আইনি নারীর প্রতি সহিংসতা পারিবারিক নির্যাতন

কবে বদলাবে পুরুষের সহিংস মনোভাব?

কবে বদলাবে পুরুষের সহিংস মনোভাব?

“পারিবারিক সহিংসতার প্রতি শূন্য পরিমান সহনশীলতা দেখানোর কারণে একসময় যা ছিল আইনসিদ্ধ আচরণ তা আজকের বেশির ভাগ উন্নত দেশেই অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। নারীকে অবহেলা করার যে পুরুষতান্ত্রিক চেতনা শতক ধরে চলে এসছে, রাষ্ট্রের সামান্য সহযোগীতায় পুরুষের সেই আচরণ বদলে গেছে রাতারাতি।”

লুক ড্যানিয়েলস, সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক পরামর্শক এবং “পুলিং দ্য পাঞ্চেস: ডিফিটিং ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স” বইয়ের লেখক

নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস আচরণের পেছনে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক স্বভাব, নিজেকে নারীর চেয়ে শক্তিমান প্রমাণ করার সুতীব্র বাসনা। পৃথিবী শুরুর পর থেকে বহুবছর ধরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শরীরের শক্তির বলে পুরুষ থেকেছে ঘরের বাইরে আর “কমনীয় নমনীয়” নারীর ঠাই হয়েছে ঘরের চৌহদ্দিতে, ঘরকন্নার কাজ করতে আর সন্তান লালন পালন করতে। আমাদের দূর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের মতন দেশে এখনো চলছে পিতৃতান্ত্রিকতার জয়জয়কার।

ছোটবেলা থেকে বাড়ির ছেলেটাকে শেখানো হয় মেয়েটা নয়, সেই শ্রেষ্ঠ। সে বরাবরই তার বোনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। একটু দূর্বল হলে কিংবা আবেগ দেখালে তাকে ‘মেয়ে’ বলে গাল দেয়া হয়। এ থেকে ছেলেটা এ শিক্ষাই নেয় – মেয়েরা দূর্বল, মেয়ে হওয়া মানেই ঠাট্টার পাত্র হওয়া, মেয়েদের অবস্থান সবসময়ই ছেলেদের নিচে।

পুরুষত্ব আর নারীত্বের এই ধ্যান ধারনাগুলো পুরুষের শৈশব ছাড়িয়ে সাবালকত্বের গা বেয়ে বেয়ে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে, তারপর স্ত্রীকে কি করতে হবে আর কি করা উচিৎ সেটা ঠিক করে দেয়। সামাজিক-সাংষ্কৃতিক বিশ্বাসের এ মিশ্রনে (অনেক ক্ষেত্রেই যাকে ধর্মীয় আচরণ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মগ্রন্থে তার কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না।) নারীও বিশ্বাস করতে শুরু করে তারা দূর্বল এবং “দ্বিতীয় শ্রেণীর” নাগরিক।

জাতিসংঘের এক নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে এশিয়ায় জেন্ডার বৈষম্য সম্পর্কে পুরুষদের সচেতন করার পর নারীর প্রতি সহিংসতা দারুন ভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং চীনের ১০ হাজার পুরুষের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর বেশ কিছু বিষয় সামনে উঠে এসছে যেগুলো নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস আচরণের ব্যাখ্যা দেয়। এখানে দেখা যাচ্ছে পুরুষ-

যত রকম ভাবে সম্ভব তার সঙ্গীর উপর কর্তৃত্ব খাটাতে চায়

নারীর উপর পুরুষের অবস্থান এমন ধারণা পোষন করে

পুরুষালী ভাব দেখাতে পছন্দ করে

নারী (বিশেষত মা) কে নিপীড়নের বস্তু হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে বেড়ে উঠেছে

শারীরিক, মানসিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে

নিপীড়ন বন্ধ করার জন্য আমরা পুরুষদের উৎসাহিত করা, পাশে দাঁড়ানো, এবং নারী অধিকার নিয়ে কথা বলতে পুরুষদের কথা বলতে উৎসাহিত করতে হবে। ছেলেদের ভেতর একটা ভয় কাজ করে যে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলাটা হয়তো মেয়েলী ব্যাপার। এসব ধ্যান ধারনা বদলাতে হবে। পুরুষদের বুঝতে হবে শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত নারীরা তাদের শত্রু নয়। নারীর অধিকার এবং শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সেটা বরং সবার জন্যই ভালো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ সব কিছুর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই অজানা যে কোন কিছুই তাকে শংকিত করে তোলে। এই অভ্যাস ত্যাগ করা খুবই জরুরি।

এ গবেষণায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:

নারীর প্রতি সহিংসতা পুরোপুরি অগ্রহনযোগ্য করে তুলতে হবে (উদাহরন: সমাজের প্রতিষ্ঠিত যেসব মানুষ রয়েছে, যেমন ক্রিকেটার কিংবা অভিনেতাদের দ্বারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে)

পুরুষদের পৌরুষ দেখানোর অন্যপন্থা শেখানো যেতে পারে (উদাহরন: প্রশিক্ষন বা ক্রিড়া ভিত্তিক শিক্ষা দানের মাধ্যমে)

শিশুদের নিপীড়ন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং সুস্থ্য পারিবারিক বন্ধন তৈরি করা (উদাহরন: অভিভাবকদের প্রশিক্ষন দিয়ে বা শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার মধ্য দিয়ে।

তরুনদের সাথে কাজ করা বিশেষত কিশোরদের বোঝানো সুস্থ্য ও সম্মতির সাথে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কতটা জরুরী।

যেসব পুরুষ নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করে বিশেষত বৈবাহিক ধর্ষণের মতন অপরাধ করে তাদের কে কোন রকম প্রশ্রয় না দিয়ে, নারীর প্রতি সমস্ত সহিংস আচরনকে অপরাধ হিসেবে গন্য করার মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যাতে করে বিচার সহজ ও ত্বরান্বিত হয়।

এবং সব ধরনের জেন্ডার বৈষম্যকে তুলে দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় যা নিয়ে ভাবাটা খুব জরুরি, সেটা হল এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের ভূমিকা। এ লড়াইতে গণমাধ্যমের অনেক কিছু করার আছে। নারীকে ভোগ্য পন্য কিংবা যৌনতার প্রতিক হিসেবে তুলে ধরার যে প্রবনতা তা এখনো গণহারে দেখা যাচ্ছে। ব্রেভম্যান ক্যাম্পেইন নামের উদ্যোগ সারাদেশের স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুরুষতান্ত্রিক আচরণকে নিরুৎসাহিত করার কাজ করে যাচ্ছে। এই ক্যাম্পেইন সব বয়সী পুরুষকে নারীর বিরুদ্ধে যে কোন সহিংসতার প্রতিবাদ করতে শেখায়।

ব্রেভম্যান ক্যাম্পেই নিয়ে আরো জানতে ঘুরে আসুন-

About the author

Maya Expert Team