মনোসামাজিক মাদকাসক্তি মানসিক স্বাস্থ্য

কিশোর ও তরুণদের মাদকাসক্তির প্রবণতা

Written by Maya Expert Team

বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে মাদকাসক্তির সমস্যাটি চলে আসছে। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে, বিশেষ করে শহরের দরিদ্র এলাকাগুলোতে, হেরোইন (opium; আফিম) এবং ফেন্সিডিল (pholcodine) সহজলভ্য ছিল। আর গাঁজা তো বহু প্রজন্ম ধরে দক্ষিন এশিয়ায় পাওয়া যায়। গাঁজা খাওয়া, কেনা বা বহন করা বেআইনি হলেও শহরে এবং গ্রামের সবখানে এটি পাওয়া যায়।

গত কয়েক বছর ধরে তরুণদের মধ্যে কিছু উত্তেজক ওষুধের ব্যবহার লক্ষনীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ইয়াবার মত মাদক (methamphetamine and caffeine; মেথাএম্ফিটামিন এবং ক্যাফেইনের মিশ্রণ) শহুরে জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে তরুণ ও ছাত্রদের মধ্যে ফ্যাশনেবল হয়ে গেছে।

সহজলভ্যতা এবং কমদামের জন্য গাঁজা বেশি সেবন করা হলেও ইয়াবা এবং কোকেইনের মত মাদকগুলো পাওয়া কঠিন এবং এগুলো যোগাড় করার জন্য কিশোর বয়সীদেরকে তাদের চাইতে বয়সে অনেক বড় এমন লোকেদের সাথে মিশতে হয়। মাদক সেবন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তো বটেই, যারা মাদক কেনা-বেচা করে তাদের সাথে মেলামেশাও আপনার সন্তানের জন্য নিরাপদ নয়।

সঙ্গী-সাথীদেরকে মুগ্ধ করা বা তাদের সাথে তাদেরই একজন হয়ে মেশার জন্য কিশোর বয়স থেকেই মাদক নেয়া শুরু হয়। ঘন ঘন মেজাজ বদলানো, হরমোন এবং শারীরিক পরিবর্তন এবং কোথাও কারও সাথে মানিয়ে চলতে না পারার জন্য কিশোর বয়সটা এমনিতেই একটা কঠিন সময়। এ সময় কমবয়সীরা মানসিকভাবে দুর্বল থাকে এবং সতীর্থদের প্রভাবে মাদক গ্রহণ শুরু করতে পারে। মিডিয়া এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে মাদকের আধিক্য এই সমস্যাটি আরও বাড়িয়ে দেয়।

অতএব আপনার কিশোর ছেলেমেয়ে যদি মাদক সেবন শুরু করে তাহলে তা সনাক্ত করার জন্য এবং তাদেরকে সাহায্য করতে কী করবেন এখানে তা নিয়ে আলোচনা করা হল। মনে রাখবেন, আপনার সন্তানের সাথে কথা বলার এবং সম্মান ও বোঝাপড়ার একটা জায়গা তৈরি করতে পারলে সে আপনাকে বিশ্বাস করবে এবং আপনার সাথে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করবে। তাই, এই ব্যপারে ধৈর্যশীল হন।

মাদক সেবনের যেসব লক্ষন দেখলে সাবধান হওয়া জরুরী

বিভিন্ন ধরনের মাদক দুইএকবার দ্রহন করলে বা তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করলেই কেউ মাদকাসক্ত হয় না, তবে যেকোন মাত্রায় মাদক সেবন শুরু করলে তা থেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। স্কুল বদলানো, থাকার জায়গা পরিবর্তন বা তালাকের মত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আপনার সন্তানকে যেতে হলে মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কিশোর বয়সের সাধারন পরিবর্তনগুলো এবং মাদকাসক্ত হওয়ার বিভিন্ন লক্ষনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারাটা অভিভাবকদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।

মাদকাসক্তির লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

  • চোখ লাল হয়ে থাকা এবং চোখের মনি বড় হয়ে যাওয়া; এসময় সে এই চিহ্নগুলো ঢাকার জন্য চোখেরড্রপ ব্যবহার করতে পারে।
  • ক্লাস ফাঁকি দেয়া; পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়া; তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হটাৎ করে বিভিন্ন সমস্যা শুরু হওয়া
  • ঘর থেকে টাকাপয়সা, মুল্যবান জিনিস এবং প্রেসক্রিপশন খোয়া যাওয়া
  • অস্বাভাবিকভাবে একা থাকার প্রবণতা দেখা দেয়া; রেগে থাকা বা বিষণ্ণ হয়ে থাকা
  • আগের বন্ধুদের বাদ দিয়ে নতুন বন্ধুদের সাথে মেলামেশা শুরু করা; নতুন বন্ধুদের ব্যাপারে গোপনীয়তা অবলম্বন করা
  • আগের বিভিন্ন অবসরের শখের কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা; নতুন ধরনের জিনিসের প্রতি আগ্রহের বিষয়ে মিথ্যে বলা
  • আগের চেয়ে আরও বেশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা দাবি করা; দরজা লাগিয়ে রাখা; চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে না পারা; যেকোনো কাজে অত্যধিক গোপনীয়তা অবলম্বন করা

সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বুঝতে পারলে অভিভাবকেরা ভীত বা রাগান্বিত হয়ে পড়তে পারেন অথবা কী করবেন বুঝতে পারেন না। আপনার সন্তানের সাথে কথা বলার সময় শান্ত থাকাটা জরুরী তাই এসময় মাথা ঠাণ্ডা রাখুন।

যে পাঁচটি কাজ বাবা মায়েরা করতে পারেন

নিয়ম করে দিন এবং তা ভাঙ্গার ফলাফল বুঝিয়ে দিনঃ

আপনার সন্তান যেন বুঝতে পারে যে মাদক গ্রহণের কিছু প্রতিক্রিয়া সে আপনার কাছ থেকে পাবে। তবে ফাঁকা হুঙ্কার ছাড়বেন না বা যে নিয়ম আপনি মানতে বাধ্য করতে পারবেন না সে নিয়ম তৈরি করবেন না।

আপনার কিশোর ছেলেমেয়ের কাজকর্ম লক্ষ্য করুনঃ

আপানার সন্তান কোথায় যায় এবং কাদের সাথে মেশে তা জানুন। সে যেসব জায়গায় মাদক লুকিয়ে রাখতে পারে , যেমনঃ স্কুলের ব্যাগে, র‍্যাকের বইয়ের ফাঁকে, ডিভিডির খাপে, সেসব জায়গা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখুন। আপনার সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন যে সে মাদক সেবন করে ধরা পড়ার কারনে এসব করা হচ্ছে।

নতুন ধরনের বিভিন্ন কাজে তাকে উৎসাহিত করুনঃ

আপনার সন্তানকে বিভিন্ন ভাল কাজ ও অবসর কাটানোর উপায়ের সাথে, যেমনঃ খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পরিচিত করিয়ে দিন।

বিভিন্ন উপেক্ষিত বিষয় যেগুলোর কারনে সে মাদকাসক্ত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে সেগুলো নিয়ে কথা বলুনঃ

আপনার সন্তান কি সবার সাথে মিশতে পারছেনা বলে মনে করছে? সে কি সম্প্রতি কোন পরীক্ষায় ফেল করেছে বা প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে?

আপনার সন্তানের বন্ধুদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলুনঃ

বন্ধুবান্ধব তরুণদের জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলে। আপনার সন্তান মাদকাসক্ত নয় এবং মাদক থেকে তাকে দূরে রাখবে এমন বন্ধুদের সাথে মেশে এটা নিশ্চিত করা জরুরী। আপনার সন্তানের বন্ধুদের সাথে বন্ধুর মত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে আপনি তাকে যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার একটা জায়গা তৈরি করে দিতে পারবেন। বন্ধু হওয়া এবং বন্ধুর মত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। আপানার সীমাবদ্ধতাটা মনে রাখবেন।

কারও সাহায্য নিনঃ

কিশোর-কিশোরীরা অভিভাবকদের কথা শোনে, কিন্তু অন্য কোন কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে তারা একই কথাগুলো শুনলে সেগুলোর প্রতি আরও মনযোগী হতে পারে। কোন পারিবারিক বন্ধু, যার সাথে আপনার সন্তানের ভাল সম্পর্ক রয়েছে, অথবা ডাক্তার বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিন। ঢাকায় বেশ কয়েকটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে যাদের সেবাগুলো খুব ভাল।

মাদকাসক্তি বিষয়ে ৫টি ভ্রান্ত ধারনাঃ

ভ্রান্ত ধারনা – ১ঃ নেশা ছাড়া যায় না এটি একটি ভুল ধারনা। নেশা ছেড়ে দেয়াটা নিছক ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। আপনিই ইচ্ছা করলেই নেশা করা বন্ধ করে দিতে পারেন, তবে দীর্ঘদিন ধরে মাদক গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে সেটি আপনার মস্তিষ্কের উপর এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে তা থেকে মাদক সেবনের শক্তিশালী আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় এব তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। মস্তিষ্কে এই পরিবর্তনগুলো ঘটলে তখন কেবল ইচ্ছা শক্তির জোরে নেশা ছেড়ে দেয়াটা কঠিন হয়ে পরে।

ভ্রান্ত ধারনা – ২ঃ নেশা একধরনের অসুখ যার কোন চিকিৎসা হয় না, এটিও ভুল ধারনা। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই একমত যে মাদকাসক্তি মস্তিষ্কের একটি অসুখ কিন্তু এর কোন চিকিৎসা হয় না তা ঠিক নয়। নেশার কারনে মস্তিষ্কে যেসব পরিবর্তন হয় সেগুলো থেরাপি, ওষুধ, ব্যায়াম এবং অন্যান্য চিকিৎসা দিয়ে ঠিক করা যায়।

ভ্রান্ত ধারন – ৩ঃ একদম শেষ অবস্থায় পৌঁছনোর আগে নেশাখোর কখনো ভাল হয় না এটিও ভুল ধারনা। যেকোনো সময় মাদকাসক্তির চিকিৎসা শুরু করা যায়, এবং তা যত দ্রুত করা যায় ততই ভাল। যত বেশি দিন ধরে মাদক সেবন চলবে, সেটির প্রতি আকর্ষণ তত বৃদ্ধি পাবে এবং তার চিকিৎসা ততই কঠিন হয়ে পড়বে। মাদকাসক্তের চিকিৎসা শুরুর আগে সে সব খোয়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।

ভ্রান্ত ধারনা – ৪ঃ কাউকে জোর করে চিকিৎসা দেয়া যায় না, তাকে চিকিৎসা নিতে চাইতে হবে এটা ভুল ধারনা। যাদেরকে পরিবার, চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠান বা আইনের কারনে জোর করে চিকিৎসা নিতে হয় তারাও যারা নিজে থেকে চিকিৎসা নিতে চায় তাদের মতই লাভবান হবেন। অনেক মাদকাসক্তই যখন নেশার প্রভাবমুক্ত হতে থাকেন এবং পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হন তখন নিজে থেকেই ভাল হয়ে যেতে চান।

ভ্রান্ত ধারনা – ৫ঃ আগে চিকিৎসা নেয়ার পরও কাজ হয়নি তাই নতুন করে চিকিৎসা শুরু করলে কোন লাভ হবে না এটা ঠিক নয়। মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং এটি নানা কারনে আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। কোন মাদকাসক্ত আবার মাদক গ্রহণ শুরু করলে তার চিকিৎসা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বা সে আর ভাল হবে না এমনটি ভাবার কোন কারন নেই। এটিকে বরং আবার চিকিৎসা শুরু করার মাধ্যমে বা চিকিৎসা পদ্ধতি পুনর্মুল্যায়নের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

আপনার সন্তান মাদকের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়ার আগেই তার সাথে বিভিন্ন বেদনাদায়ক বিষয়ে খোলাখুলি বলতে পারার মত সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সঙ্কীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দেবেন না এবং বেশি কড়া শাসন করবেন না। বাচ্চাদেরকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করাটা তাদেরকে মাদক থেকে দূরে রাখার একটি চমৎকার উপায়। আপনার সন্তানের জীবনের অংশ হয়ে উঠুন। সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে সে যেন মাদকাসক্ত না হতে পারে সেই উপায় অবলম্বন করুন।

About the author

Maya Expert Team