আইনি বাল্যবিবাহ

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ

হরিরামপুরের রেশমা (বয়স ১৪) যখন জানতে পারলো তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন, তার চারপাশের জগত বালির প্রাসাদের মতন ভেঙ্গে পড়লো। অসহায় রেশমা তার বাবাকে অনেক অনুরোধ করেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারলোনা। মেয়ের এই আকুতিতে শেষ পর্যন্ত তার মা গ্রামবাসী এবং এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তিদের একত্রিত করে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ তুললেন। রেশমার বাবা বাধ্য হলেন মেয়ের বিয়ে বন্ধ করতে। রেশমার মা ছিলেন ‘রিফ্লেক্টিভ একশন গ্রুপ, একশন এইড’ এর সদস্য এবং তিনি এখান থেকেই জানতে পেরেছিলেন বাল্যবিবাহের যত খারাপ দিক।

বাল্যবিবাহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি করুন সামাজিক বাস্তবতা, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। তবে তার মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশী। যাদের বয়স ২০-২৪ বছর, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরই বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগে। এদেশে ৬৪% মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পারিবারিক ভাবে দিয়ে দেয়া হয় (বিবিএস রিপোর্ট, নারী নির্যাতন ২০১১)। এটি একাধারে যেমন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, তেমনি বাংলাদেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতির পথে বিরাট বাধা।

বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে যা চিহ্নিত করা হয়েছে তা হচ্ছে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা। আবার অনেকক্ষেত্রেই মেয়েদের যৌন হয়রানির আশঙ্কা থেকে বাঁচাতে এবং যৌতুক কমানোর জন্য অল্প বয়সেই বিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এর ফলাফল ভয়াবহ। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায়, মেয়েদের সবচাইতে ক্ষতি হয় তাদের শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বিকাশে। অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত মেয়েরা হয়ে যায় পরনির্ভরশীল এবং উপার্জন অক্ষম। তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞানের অভাবের কারণে নিজেরা নানান অসুখে ভোগে এবং তাদের সন্তানেরাও পুষ্টি-হীনতার মধ্য দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হয়। কিশোরী বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় এসব মেয়েদের যৌন-জীবন শুরু হয়ে যায় সময়ের অনেক আগেই। প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক শিক্ষার অভাবে, তাদের অপরিণত শরীরে বিভিন্ন অসুখ বাসা বাধে। অকাল গর্ভধারণে তাদের অনেকেরই অল্পবয়সী শরীর ভেঙ্গে পড়ে। এমনকি শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হতে হয় তাদের।

বাল্যবিবাহ শুধু যে মেয়েদের অধিকার লঙ্ঘন করে তা নয়। এত উচ্চ বাল্যবিবাহের হার দেখে বোঝা যায় যে এ দেশের সমাজ এখনো এমন একটি পর্যায়ে আছে যেখানে মেয়েদের সবসময় ছোট করে দেখা হয়। মনে করা হয় মেয়েদের শিক্ষার কোন প্রয়োজন নেই, তারা শুধু কাজ করার যন্ত্র এবং পরিবারের বোঝা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম অল্প বয়সে পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দেয়ায় এখন মা খালা, দাদি নানিদের অনেকেই মনে করেন মেয়েদের পড়াশোনার বিশেষ কোন প্রয়োজন নেই। তারা ঘরে থেকে ঘর-সংসারের কাজ শিখলেই যথেষ্ট। অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত থাকায় মেয়েরা নিজেরাও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেনা এবং অন্যায়ের শিকার হয়। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। আর সেজন্য অবশ্যই ছেলেদেরও এখানে ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে। পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া ঠেকাতে তাদের কঠিন ভাবে মেয়েদের পক্ষে দাড়াতে হবে। তাদের শিক্ষিত হতে সাহায্য করতে হবে। কেননা যখন মেয়েরা শিক্ষিত হবে, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানবে, তখন তারাই তাদের মেয়েদের সেভাবে শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে।

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ ১৯২৯ থেকেই নিষিদ্ধ, কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ খুব একটা নেই বললেই চলে। বাল্যবিবাহ রোধের সবচেয়ে বড় উপায় তাই নারীদের শিক্ষিত করে তোলা, তাদের অধিকার, বাল্যবিবাহের অপকারিতা ইত্যাদি বিষয়ে সবিস্তারে জানানো। ঘরে ঘরে নারীদের নিয়ে একত্রিত করে, বুঝিয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেন তারা নিজেদের প্রয়োজনে একজন আরেকজনকে সাহায্য করতে পারে এবং একসাথে যেকোনো সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে।

About the author

Maya Expert Team