আছে যেগুলো অল্প কয়েকদিন খাওয়া লাগে কিছু আবার দীর্ঘদিন ধরে খেতে হয়। আপনার শারীরিক এবং মানসিক সমস্যার ভিত্তিতে আপনাকে ওষুধ দেয়া হবে।

আপনি কোন ওষুধের কোর্স শুরু করার আগে আপনার চিকিৎসক আপনার সাথে বিকল্প ওষুধ, কোর্সের দৈর্ঘ্য, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, কোর্সচলাকালীন সময় অন্য কোন ওষুধ খেতে সমস্যা হবে কিনা এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

আপনি কোন ওষুধ খাওয়া শুরু করার পর অগ্রগতি হচ্ছে কিনা বোঝার জন্য আপনার চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখুন। প্রথম তিন মাস প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরপর দেখা করুন এবং পরবর্তীতে তিন মাস পর পর দেখা করলেই চলবে। কোন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারনে সমস্যা হলে আপনার ডাক্তারকে বলুন। তিনি প্রয়োজনে আপনাকে অন্য কোন ওষুধ দিবেন বা এই ওষুধেরই ডোজ কমিয়ে দিতে পারেন।

সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটরস (SSRI)
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আপনাকে প্রথমে সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটরস (SSRI) নামক একটি অ্যাণ্টিডিপ্রেস্যান্ট (বিষণ্ণতার ওষুধ) দেয়া হতে পারে। এটি আপনার মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।আপনাকে সারট্রালিন, এস্কিটালোগ্রাম ও পারোক্সিটিন এর মত SSRI দেয়া হতে পারে।

সব অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট এর মত SSRI এরও প্রভাব বোঝা যেতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। প্রথমে আপনাকে কম করে দেয়া হলেও পরবর্তীতে আপনার শরীর এটির সাথে মানিয়ে নিলে ডোজ বাড়িয়ে দেয়া হবে। SSRI এর যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে-

  • অসুস্থ লাগা
  • যৌন তাড়না কমে যাওয়া
  • দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যাওয়া
  • পাতলা পায়খানা বা কৌষ্ঠকাঠিন্য
  • মাথা ঘোরা
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া
  • ক্ষুদামন্দা
  • অতিরিক্ত ঘামা
  • উত্তেজিত বোধ করা
  • নিদ্রাহীনতা
  • অসুস্থ লাগা, পেটের সমস্যা, নিদ্রাহীনতা এবং উত্তেজিত লাগার মত সমস্যাগুলো সাধারনত প্রথম এক দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে।

আপনার বা আপনার চিকিৎসকের যদি মনে হয় যে এই ওষুধে কাজ হচ্ছে না তাহলে আপনাকে এর পরিবর্তে অন্য কোন ওষুধ দেয়া হতে পারে। যখন আপনি এবং আপনার চিকিৎসক মনে করবেন যে আপনার আর ওষুধ না খেলেও চলবে তখন আকস্মিক ভাবে বন্ধ করে দেয়ার বদলে কয়েক সপ্তাহ ধরে আস্তে আস্তে ডোজ কমিয়ে দেয়া হবে যাতে আপনার কোন সমস্যা না হয়। কখনই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করবেন না।

সেরোটোনিন ও নোরাড্রেনালিন রিআপটেক ইনহিবিটরস (SNRI)
SSRI কাজ না করলে আপনাকে সেরোটোনিন ও নোরাড্রেনালিন রিআপটেক ইনহিবিটরস (SNRI) দেয়া হতে পারে। এটি আপনার মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও নোরাড্রেনালিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আপনাকে ভেনলাফ্যাক্সিন (Venlafaxine) ও ডিউলক্সেটিন (Duloxetine) এর মত SNRI দেয়া হতে পারে। SNRI এর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-

  • অসুস্থ লাগা
  • মাথা ব্যাথা
  • ঘুম ঘুম ভাব
  • মাথা ঘোরা
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া
  • কৌষ্ঠকাঠিন্য
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • নিদ্রাহীনতা
  • SNRI নিলে আপনার রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। এজন্য নিয়মিত আপনার রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে।
  • অসুস্থ লাগা, পেটের সমস্যা, নিদ্রাহীনতার মত সমস্যাগুলো সাধারনত প্রথম এক দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে।


প্রিগাবালিন (Pregabalin)
SSRI ও SNRI এর একটিও কাজ না করলে আপনাকে প্রিগাবালিন দেয়া হতে পারে। এটি এক প্রকার অ্যান্টিকনভালস্যান্ট বা খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ যা মৃগী রোগের চিকিৎসায় ব্যাবহৃত হয় তবে এটি অ্যাংযাইটির ক্ষেত্রেও কার্যকর। প্রিগাবালিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-

  • ঘুম ঘুম ভাব
  • মাথা ঘোরা
  • বেশি বেশি ক্ষুধা লাগা এবং ওজন বেড়ে যাওয়া
  • মাথা ব্যাথা
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া
  • মাথা ঘোরানো (আশেপাশের সবকিছু ঘুরছে এমন মনে হওয়া)
  • এটি ব্যাবহারের ফলে SSRI ও SNRI এর মত বমি বমি ভাব এবং যৌন তাড়না কমে যাওয়ার মত সমস্যা হবার সম্ভাবনা কম।


বেনজোডায়াজেপিন (Benzodiazepine)
এটি একপ্রকার ঘুমের ওষুধ যেটি অ্যাংযাইটির ক্ষণস্থায়ী চিকিৎসার জন্য ব্যাবহৃত হয়। অ্যাংযাইটির মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে বেনজোডায়াজেপিন খাওয়ার ৩০ থেকে ৯০ মিনিটের মধ্যেই লক্ষণগুলো অনেক কমে যায়। আপনাকে ক্লোরাডিয়াযেপোক্সাইড (Chloradiazepoxide) ও ডায়াজেপাম (Diazepam) এর মত বেনজোডায়াজেপিন দেয়া হতে পারে।

এটি অত্যন্ত কার্যকরী হলেও লম্বা সময় ধরে ব্যাবহার করা যায় না কারন ৪ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এটি ব্যাবহার করলে এতে আসক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও ৪ সপ্তাহের পর থেকে বেনজোডায়াজেপিনের কার্যকরীতাও কমতে থাকে। বেনজোডায়াজেপিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-

  • ঘুম ঘুম ভাব
  • মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া
  • মাথা ব্যাথা
  • ভারটিগো
  • কাঁপুনি
  • যৌন তাড়না কমে যাওয়া
  • যেহেতু এটি খেলে ঘুম আসে সেহেতু এটি খাওয়ার পর গাড়ি চালানো বা কোন প্রকার বিপদজনক মেশিন ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন।


বিশেষজ্ঞের সাহায্য
উপরের কোন চিকিৎসাতেই আপনি উপকৃত না হলে আপনার চিকিৎসক আপনাকে কোন মানসিক সাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করতে বলতে পারেন।

মানসিক সাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আপনার জন্য বিশেষায়িত পরিসেবা পরিকল্পনা তৈরি করে সেই অনুযায়ী আপনার চিকিৎসা করতে পারেন। এর বিকল্প হিসেবে আপনাকে সাইকলজিকাল ট্রিটমেন্টের সাথে মেডিকেশন বা দুই ধরনের আলাদা মেডিকেশন একত্রে দেয়া হতে পারে।

About the author

Maya Expert Team