আইনি নারীর প্রতি সহিংসতা পারিবারিক নির্যাতন

অত্যাচারী সঙ্গী ও ভগ্ন পরিবার: বাংলাদেশের পারিবারিক সহিংসতা

বাংলাদেশে জেন্ডার ভিত্তিক অত্যাচার ও নির্যাতনকে ঘিরে যে সহিংসতাগুলো হয়ে থাকে তার মধ্যে সর্বোচ্চে একটি ধরণ হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল দ্বারা ২০১১ সালে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায় যে, এখানে প্রায় ৮৭ % বিবাহিত নারীকে তার স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হতে হয়। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি অনেক নারী তাদের শ্বশুর-শাশুড়ি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকেও যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতার শিকার হন। যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুরুতর শারীরিক বিকলঙ্গতা ও মানসিক যাতনার দিকে রূপ নিতে থাকে।

পারিবারিক সহিংসতার মত ঘটনাগুলো জরিপে উঠে আসার পরও কেন পারিবারিক সহিংসতা বাংলাদেশে এমন ভীতিকর হারে বেড়েই চলেছে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সমাজে আজও বিদ্যমান কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণকেই নির্দেশ করে। এমনকি নারীদেরও তাদের নিজ পরিবার ও সমাজে এটা শেখানো হয় যে, তাদের স্বামীর একবার একটু আঘাত তেমন কিছু না, বিবাহিত জীবনে এসব সাধারণ ব্যাপার। স্বভাবতই এই উপলব্ধির জন্য এবং নির্যাতিত নারীই সাধারণত কলঙ্কীত হবার ভয়ে বাংলাদেশের নারীরা এ অত্যাচারী সম্পর্কের মাঝেই থেকে যায়। ফলে তাদের প্রতি সহিংসতা ও মানসিক যাতনার ঘটনাগুলোর রিপোর্ট পুলিশের কাছে খুব কমই লিখানো হয়।

এ প্রসঙ্গে বলতে হয় যে, পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ করতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেই সাথে গৃহে ও বাইরে সকল ক্ষেত্রে অত্যাচার ও সহিংসতার প্রতি শূন্য সহনশীলতা শক্ত নীতি স্থাপন অনেক জুরুরী্।

এরসাথে পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ করতে আমাদের প্রথমে এটা জানা উচিত যে, ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর অত্যাচার কি ও এর ধরণটা আসলে কেমন। এর পাশাপাশি সহিংসতার এ চক্র থেকে বের হয়ে আসতে কি কি সহায়তা ও সেবা প্রদান করা হয়।

আসুন একটু দেখার চেষ্টা করি

পারিবারিক অত্যাচার অনুধাবন এ ধরণের অত্যাচার হচ্ছে পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণের একটি ধরণ। যা সাধারণত ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর উপর নিজের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে করা হয়। পরিবারে এমন কিছু আচরণ আছে যা শারীরিকভাবে আপনার ক্ষতি সাধন করে এবং আপনার মাঝে ভয়ের সৃষ্টি করে্। যেমন আপনার সঙ্গী আপনি যা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন তা করতে বাধা দেয় অথবা আপনাকে বাধ্য করে সে যা বলে তা করতে।

পারিবারিক অত্যাচার বোঝাতে দাম্পত্য জীবনের অত্যাচারকেও বোঝানো হয়। আর অত্যাচার তখনই হয় যখন একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে অথবা বিবাহিত বন্ধনে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ ও অধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তাই অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, পারিবারিক অত্যাচার যার সাথে শারীরিক সহিংসতাও নিহিত থাকে তাকেই পারিবারিক সহিংসতা বলে।

অত্যাচারীত সম্পর্কের লক্ষণসমুহ

অত্যাচারীত সম্পর্কের সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট হচ্ছে আপনার সঙ্গীকে ভয় পাওয়া। আর আপনি যদি এটা প্রতিনিয়ত অনুভব করতে থাকেন যে, আপনার সঙ্গী আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে যেমন-আপনি কি করছেন ও কি বলছেন তা নজরে রাখার চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি আপনি যদি প্রতিনিয়তই চাপ অনুভব করেন সমস্ত কিছুই তাদের ইচ্ছে মত করা জন্য তাহলে আপনাকে একটু সচেতন হতে হবে কেননা আপনার সম্পর্কটি অস্বভাবিক ও অত্যাচারিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

পারিবারিক সহিংতার ফলে নির্যাতিত অনেক নারীই তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন যে, তাদের সাথে মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই শুরু হয়ে যায়। মৌখিক অত্যাচারের বিষয়টি কথা প্রায় প্রত্যেকেই বলেছেন যা প্রারম্ভিকভাবে গালি থেকে চর মারা ও চুল ধরে টানার দিকে গড়াতে থাকে।

এক্ষেত্রে একটু বলতে হয় যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কাউকে অত্যাচার করা এবং কারো “গায়ে হাত দেয়া” এ বিষয় দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেননা এখানে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর গায়ে হাত দেয়াটা আজও গালি দেয়ার পর্যায়েই রাখা হয়। নারীদের এভাবেই বড় করা হয় যে বিয়ের পর স্বামীর দ্বারা এমন একটু আধটু হাত উঠেতেই পারে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যদি আপনার সঙ্গী আপনার উপর কখনো হাত তুলে তাহলে সে সম্পর্কটি অত্যাচারীত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা এ ধরণের ঘটনা একবার ঘটলে ভবিষ্যতে আবারো ঘটবার সম্ভাবনা রয়ে যায়।

অত্যাচারীত সম্পর্কের আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে আপনার সঙ্গী আপনাকে সবার কাছে ছোট করবে অথবা চেষ্টা করবে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। যা প্রতিনিয়ত আপনাকে হতাশা, অসহায়ত্ব এবং নিজেকে ঘৃণা করার মত অনুভূতি দিবে। আপনি যদি মনে করেন যে আপনি একটি অত্যাচারীত সম্পর্কের মাঝে আছেন তাহলে আপনার প্রতি আমাদের উপদেশ হবে যে, আপনার পাশে অনেক মানুষ আছেন যাদের সাহায্য আপনি নিতে পারেন। আপনি তাদের সাথেও কথা বলতে পারেন যারা “মায়া ভয়েসে” একই ধরণের সমস্যা শেয়ার করেছেন। আপনি আমাদের আইনি বিশেষজ্ঞকেও জিজ্ঞেস করতে পারেন আপনার করণীয় এবং আপনার অধিকার সম্পর্কে। আপনি আপনার নিকটস্থ “অন স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওএসসিসি)” এও যোগাযোগ করতে পারেন। আপনি এটি ম্যাপে দেখে নিন এবং খুঁজে বের করুন কোনটি আপনার নিকটস্থ। তাদের হেল্পলাইনের একটি তালিকাও সেখানে দেয়া আছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে) এমননি একটি সংস্থা যেটি নারীদের জন্য কাজ করে। আপনি তাদের সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করতে পারেন। “ব্লাস্ট” হচ্ছে আরেকটি সংস্থা যা তাদেরই সাহায্য দেয় যারা দারিদ্র্য অথবা অসুবিধা বা বৈষম্যের সম্মুখীন।

About the author

Maya Expert Team