সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমার অধিকার

বাংলাদেশে ২০ বছর বা তার কম বয়সী নারীদের মধ্যে প্রতি ১০০০ জনে ১৩৫ জন নারীর হয় ইতিমধ্যে সন্তান আছে নতুবা তারা গর্ভবতী। বাংলাদেশে নারীদের বিয়ের ন্যুনতম বয়স ১৮ বছর। কিন্তু এ বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায় ৬০% কিশোরীর। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার এক- তৃতীয়াংশের বয়স ১৪ এর নিচে। মোট জনসংখ্যার ২১% এর বয়স ১০-১৯ বছর, যার মধ্যে ৫৮% এর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোন জ্ঞান নেই। খুব কম বয়সে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়াতে নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ধারনা হওয়ার আগেই বাংলাদেশের কিশোরীরা মা হয়ে পড়েন। তাই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের এক- তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যেই মা হয়ে গিয়েছে।

বাংলাদেশে শুধু কিশোর-কিশোরীই নয় প্রাপ্তবয়স্ক নারী- পুরুষদেরও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে পরিষ্কার কোন জ্ঞান নেই, এ সংক্রান্ত অধিকার নিয়েও কোন ধারনা নেই। তাই শুধু কিশোরীরাই নয় প্রাপ্তবয়স্ক নারীদেরও মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই সন্তান নিয়ে ফেলার চাপ দেওয়া হয়ে থাকে। বিয়ের পরপরই একটি মেয়েকে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন, অনেকক্ষেত্রে নিজের পরিবার এবং সামাজিক চাপে পড়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে তৈরি হওয়ার আগেই সন্তান নিয়ে নিতে হয়। এরপর আবার মেয়ে শিশু, ছেলে শিশু নিয়ে বিতর্ক তো আছেই, যদিও তা ইদানিং অনেক কমে এসেছে ! এছাড়া প্রস্তুত হওয়ার অনেক আগেই নারীকে শিক্ষাক্ষেত্রে, পেশাগত কাজে বা সামাজিক অনেক দিক ছাড় দিয়ে গর্ভাবস্থায় যেতে হয় ও এরপর সন্তানের দেখভাল করতে হয়। কখন সন্তান নেয়া হবে বা উচিত, কয়টি সন্তান নেয়ার ইচ্ছে বা পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত ব্যাপারে সংসারে নারীর মতামতকে গন্যই করা হয় না।

বাংলাদেশে মাতৃ-মৃত্যুর হার অন্যান্য অনেক দেশের চাইতে বেশী। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমে আসলেও তা এখনো প্রতি ১০,০০০ জনে প্রায় ২৪০ এর কাছাকাছি। বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর কারণগুলো হলঃ

  • অনিরাপদ গর্ভপাত
  • গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি
  • রক্তশূন্যতা
  • সংক্রমণ এবং
  • ঘনঘন গর্ভবতী হওয়া

এর বাইরেও ১৫% মাতৃমৃত্যু পারিবারিক নির্যাতন সংক্রান্ত কারনে হয়ে থাকে। এই কারনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি, রক্তশুন্যতা, ইনফেকশন এই ব্যাপারগুলো শারীরিকভাবে গর্ভাবস্থার জন্য অপ্রস্তুত থাকার লক্ষন। কিন্তু নিজের শরীর সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় নারীরা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সন্তান নিতে আগ্রহী থাকেন এবং নারীকে এ ব্যাপারে চাপ দেন। কিন্তু যদি নারী সন্তান নিতে আগ্রহ প্রকাশ না করেন বা নারীর সন্তান হতে দেরি হয় কিংবা সন্তানই না হয়, তবে পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে নারীকে অনেক অপমানের সম্মুখীন হতে হয়। আর নানান ধরনের কটু মন্তব্যের কথা তো না বললেই নয়।

আপনাকে কি জোর করা হচ্ছে ?

  • আপনার স্বামী, শ্বশুর- শাশুড়ি বা আপনার পরিবারের লোকজন কি আপনাকে সন্তান নিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে? বা আপনাকে জোর করছে?
  • আপনি সন্তান নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নন, তারপরও আপনাকে আপনার পরিবারের সদস্যরা চাপ দিচ্ছে?
  • আপনার আর সন্তান নেওয়ার ইচ্ছে নেই বা আপনি শারীরিকভাবে প্রস্তুতবোধ করছেন না, তারপরও আপনাকে জোর করা হচ্ছে?
  • আপনি পরিবার পরিকল্পনা অনুযায়ি আগাতে চান, কিন্তু আপনার পরিবার এর গুরুত্ব না বুঝেই আপনাকে জোর করছে?
  • আপনি পড়ালেখা শেষ করে বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে তারপর সন্তান নিতে চান, কিন্তু আপনাকে জোর করা হচ্ছে?

আপনি কি করবেন?

  • আপনার স্বামীর সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করুন, পরিবার হিসেবে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করুন। নিকটস্থ পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিকে যান। চিকিৎসকের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করুন।
  • আপনার শারীরিক, মানসিক অবস্থা, আপনার সিদ্ধান্ত আপনার স্বামীর সাথে আলাপ করুন। কেন আপনি এখনই সন্তান নিতে চাননা তা কারণ সহ আলাপ করলে আপনার সিদ্ধান্ত আপনার সঙ্গী সহজেই বুঝতে পারবেন।
  • আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি, বাবা-মা এর সাথে আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাপ করুন। দরকার হলে আপনার পরিবার পরিকল্পনার উপদেষ্টা চিকিৎসকের সাথে আপনার পরিবারের সদস্যদের আলোচনা করিয়ে দিন। সঠিক সময়ে সন্তান নেওয়ার সুবিধা অসুবিধা একজন বিশেষজ্ঞ সবাইকে ভাল করে বোঝাতে পারবেন।
  • আপনার পড়ালেখা শেষ করা,আপনার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সন্তান নেওয়ার সুবিধাগুলো নিয়েও আপনার পরিবারের সাথে আলোচনা করুন।
  • শারীরিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই সন্তান নিতে যাওয়ার অসুবিধাগুলো নিয়েও আপনার পরিবারের সাথে আলাপ করুন।
  • অধিক সন্তান নেওয়ার জন্য আপনি বারবার গর্ভবতী হওয়ার ফলে আপনার শারীরিক, মানসিক কি কি অসুবিধা হতে পারে তা আপনার পরিবারের সদস্যদের বোঝান। অধিক সন্তান নেওয়ার ফলে সব সন্তানকে সমান সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়না, অর্থনৈতিকভাবেও অনেক অসুবিধা হয়।

এরপরও যদি আপনার স্বামী বা পরিবার আপনাকে সন্তান নিতে জোর করে এবং আপনি রাজি না হলে আপনাকে শারীরিক বা মানসিকভাবে অত্যাচারের হুমকি দেয় বা অত্যাচার করে, তখন আপনি কি করবেন? আপনাকে যদি শারীরিক বা মানসিকভাবে অত্যাচারের হুমকি দেয়া হয় বা অত্যাচার করা হয় তবে আপনার উচিত আইনি সহায়তা নেয়া। কোথায় আপনি আইনি সাহায্য বা উপদেশ পেতে পারেনঃ

  • মায়া আপা কি বলে- আপনি ‘মায়া আপা কি বলে’ তে প্রশ্ন করে যে কোন ব্যাপারে, শারীরিক, মানসিক, আইনি সাহায্য পেতে পারেন।
  • মায়া ভয়েস- আপনার মানসিক অবস্থা অন্যান্যদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার মত অনেকেই আপনাকে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে সাহায্য করতে পারবেন।
  • আস্ক, ব্লাস্ট,ব্র্যাক- এ ধরনের সংস্থা নারীদের বিভিন্ন ব্যাপারে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে। আপনার যে কোন ধরনের আইনি সমস্যায় আপনি এই সংস্থাগুলোর সাহায্য নিতে পারেন।

নারীর সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত আমরা একটা নির্দিষ্ট বয়স, সময়-এর গণ্ডির মধ্যে বেধে দেওয়া আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নারী একজন নারী, মা, কন্যা, বোন বা স্ত্রীর আগে একজন মানুষ, একজন পৃথক ব্যক্তি যার নিজের শরীর, মন এবং জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার নিতান্তই তার নিজের, তার একার। পরিবার, বন্ধু, সমাজের অংশ হিসেবে আমরা তাকে পরামর্শ দেয়ারই শুধু অধিকার রাখি, তার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেয়ার অধিকার রাখি না।

শিক্ষা, অর্থনীতি, পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে একজন নারী সন্তান নেবেন কি নেবেন না, কখন নেবেন, কতজন সন্তান নেবেন, কীভাবে সন্তান নেবেন- এসব সিদ্ধান্ত নারীর। পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে সঙ্গীর মতামত অবশ্যই নারী গ্রহণ করবেন, তাই বলে সিদ্ধান্ত তার উপর চাপিয়ে দেয়াটা নারীর ব্যক্তিত্বের উপর আঘাত হানার শামিল। তাই নারীর সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নারীরই, একে মেনে নিয়ে নারীর ব্যক্তিসত্তাকে শ্রদ্ধা করার চর্চা আমাদের শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

0 comments

Leave a Reply