আইনি পারিবারিক আইন বিবাহ

দত্তক নেয়া

বাংলাদেশে দত্তক নেয়া ব্যাপারটা খুব একটা প্রচলিত নয়। সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা স্রেফ পারিবারিক কারণে অনেকেই দত্তক নেয়ার কথা ভাবেন না। তবে, ইদানীং এই প্রচলনের পরিবর্তন হচ্ছে এবং অনেক পরিবারেই বাচ্চা দত্তক নেয়ার বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে।

যদি আপনি বাচ্চা দত্তক নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে আপনি গর্ভবতী হলে যেমনভাবে নিজেকে ও আপনার পরিবারকে প্রস্তুত করতেন, তেমনভাবেই প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। ঘর সাজান, নতুন কাপড় এবং খেলনা কিনুন। এরকম প্রস্তুতি নেয়াকে বলা হয়ে থাকে নেস্টিং (পাখির বাসা তৈরির মত) এবং দত্তক নেয়ার ক্ষেত্রে এই প্রস্তুতি খুবই জরুরি। এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়া আপনার পরিবারের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার বাবা-মা কিংবা আত্মীয়-স্বজন এটা না মানতে চায়, তাহলে তাদের সাথে বসুন, তাদের বুঝিয়ে বলুন কেন এই সিদ্ধান্তটা আপনার এবং আপনার সঙ্গীর জন্য আনন্দের। এ ব্যাপারে একটা সামান্য মতানৈক্যও আপনার দত্তক নেয়া শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রয়োজনে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, যিনি এ ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন। মাঝে মাঝেই তার সাথে দেখা করুন। শিশুটি এমন সামাজিক অবস্থান বা পরিবার থেকে আসতে পারে যে তার হয়তো বিশেষ চিকিৎসার দরকার হতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসক নিজেই হয়তো আপনাকে আগাম সর্তক করতে পারেন। শিশুটির প্রকৃত বাবা-মা’র স্বাস্থ্য সম্পর্কেও যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত তথ্য জেনে রাখুন। এমনকি বাচ্চাটির জন্মের সময় এবং পরে তার শারীরিক অবস্থা কি ছিল সেটা জেনে রাখা জরুরি। পরে যদি কোনো জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তখন আপনি এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ভ্যাক্সিনের বিষয়টিও নিশ্চিত হয়ে নিন। অনেক সময় দত্তক প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই ইপিআই সময়সূচি অনুযায়ী বাচ্চাদের সকল টিকা দিয়ে দেয়। এ ব্যাপারে আগেই নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো। নিউমোকক্কাস বা রোটা ভাইরাসের টিকা হয়তো আপনিও পরে কখনো দিয়ে নিতে পারেন। এ ব্যাপারে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে নিন। তাছাড়া, আপনি যদি বিদেশে থাকেন, তাহলে বাচ্চার আর বিভিন্ন ধরণের রোগ হবার ঝুঁকি বেড়ে যাবে, ফলে রোগের প্রতিরোধকও অনেক শক্তিশালী হতে হবে আগে থেকেই।

মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন, যে কোনো সময় যে কোনো ধরণের অস্বস্তিকর প্রশ্ন বা পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে।

যদিও অনেক অভিভাবকই এতে দ্বিমত পোষণ করবেন, তবু শিশু বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে বাচ্চাটি একটু বুঝতে শুরু করলেই তাকে সত্যটা জানিয়ে দেয়া উচিৎ। তবে কতটুকু তাকে জানাবেন সেটা নির্ভর করে তার মানসিক পরিপক্বতার ওপর। তাকে দত্তক নেয়া হয়েছে – এ কথা তাকে বলার পর যদি সে অস্বস্তিবোধ করে বা বিষণ্ণ হয়ে যায়, তাহলে তাকে আর কিছু না বলাই ভালো। তবে, বয়ঃসন্ধির সময় বা সাবালক হবার পর যদি সে কোনো প্রশ্ন করে তাহলে উত্তরে সত্যি কথাই বলুন। জনৈক বিউটি কুইন এবং অভিনেত্রী তার দত্তক নেয়া মেয়েকে শিখিয়েছেন যে তিনি তাকে অন্যদের মতো গর্ভে ধারণ করেননি, বরং হৃদয়ে ধারণ করেছেন, আর সে জন্যই মেয়েটি তার কাছে অনেক মূল্যবান । বাচ্চাকে বোঝানোর জন্য এটা অনেক সুন্দর একটা উদাহরণ হতে পারে।

দত্তক নেয়া শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত বাবা-মাকে তেমন আর কোনো বিশেষ সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়না। তাদের অন্য সব প্রয়োজন বা সমস্যা অন্যান্য বাচ্চাদের মতই।

যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বাচ্চাটি দত্তক নিয়েছেন কি না, তার উত্তরে মিথ্যা বলার দরকার নেই। যখন বাচ্চা একটু বড় হবে, তখন যদি তার সামনেই কেউ প্রশ্ন করে তাহলে খুব বিস্তারিত তথ্যগুলো এড়িয়ে যান। হয়তো সেগুলো জানলে বাচ্চার মনে আঘাত লাগতে পারে।

আবার বাচ্চাটি নিজেও একসময় তার প্রকৃত বাবা-মা’র ব্যাপারে কৌতুহলী হতে পারে। কখনো কখনো বাচ্চাকে হয়তো বলা হয় যে তার আসল বাবা-মা তাকে অনেক ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু তাকে লালন-পালন করার ক্ষমতা তাদের ছিলোনা। আর সেই কারণেই বাচ্চাটির জন্য তারা এমন একটা পরিবার খুঁজে বের করেছে যারা তাকে অনেক আদর-যত্নে রাখবে। বাচ্চা তার আসল বাবা- মা’র ব্যাপারে বেশি কৌতূহলী হয়ে পড়লে বা তাদের দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলে আপনার মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আর ঈর্ষাবোধ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে আপনি রুষ্ঠ না হয়ে বরং বোঝার চেষ্টা করুন কেন আপনার বাচ্চার এগুলো জানা জরুরি। আবার এমন নয় যে এ ব্যাপারে আপনি নিজে থেকেই তাকে উৎসাহী করবেন। তবে সে যদি আগ্রহ প্রকাশ করেই আর বাড়তি উদ্যোগ নিয়ে যদি তার প্রকৃত বাবা- মাকে দেখতে চায়, তাহলে এতে মনক্ষুণ্ণ হবারও কিছু নেই।

বাচ্চা দত্তক নিলে বর্ধিত পরিবারে সম্পত্তি সংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে একটা সংঘর্ষ তৈরি হতেই পারে। আগে থেকেই এ সম্পর্কিত সব কাগজপত্র তৈরি করে ফেলুন। এটা স্পষ্ট করে দিন যে আপনার বাচ্চা সম্পত্তির কতটুকু পাবে, এবং কোনো বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা ভাই-বোনকে বাচ্চার অধিকার রক্ষার দায়িত্ব দিন।

দত্তক নেয়া যে কেবল একটা পরিবারেই আনন্দ বয়ে আনে তা নয়, যে বাচ্চাটিকে দত্তক নিলেন তার জীবনটাও পাল্টে দেয়। নাহলে সে হয়তো একটা পথশিশু হিসেবেই বড় হতো। যেসব নারীরা গর্ভপাতের কারণে আর সন্তান ধারণ করতে পারেন না, বাচ্চা দত্তক নেয়ার কারণে তাদের সে সংক্রান্ত বিষণ্ণতা কেটে যায়। পঞ্চাশোর্ধ কোনো দম্পতি বাচ্চা দত্তক নেয়ার মধ্য দিয়ে হয়তো জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পায়।

আবার, বাচ্চা দত্তক নেয়ার কারণে বন্ধ্যাত্ব দূর হয়ে গেছে এমন ঘটনাও দেখা যায়। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে অনেক দম্পতিই হয়তো স্ট্রেস বা দীর্ঘ মানসিক চাপের কারণে সন্তান ধারণ করতে পারেন না। বাচ্চা দত্তক নেয়ার ফলে তাদের জীবনে যদি আনন্দ আসে তাহলে মানসিক চাপও কমতে থাকে এবং গর্ভধারণের জন্য সহায়ক হয়।

অনেকের জীবনেই শূন্যতা পূরণের জন্য বাচ্চা নেয়া একটি সুন্দর সমাধান। যদিও বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক কারণে এই প্রক্রিয়াটা খুব সহজ হয় না, এর ফলাফল এতো আনন্দদায়ক হয় যে সমস্যাগুলো শেষ পর্যন্ত তুচ্ছ মনে হয়।

About the author

Maya Expert Team