আইনি বাল্যবিবাহ

বাল্যবিবাহ

বাল্যবিবাহের হারে ‍বিশ্বের সর্বোচ্চ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৮ বছরের কম কোন মেয়ে বা ২১ বছরের কম কোন ছেলের বিয়ে হওযা এবং যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়াকে বোঝাতে বাল্যবিবাহ প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয়। ইউনিসেফ এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ মেযেরই ১৮ বছরের পূর্বেই বিয়ে হয়ে যায়। ফলে যেসকল মেয়েদের ১৮ বছরের মধ্যেই বিযে হয়ে যায় তারা ১৯ বছর বয়সেই গর্ভবতী হয়। যে বয়সটা শারীরিক বা মানসিক কোন ভাবেই একটি মেয়ের মা হবার ও পরিবারের সকল দাযিত্ব নেয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। আজ বাল্যবিবাহের বিষয়টি আর্থ-সামাজিক শ্রেনী ও শিক্ষা নির্বিশেষে বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর উভয় এলাকারই একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবারই বলবে যে, সামাজিক হুমকি বা চ্যালেঞ্জ যেমন নিরাপত্তা ও সুরক্ষা এবং একটি মেয়ে শিশুকে ‘বোঝা’ হিসেবে গন্য করা ইত্যাদির কারণে তারা তাদের কন্যা সন্তানের কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয়। যেটা মানসিক, শারীরিক এবং অন্যান্য সামাজিক সমস্যা যেমন কম বয়সে গর্ভাবস্থা, নির্যাতিত হবার বেশি সম্ভাবনা, কম বয়সে চাপ ও বিষণ্নতার দিকে পরিচালিত হয়। বাল্যবিবাহ কিশোরী মেযেদের উপর এতটাই মানসিক চাপ সৃষ্টি করে যে তা নিঃসন্দেহে তাদের শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং সর্বোপরি তাদের নিজস্ব জীবন ধারাকেই প্রভাবিত করে।

বাল্যবিবাহ কম বয়সে গর্ভাবস্থার সাথে সম্পর্কিত। যা নব্য বিবাহিতা মেয়েটির জীবনধারায় চাপ সৃষ্টি করে, কম ওজনের সন্তান জন্মাদানের মত নিয়ে আসে আরো অনেক বিষয়। এমনটাও লক্ষ্য করা গিয়েছে যে, কম বয়সী গর্ভবতী নারীরা বয়সী নারীদের চেযে তাদের শ্বশুড় বাড়ির লোকজন বা স্বামীর দ্বারা বেশি নির্যাতিত হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাছাড়া কম বয়সে বিবাহিতা নারীদের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে বেশি দেখা গিযেছে যা জীবনব্যাপী স্বাস্থ্য জটিলতা ও মানসিক মর্মপীড়ার দিকে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের মুখ্য কিছু কারণ-

বাংলাদেশে অসম সমাজ বিরাজ করছে। যেখানে সব কিছুর উপরে দারিদ্র্য একটি মূখ্য বিষয় যা বাল্যবিবাহে উৎসাহ যোগায়। কম বয়সী মেয়েদের পরিবারে সবসময অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাদের অন্য পরিবারের বয়স্ক পুরুষের সাথে বিয়ে দিযে দেয়াটা পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনে টিকে থাকারই একটি কৌশল।

  • পিতা-মাতা যদি তাদের সন্তানের কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয় তাহলে তুলনামূলকভাবে তাদের কম যৌতুক দিতে হবে এ প্রত্যাশায়ও তারা আকৃষ্ট।
  • বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের আরেকটি মূল কারণ হচ্ছে কন্যা সন্তানের যৌন হয়রানির শিকার হবার ভয়। বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য অনিরাপদ পরিবেশে বাল্যবিবাহকে মেয়ের যৌনতাকে রক্ষার একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাল্যবিবাহের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব-

প্রথমত যেসকল মেয়েদের কম বযসে বিয়ে হয়ে যায় তারা গর্ভবতী হতে গিয়ে তীব্র চাপ অনুভব করে। বাংলাদেশে কম বয়সী মেয়েদের এক-তৃতীয়াংশই ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সে গর্ভবতী বা মা হয়। আর কম বয়সে গর্ভবতী হওয়াটা স্বাস্থ্য ঝুঁকির সাথে জড়িত।

  • কম বযসী মা যারা নিজেরই এখনো পূর্ণতা পাবার প্রক্রিয়ায় রয়েছে তাদের মাঝে মাতৃমৃত্যুর হার অনেক বেশি।
  • সন্তান প্রসবের সময় বয়স্ক মায়ের চেয়ে কিশোরী মায়েদের মারা যাবার দ্বিগুণ সম্ভাবনা রয়েছে।
  • ২০ বছর বযসের মায়েদের চেযে ১৪ বছরের কম বযসের মায়েদের সন্তান মারা যাবার ৫০ শতাংশ বেশি সম্ভাবনা রয়েছে।

বাল্যবিবাহ মেযেদের শিক্ষার সম্ভাবনাকে সম্মতি জানায়না এবং এটিকে আরো সীমাবদ্ধ করে যা মেয়েদের স্কুল ছাড়তে বাধ করায়। এতে মেযেদের মাঝে পরবর্তীতে দক্ষতার অভাব দেখা দেয় এবং তারা শ্রমবাজারে একীভূত হতে ব্যর্থ হয়। ফলস্বারূপ তাদের সামাজিক মর্যাদা হয় নত এবং চলাফেরাও হয় সীমিত। তারা এমন একটি সমাজে অবদান রাখে যেখানে মেয়েদের আলোচনা বা যুক্তিতর্ক করাবার খুব কমই ক্ষমতা রয়েছে। তাছাড়া পারিবারিক নির্যাতন বাল্যবিবাহের মত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায় কারণ তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে অসচেতন থাকে এবং তাদের সঙ্গীর সাথে আলোচনা বা বোঝাপরা করতে ব্যর্থ হয়।

মেয়েদের তাদের নিজ শরীরের উপর খুব কমই অধিকার থাকে এবং তারা পারিবারিক সহিংসতা ও শোষণ প্রবণ হয়।

বাল্যবিবাহ কম বয়সে গর্ভবতী হবার দিকে পরিচালিত হয়। ১৫ থেকে ১৯ বছরের এক-তৃতীয়াংশ কিশোরী মেয়েরা হয় গর্ভবতী নয়তোবা মা। কিশোরী মায়েদের বয়স্ক মায়েদের চেয়ে বাচ্চা জন্ম জটিলতায় ভোগার বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন- নতুন শিশু জন্মের সময় রক্তস্রাব ও নব্য শিশুর অপুষ্টি হচ্ছে সবচেয়ে সাধারণ একটি স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

সর্বোপরি বাল্যবিবাহ একটি অসম সমাজকে চিরস্থায়ী করে, নারীর দুর্বলতা, ক্ষমতাহীনতা বৃদ্ধি করে। সেইসাথে এটি নারীর ব্যক্তিগত এবং মনোসামাজিক উন্নতিকে বাধাগ্রস্থ করে এবং নারী স্বাস্থ্যেও বিপদজনক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ আইন-

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের বৈধ বয়স হচ্ছে ছেলের জন্য ২১ বছর এবং মেয়ের জন্য ১৮ বছর। ১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ রোধ আইন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে কর্তৃপক্ষ খুব কমই বাল্যবিবাহ থামাতে হস্তক্ষেপ করে এবং পিতামাতাও গোপনে তাদের মেয়ের বিয়ে অব্যাহত রাখে।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ-

মেয়েদের নেতৃত্ব ও পরামর্শ দেয়ার দক্ষতা অর্জনে মেয়েদের সাথে কাজ করা। যাতে করে তারা নিজেরাই পরবর্তীতে এ বিষয়ে পরামর্শ দিবে এবং নিজ সন্তানের সাথে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও এ থেকে নারীকে সুরক্ষা দিতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করবে।

  • স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে বাল্যবিবাহ রিপোর্ট করার একটি সিস্টেম উন্নত করা।
  • জন্ম নিবন্ধনের উপর স্থানীয় প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। মেয়ে ও নব জাত শিশুর জন্ম সনদ নির্দিষ্ট কিছু বিষয় মাথায় রেখে জারি কারা। জন্ম সনদ ছাড়া প্রমাণ করা যায় না যে একটি মেয়ে বিয়ের জন্য ছোট কিনা এবং সেই সাথ যায় না বা্ল্যবিবাহ আটকানো।
  • কমিউনিটিতে কর্মশালা আয়োজন করে এতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিয়ে আসা।
  • যুব মিডিয়া গ্রুপগুলো শক্তিশালী করা।

About the author

Maya Expert Team