আইনি পারিবারিক আইন বিবাহ

আপনার দেনমোহরের অধিকার সম্বন্ধে জানুন

বাংলাদেশের কতজন নারী দেনমোহরের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবগত আছেন? কতজন নারী তাদের নিকাহনামা বা কাবিননামায় সই করলে তার কী কী অধিকার পাওনা হয় তা না বুঝেই “কবুল” বলেন? কতজন নারী কাবিননামায় তার তালাকের এবং দেনমোহরের অধিকার ঠিকভাবে লেখা আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নেন?

নিকাহ, তালাক এবং দেনমোহরের অধিকার বিষয়ে ভুল ধারনা প্রচলিত থাকার কারণে অনেক মহিলা ইসলাম ধর্ম এবং আইনে তাদের দেনমোহরের যে অধিকার দেয়া হয়েছে তা থেকে বঞ্চিত হন।

ইসলাম ধর্মে নারীকে তালাক এবং দেনমোহর উভয়েরই অধিকার দেয়া হয়েছে, তাহলে কী করে একটির কারণে অপরটির দাবি ক্ষুণ্ণ হয়? আমরা কী আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, নাকি অন্ধ ভাবে প্রচলিত ধারনায় বিশ্বাস করে চলি?

ইসলামে নারীকে অন্যান্য অধিকার ও নিরাপত্তার সাথে সাথে দেনমোহরের অধিকারও দেয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্ম মতে এটি প্রতিটি বিবাহিত নারীর অধিকার এবং আমাদের দেশের আইনে মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) আপ্লিকেশন অ্যাক্ট ১৯৩৭ অনুযায়ী এটিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। মুসলিম পার্সোনাল ল (শারিয়াত) আপ্লিকেশন অ্যাক্ট ১৯৩৭ অনুযায়ী উভয় পক্ষই যেখানে মুসলমান সেখানে শরিয়ত মোতাবেক আইন প্রয়োগ করার বিধান রয়েছে।

অতএব আমাদের দেশের আইনে এবং শরিয়ত অনুযায়ী দেনমোহরের অধিকার আদায় করা বাধ্যতামূলক। নিকাহনামা/কাবিননামা বলে পরিচিত চুক্তির অধিনে বিবাহিত প্রতিটি নারী এই অধিকার প্রাপ্ত হন এবং নিকাহনামার ১৩-১৭ এবং ২০ ধারায় দেনমোহরের কথা বলা আছে।

মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে দেনমোহর নিকাহনামার একটি অবিচ্ছেদ্দ অংশ এবং নিকাহনামা যেমন মুসলিম বিবাহ এবং তালাক (রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট ১৯৭৪ অনুযায়ী নিবন্ধন করতে হয় তেমনই দেনমোহরও করতে হয়। সুতরাং নিকাহনামায় উল্লেখিত দেনমোহর আদায় না করলে রেজিস্ট্রিকৃত চুক্তির লঙ্ঘন করা হয়।

নিকাহনামায় দেনমোহর তাৎক্ষনিক ভাবে আদায় করার কথা বলা থাকতে পারে আবার তা দেরিতে দেয়ার কথাও উল্লেখ থাকতে পারে। এটি মুসলিম বিবাহে অংশগ্রহণকারী উভয় পক্ষের সম্মতি অনুযায়ী গহনা, সম্পত্তি, বা অন্য যেকোনো মুল্যবান সামগ্রি হতে পারে। নিকাহনামা অনুযায়ী যে মুল্যবান বস্তু বা অর্থই দেনমোহর হিসেবে নির্ধারন করা হোক না কেন সেটি অবশ্যই স্ত্রীকে দিতে হবে।

মুসলিম ম্যারেজ অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিভোর্স (রেজিস্ট্রেশন) রুলস ১৯৭৫ রুল নং ২৪ (১) অনুযায়ী নিকাহনামায় যদি অনাদায়কৃত দেনমোহর তাৎক্ষনিকভাবে দেয়া হবে নাকি দেরিতে দেয়া হবে সেটির উল্লেখ না থাকে তাহলে সম্পূর্ণ দেনমোহরই তাৎক্ষনিকভাবে (অর্থাৎ, চাহিবামাত্র) আদায় করতে হবে বলে ধরে নিতে হবে (মুসলিম ফ্যামিলি ল অর্ডিন্যান্সের সেকশন ১০)।

অনেক মহিলা ভুল করে মনে করেন যে দেনমোহর কেবল তালাকের সময়ই দাবি করা যায় এবং দেনমোহর আদায়ের জন্য বিবাহবিচ্ছেদ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, অথচ আইনত তারা এটি যেকোনো সময় দাবি করতে পারেন। এছাড়াও তাৎক্ষনিকভাব আদায় করার কথা এমন দেনমোহর না পেলে স্ত্রী স্বামীর সাথে একসাথে বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।

স্বামী যদি দেনমোহর দিতে ব্যর্থ হন বা না দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন তাহলে তার সম্পত্তি থেকে দেনা হিসেবে এটি পরিশোধ করতে হবে। এটি একজন স্ত্রীর অলঙ্ঘনীয় অধিকার এবং ডিসোলিউশন অফ মুসলিম ম্যারেজ অ্যাক্ট ১৯৩৯-এ পরিষ্কারভাবে বলা আছে যে মুসলিম আইনে একজন স্ত্রীকে দেনমোহরের যে অধিকার দেয়া আছে কোন কিছুর জন্যই তার ব্যতিক্রম করা যাবে না।

আমরা অনেক সময় শুনেছি বা দেখেছি যে স্বামী তার স্ত্রীর কাছে দেনমোহরের দাবি থেকে মাফ চেয়ে নেন এবং স্ত্রী তা মেনে নেন। এর মানে কী এই যে স্ত্রী তার দেনমোহরের দাবী সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলেন? এটিও একটি ভ্রান্ত ধারনা কারণ আইনে ভিন্ন কথা বলা আছে। একটি মামলার দৃষ্টান্তে দেখা যায় যে স্ত্রী তখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি এবং এমন পরিস্থিতিতে কোন স্ত্রী তার দেনমোহরের দাবী ছেড়ে দিলে সেটি তিনি পরে মেনে চলতে বাধ্য থাকবেন না।

তবে “খুলা (Khula)”-এর ক্ষেত্রে, যেখানে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ই যদি বিবাহবিচ্ছেদে সম্মত হন সে অবস্থায় স্ত্রী তার দেনমোহরের দাবী হারাতে পারেন। ডিসলিউশন অফ মুসলিম ম্যারেজ অ্যাক্ট ১৯৩৯ এর সেকশন ২ এর ভিত্তিতে কেউ তালাক চাইলে তা স্ত্রীর দেনমোহরের অধিকারকে প্রভাবিত করবে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে স্বামী দেনমোহর দিতে অস্বীকার করলে তা আইনের মাধ্যমে আমরা কীভাবে দাবী করতে পারি? দেনমোহর আদায়ের জন্য মামলা প্রায় পাওনা টাকা আদায়ের মামলার মতই, যেখানে কোন চুক্তি অনুযায়ী টাকা পাওনা হলে সেটি আদায়ের জন্য মামলা করা হয় (এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার চুক্তিপত্র হচ্ছে নিকাহনামা/কাবিননামা)।

ফ্যামিলি কোর্ট অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫-এর অধিনে দেনমোহর আদায়ের বিষয়ে বিচারের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব পারিবারিক আদালতের রয়েছে। দেনমোহর আদায়ের মামলায় লিমিটেসন অ্যাক্ট ১৯০৮ প্রয়োগ করা যাবে, অর্থাৎ দেনমোহর দিতে যে তারিখে অস্বীকার করা হয়েছে তার থেকে তিন বছর পার হয়ে গেলে এবং বিবাহবিচ্ছেদ বা মৃত্যুর কারণে দিতে দেরি হলে।

অনেক মহিলা দেনমোহরের ধারনাটিকে প্রত্যাক্ষান করতে চান কারণ তারা মনে করেন যে এতে নারীর সম্মান কমে যায় এবং তাদের কেউ কেউ এটিকে “বউয়ের দাম দেয়া” মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এটি আসলে একধরনের নিরাপত্তা, সম্মান এবং অধিকার যা আমাদের আইন ও ধর্ম আমাদেরকে দিয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্বের মহিলারা আমাদের নিকাহনামার মত প্রিনাপশিয়াল এগ্রিমেন্ট (pre-nuptial agreements) বা বিবাহ-পূর্ববর্তী চুক্তির আশ্রয় নেন। যদি প্রিনাপশিয়াল এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে দাবী আদায় করলে একজন মহিলার সম্মান না কমে তাহলে নিকাহনামাকে অসম্মানজনক কিছু মনে করার কোন কারণ নেই, কারণ নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হওয়ার চাইতে সম্মানজনক আর কিছু হতে পারে না।

 

About the author

Maya Expert Team