আপনার শিশুর ভাষা

বন্ধু পাবার জন্য যেমন কথা বলতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি, তেমনি জরুরি আশেপাশের দুনিয়াটাকে বোঝা এবং শেখার জন্যও।

একজন বাচ্চা যেন কথা বলতে শেখার আগেই শব্দ বুঝতে পারে।

বাচ্চাকে নিজের কাছে জড়িয়ে ধরে, চোখে চোখে যোগাযোগ করে কিংবা সরাসরি তাদের সাথে কথা বলার মাধ্যমেও তাকে কথা বলা শেখাতে পারেন। তারা আপনার কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকাবে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝে যাবে কিভাবে কথোপকথন হয়। এমনকি কি আপনি যদি তার সামনে তার মতো করেই শব্দ করেন, তাহলেও শুনে শুনে শেখার শিক্ষার জন্য এটা সহায়ক হবে। তাছাড়া, শব্দের কি গুরুত্ব এবং কিভাবে কথোপকথনে পরস্পর কথা আদান-প্রদান করতে হবে, সেটার শিক্ষণেও সহায়ক হবে।

যেহেতু, আশেপাশে কি হচ্ছে সেটা দেখার জন্যই আপনার বাচ্চার এখন উৎসাহ বেশি থাকবে, সেহেতু আপনারা দুজনের চোখের সামনে আছে এমন জিনিসগুলোর নামকরণ করুন এবং বাচ্চাকে নির্দেশ করে দেখান ( যেমন, দ্যাখো, একটা বিড়াল!)। এটা আপনার বাচ্চাকে নতুন শব্দ শিখতে সাহায্য করবে এবং একসময় সেও আপনাকে অনুকরণ করতে শুরু করবে। আপনার বাচ্চা যখন ১০০টি শব্দ আলাদাভাবে বলতে পারবে, তখন তারা সেগুলো ব্যবহার করে ছোটো ছোটো বাক্য গঠন করতে শুরু করবে। সাধারণত দুই বছর বয়স নাগাদ এই ঘটনা শুরু হয়।

কিছু সহায়ক পরামর্শ

নিচের পরামর্শগুলো আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে –

  • বাচ্চার জন্মের দিন থেকেই তার সামনে বিভিন্ন মুখভঙ্গি করুন এবং কি ঘটছে তা নিয়ে কথা বলুন। প্রশ্ন করুন, ‘ ক্ষিদে লেগেছে?’ কিংবা ‘ তুমি কি একটু দুধ খেতে চাও?’
  • একদম প্রথম থেকেই বাচ্চাকে সাথে নিয়ে বই দেখতে শুরু করুন। আপনাকে প্রতি পৃষ্ঠা ধরে পড়ে শোনাতে হবে এমন নয়, শুধু কি দেখছেন সেটা নিয়েই কথা বলুন।
  • বাইরে থাকলে, বা বাইরের কিছু দেখা গেলে সেটা নিয়ে কথা বলুন। যেমন, ‘ দ্যাখো, একটা বাস!’। শিশুটি আরেকটু বড় হলে আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলুন, যেমন, ‘ দ্যাখো, একটা লাল বাস!’
  • শিশুটি যত বড় হতে থাকবে, তাকে সাথে সাথে বিভিন্ন শিশুতোষ ছড়া বা গান শোনান। বিশেষ করে এমন সব ছড়া তার সামনে বলুন, যেখানে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিও করতে হয়। যেমন, ‘ হাট্টিমাটিম টিম’ , ‘ রেল গাড়ি ঝমাঝম’ ইত্যাদি।
  • শিশুটির সাথে সাথে আপনিও যদি তার মতো করে শব্দ করেন তাহলে সে আপনাকে অনুকরণ করতে শিখবে।
  • বাচ্চার সাথে কথা বলার সময় যদি পেছনে অনেক শব্দ থাকে, তাহলে তার শব্দ শেখার জন্য অসুবিধা হতে পারে। সুতরাং সে সময় টিভি ইত্যাদি বন্ধ রাখুন।
  • আপনার বাচ্চা হয়তো প্রথম প্রথম কোনো শব্দ বলার সময় ভুল বলবে। আপনি আবার সেটা ঠিকভাবে বলে দিন। যেমন, আপনার বাচ্চা হয়তো বিড়াল দেখিয়ে বললো, ‘বিলাল’ , আপনি বলুন, ‘হ্যাঁ, তাই তো, একটা বিড়াল!’। কিন্তু তার সমালোচনা করবেন না কিংবা ভুল শব্দ বলছে দেখে থামিয়ে দেবেন না।
  • সংক্ষিপ্ত, সরল বাক্য ব্যবহার করুন। যদি আপনার বাচ্চা এখন কথা বলতে পারে, তাহলে একটা সাধারণ নিয়ম করে নিন যে সে যতটুকু বাক্য বলবে, তার থেকে একটা শব্দ বেশি হলেও লম্বা করে আপনি পরের বাক্যটি বলবেন।
  • মাঝে মাঝে তার সাথে লুকোচুরি, ছোঁয়াছুঁয়ি জাতীয় খেলাগুলো করুন, যেখানে ভূমিকা বদলের সুযোগ থাকে।
  • কথার শুরুতে বাচ্চার নাম বলে তার মনোযোগ আকর্ষন করতে পারেন।
  • বাচ্চার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার আরেকটি উপায় হতে পারে তাকে বাছাই করার সুযোগ দেয়া। যেমন তাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, ” তুমি কলা চাও না আপেল চাও?”
  • বাচ্চাকে বিভিন্ন সময় ( যেমন, গোসলের সময়, গাড়িতে কিংবা ঘুমানোর আগে ) কথা বলতে দিলে তার বাচনশক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। যদি আপনি তাকে কোনো প্রশ্ন করেন, তাহলে তাকে উত্তর দেবার সুযোগ দিন।

ভাষার সমস্যা

কিছু কিছু শিশুর শব্দের অর্থ বুঝতে সমস্যা হয়, কিংবা তার শব্দ ব্যবহার করতে বা শব্দ ব্যবহার করে বাক্য বানাতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। কেউ কেউ হয়তো নিজে কথা বলার সময় লম্বা বাক্য ব্যবহার করে, কিন্তু অন্য কেউ লম্বা বাক্য ব্যবহার করে কথা বললে তার বুঝতে সমস্যা হয়। এরকম যদি কোনোটা হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে তার বিশেষ সাহায্যের প্রয়োজন।

যদি শিশুর ভাষার বিকাশের ব্যাপারে আপনি চিন্তিত থাকেন, তাহলে ডাক্তার বা স্বাস্থ্য পরিদর্শকের সাথে কথা বলুন। হয়তো কোনো স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট এর কাছে আপনার বাচ্চাকে নিয়ে গেলে তার উপকার হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আপনার এলাকাতেই হয়তো এরকম কাউকে পেয়ে যাবেন। আপনার এলাকায় বচন ও ভাষা সংক্রান্ত কোনো বিভাগ আছে কি না দেখে নিন। কথা বলতে শেখার ব্যাপারে সহায়ক তথ্যের জন্য টকিং পয়েন্ট ওয়েবসাইট-ও দেখতে পারেন।

যেসব শিশু দুই ভাষায় কথা বলে

অনেক শিশু এমন পরিবারে জন্মগ্রহণ করে যেখানে সদস্যরা দুই ভাষায় কথা বলেন। এটা শিশুদের ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। আরেকটা ভাষা জানা থাকলে তাদের মাতৃ ভাষা শেখাটাও সহজ হয়ে যাবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে আপনি যে ভাষায় স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সে ভাষাতেই বাচ্চার সাথে কথা বলুন। হতে পারে বাবা-মা দুজন আপনারা দুই ভাষায় কথা বলেন। শিশুরা অনেক তাড়াতাড়ি সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে পারে।