ব্যক্তিত্ব সংক্রান্ত সমস্যা মনোসামাজিক মানসিক স্বাস্থ্য স্কিৎজোফ্রেনিয়া

সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ

সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ
সিজোফ্রেনিয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষন হলো চিন্তাধারা এবং আচরনের পরিবর্তন। কারো কারো ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতাও হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়ার এই উপসর্গগুলো দুটি শ্রেনীতে ভাগ করা যেতে পারেঃ পজিটিভ অথবা নেগেটিভ।

  • পজিটিভ উপসর্গ বলতে আচরন অথবা চিন্তার পরিবর্তন যেমন, কাল্পনিক অস্তিত্বে বিশ্বাস করা কিংবা বিভ্রম হওয়াকে বুঝায়।
  • নেগেটিভ উপসর্গ বলতে আক্রান্ত ব্যাক্তির মধ্যে কোন একটি বৈশিষ্ট্যের ঘাটতিকে বুঝায় যা একজন সুস্থ মানুষের মধ্যে থাকে। উদাহরনস্বরূপ, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত মানুষ প্রায়ই আবেগহীন, ভাবলেশহীন ও উদাসীন হয়ে থাকে।

এই লক্ষনগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে। সিজোফ্রেনিয়ার প্রথম লক্ষন হলো সামাজিকভাবে নিজেকে সরিয়ে নেয়া অর্থাৎ মানুষ জনের সাথে মেলামেশা, কথাবার্তা কমাতে কমাতে একপর্যায়ে বন্ধ করে দেয়া এবং ঘুমের পরিবর্তন হওয়্‌ কিন্তু তার প্রভাবটা বুঝতে না পারা। সিজোফ্রেনিয়ার প্রথম লক্ষণ সাধারনত কৈশোরে দেখা দেয়, এবং কৈশোর বয়সের বৈশিষ্ট্যের সাথে এই লক্ষনের যেহেতু কিছু মিল রয়েছে, তাই অনেক সময় এই পরিবর্তনটা আলাদা করে বোঝা যায় না।

সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্তদের মধ্যে লক্ষণগুলো মাঝে মাঝে তীব্র আকার ধারন করে, এটিকে তীব্র (acute) সিজোফ্রেনিয়া বলে। এরকম দুই তীব্র আক্রমনের (attack) মধ্যবর্তী দিনগুলোতে তাদের পজিটিভ উপসর্গ অর্থাৎ কাল্পনিক অস্তিত্বে বিশ্বাস কিংবা বিভ্রম এই লক্ষণগুলো কম থাকে বা থাকেই না।

সিজোফ্রেনিয়ার এমন কোন লক্ষন যদি আপনি নিজের মধ্যে টের পান, তবে দ্রুত একজন সাইকিয়াট্রিস্ট অর্থাৎ মানসিক রোগের চিকিৎসকের সাথে দেখা করুন। যত দ্রুত সিজোফ্রেনিয়া চিকিৎসা করা হবে, সফল হবার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।


সিজোফ্রেনিয়ার পজিটিভ উপসর্গ

১) কাল্পনিক অস্তিত্বে বিশ্বাস বা হ্যালুসিনেশন
হ্যালুসিনেশন হলো, যখন কেউ এমন কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করেন, বাস্তবে যার কোন অস্তিত্ব নেই। যে কোন কিছুরই হ্যালুসিনেশন হতে পারে, তবে সবচেয়ে বেশি হয় গায়েবী শব্দ শোনা।

যার হ্যালুসিনেশন হয়, তার কাছে এর সব কিছুই বাস্তবতা, যদিও তার চারপাশের মানুষ সেই জিনিস দেখতে পায় না বা শুনতে পায় না । ব্রেইন-স্ক্যানিং এর মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, হ্যালুসিনেশনের ফলে কেউ যখন কিছু শুনতে পায়, তখন তার মস্তিস্কের যে অংশ কথা বলা নিয়ন্ত্রন করে সে অঞ্চলে কিছু কার্যক্রম দেখা যায়, যার অর্থ হলো কথা গুলো তার নিজের মস্তিষ্কেই তৈরি হচ্ছে।

কেউ কেউ এই গায়েবী আওয়াজ পছন্দ করেন, এগুলোকে তার জন্য উপকারী মনে করেন। কেউ কেউ এতে ভয় পান, বিরক্ত হন, উত্যাক্ত হন। এই গায়েবী আওয়াজ নানারকম হতে পারে, কখনো কখনো এটি কোন একটি ঘটনাকে বর্ণনা করে, কখনো আক্রান্ত ব্যাক্তির ভাবনা এবং আচরনকে বর্ণনা করে, কখনো আলাপের ভঙ্গিতে আক্রান্ত ব্যাক্তিকে কোন নির্দেশনা প্রদান করে। এই গায়েবী কন্ঠ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসতে পারে, আবার নির্দিষ্ট কোন একটা জায়গা থেকেও আসতে পারে, যেমন কেউ কেউ বন্ধ টেলিভিশন থেকে এই ধরনের গায়েবী আওয়াজ শুনতে পান।


২) বিভ্রম
বিভ্রম হলো একধরনের বিশ্বাস যা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে দোষী মনে করার কারনে হয়, যদিও যে কারনে নিজেকে দোষী মনে করছে তা হয়তো ভুল, অবাস্তব বা ভিত্তিহীন। এটা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। বিভ্রম হঠাৎ শুরু হতে পারে, আবার ধীরে ধীরে সপ্তাহ বা মাস জুড়েও দেখা দিতে পারে।

হ্যালোসিনেশনের পক্ষে যুক্তি দ্বার করানোর জন্যও অনেকের বিভ্রম হয়। উদাহরনস্বরূপ, যদি তারা এরকম কোন শব্দ বা কন্ঠ শুনে থাকে যা তাদের কাজের বর্ননা দিচ্ছে, তাদের বিভ্রম থাকতে পারে যে অন্যকেউ তাদের কাজকে অনুসরন করছে। কারো কারো এমন বিভ্রমও হতে পারে যে , সে বিশ্বাস করে সে নির্যাতিত হচ্ছে বা তাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তাদের এমন বিভ্রমও হয় যে, তারা বিশ্বাস করে পরিবারের মানুষ অথবা বন্ধুরা সারাক্ষন তাকে দেখছে, অনুসরন করছে। বিভ্রম এর কারনে অনেকে প্রাত্যহিক জীবনের সব রকমের ঘটনার ভিন্ন অর্থ খুঁজে পায়। তারা বিশ্বাস করতে পারে যে টিভি অথবা পত্রিকার খবর গুলো তাদের একার জন্যই করা হচ্ছে, অথবা রাস্তায় চলমান কোন নির্দিষ্ট রঙের গাড়ীগুলো কোন গোপন খবর নিয়ে যাচ্ছে।


৩) বিভ্রান্ত চিন্তা
সাইকোসিস আক্রান্ত মানুষ প্রায়ই তাদের চিন্তার এবং কথোপকোথনের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে পারেনা । কেউ কেউ কোন কিছুতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে না এবং দ্রুত এক চিন্তা থেকে অন্য চিন্তায় চলে যায়। যার কারনে পত্রিকা পড়া এবং টিভি দেখার সময় তাদের সমস্যা হয়। বিভ্রান্ত চিন্তায় আক্রান্ত মানুষ কখনো কখনো তাদের চিন্তা ভাবনাকে “অস্পষ্ট” এবং “কুয়াশচ্ছন্ন” বলে বর্ননা করে। এদের ভাবনা এবং বক্তব্য দ্বিধাগ্রস্ত অথবা এলোমেলো হতে পারে, যা তাদের কথোপকোথন কে কঠিন করে ফেলতে পারে, যা অন্যের বুঝতে কষ্ট হয়।


৪) আচরন এবং ভাবনায় পরিবর্তন
সাইকোসিসে আক্রান্ত মানুষের আচরন অগোছালো ও অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। তার আচার আচরন কিংবা পোশাক অন্যদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে । সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মানুষ অসংলগ্ন আচরন করতে পারে, অথবা  উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে এবং কোন কারন ছাড়াই চিৎকার করতে পারে বা ঘামতে পারে।

কিছু মানুষ মনে করে তাদের চিন্তাকে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রিত করছে, তাদের চিন্তা তাদের নিজস্ব নয়, অথবা এই চিন্তা তাদের মনে অন্য কেউ রোপন করে দিয়েছে।

অন্যরা মনে করে তাদের মাথা থেকে তাদের পরিচিত অনুভূতি বা চিন্তা গুলো হারিয়ে যাচ্ছে , যেন কেউ একজন তাদের মন থেকে সেগুলো মুছে ফেলছে। কেউ কেউ অনুভব করেন, তাদের শরীর নিয়ে নেওয়া হচ্ছে অথবা কেউ একজন তার সমস্ত শারীরিক অঙ্গভঙ্গি এবং কাজকর্ম কে নিয়ন্ত্রন করছে।


সিজোফ্রেনিয়ার নেগেটিভ উপসর্গ
গুরুতর সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কয়েক বছর আগে থেকেই সিজোফ্রেনিয়ার নেগেটিভ উপসর্গ গুলো দেখা দিতে শুরু করে। এই প্রাথমিক নেগেটিভ উপসর্গ গুলোকে সিজোফ্রেনিয়ার পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পূর্বলক্ষণের উপসর্গগুলো ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। তার মধ্যে রয়েছে সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া, নিজের প্রতি কোন খেয়াল না থাকা, নিজের যত্ন না নেয়া, বিশেষকরে ব্যাক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীনতা ।

এই উপসর্গ গুলো সিজোফ্রেনিয়ার কারনে হচ্ছে, না অন্য কোন কারনে হচ্ছে তা বুঝতে পারা অনেক সময় কঠিন হয়ে পরে । সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত নেগেটিভ উপসর্গ হলঃ

  • জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, কর্মক্ষেত্রে অনীহা, এমনকি পারস্পরিক সম্পর্ক ও যৌনতা সম্পর্কেও অনাগ্রহ।
  • মনযোগের অভাব, বাড়ী থেকে বের হওয়ার প্রবনতা কমে যেতে পারে এবং ঘুমের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
  • যোগাযোগ কমে যেতে পারে এবং মানুষের সাথে অস্বস্তি অনুভব করতে পারে অথবা এমন অনুভব করতে পারে যে তার আর কিছু বলার নেই।

সিজোফ্রেনিয়ার নেগেটিভ উপসর্গের কারনে পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে সম্পর্কে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে কারন তারা রুক্ষতার জন্য ভুল বুঝতে পারেন।

About the author

Maya Expert Team