আইনি নারীর প্রতি সহিংসতা পারিবারিক নির্যাতন

ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা: লক্ষণ, ধরণ এবং প্রভাব

জীবনে সঙ্গীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা এবং অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়ানো বাস্তব এবং স্বাভাবিক। ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাস এবং পছন্দ অনুযায়ী সম্পর্ক ভিন্ন ভিন্ন হয়। আমরা সম্পর্কে জড়াই ভবিষ্যৎ বন্ধু, সঙ্গী, রক্ষাকারীকে পাওয়ার আশায়। কিন্তু অনেক সময় আমাদের এই কাছের মানুষগুলো যারা আমাদের ভালোবাসা এবং নিরাপত্তা দেয়ার কথা ছিল তারাই আমাদেরকে সবচেয়ে বাজে ভাবে অবমাননা করে, নির্যাতন করে। এমন পরিস্থিতিতে কি করা উচিত তা অনেক সময়ই আমরা বুঝতে পারি না। তবে নারীরা সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে বেশীরভাগ সময়ই ব্যাপারটা এড়িয়ে যান।

অন্তরঙ্গ সম্পর্কে কখন অন্তরঙ্গতা ভয়ে পরিণত হয় আর কখন নির্যাতনের শুরুটা হয় সেটা কীভাবে বুঝবেন? কীভাবে নিজেকে এরকম পরিস্থিতিতে বাঁচাবেন? আপনার সঙ্গী যদি হিংস্র হয়ে উঠে তখন আপনি কি করবেন, কোথায় সাহায্য চাইবেন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অন্তরঙ্গ সঙ্গী হচ্ছে একজন স্বামী, একসাথে বাস করেন এমন সঙ্গী, বয়ফ্রেন্ড বা প্রেমিক, প্রাক্তন স্বামী, প্রাক্তন সঙ্গী, প্রাক্তন প্রেমিক। শারীরিক, মানসিক বা যৌনভাবে নির্যাতন করা যেমন, শারীরিক অত্যাচার, জোর করে যৌন সম্পর্ক, মানসিকভাবে অত্যাচার করা, নিন্ত্রন করতে চাওয়া অন্তরঙ্গ সম্পর্কে নির্যাতন ও হিংস্রতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সংজ্ঞায় বর্তমান ও প্রাক্তন উভয় সঙ্গীর ব্যবহারের কথাই বলা হয়েছে। এর সাথে সম্পর্ক আছে এমন কিছু টার্ম হচ্ছে পারিবারিক নির্যাতন, স্বামী বা স্ত্রীর অবমাননা, স্বামী বা স্ত্রী নির্যাতন। ডেটিং হিংস্রতা বলতে তরুণ-তরুণীদের প্রেমের সম্পর্ক যেখানে তারা একসাথে থাকেন না সেই সম্পর্কে নির্যাতনের ক্ষেত্রে বলা হয়।

সম্পর্ক কখন অবমাননাকর এবং হিংস্র হয়ে উঠতে পারে তার কিছু নির্দিষ্ট লক্ষন আছে। আপনি নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন, কোথায় সাহায্য চাইবেন তাও আপনি এখান থেকে জানতে পারবেন।

আইপিভি এর লক্ষন

আপনার সঙ্গী কখন হিংস্র হয়ে উঠছেন তা লক্ষ করা আপনার জন্য কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিন এশিয়ার বিভিন্ন স্থানেই নারীদের শেখানো হয় স্বামী তাদের সাথে শারীরিক সম্পরকের ক্ষেত্রে জোর করতেই পারে। কিন্তু সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, জোর করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন মানেই ধর্ষণ। আপনার সঙ্গীর কটু কথা, গালিগালাজকে আপনি হিংস্র ব্যবহাড় না ভেবে হয়তো স্বাভাবিক ভাবছেন। কিন্তু আপনার সঙ্গীর আপনার আবেগকে আঘাত করাটা ভবিষ্যতে শারীরিক নির্যাতনে পরিনত হওয়ার লক্ষন।

নিচে একজন অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সম্ভাব্য হিংস্র আচরণগুলো দেওয়া হলঃ

  • আপনি কি করছেন সবসময় তার নজরদারি করা
  • অযথাই আপনাকে অবিশ্বস্ত বলে দোষারোপ করা
  • আপনাকে বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে না দেয়া বা বাধা দেওয়া
  • কাজে বা পরালেখায় বাধা দেওয়া
  • অ্যালকোহল বা মাদক নেওয়ার পর আপনার সাথে খারাপ আচরণ করা বা রেগে যাওয়া
  • আপনার টাকাপয়সা নিজের কাছে রাখা, আপনি কীভাবে খরচ করছেন তা নিয়ন্ত্রণ করা
  • আপনার দরকারি ওষুধ নেওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা
  • আপনার নিজস্ব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া (আপনি কি পরবেন বা খাবেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া)
  • সবার সামনে আপনাকে অপমান করা
  • আপনার দরকারি বা পছন্দের কিছু নষট করে ফেলা
  • আপনাকে, আপনার সন্তানকে, পোষা প্রানিকে আঘাত করার হুমকি দেওয়া
  • আপনাকে মেরে, ধাক্কা দিয়ে, চিমটি, ঘুষি, লাথি বা কামড় দিয়ে শারীরিক ভাবে আঘাত করার হুমকি দেওয়া বা আঘাত করা
  • আপনাকে কোন অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার হুমকি দেওয়া বা আঘাত করা
  • আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনার সাথে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করা
  • জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করা বা আপনাকে সন্তান নিতে জোর করা
  • নিজের হিংস্র ব্যবহারের জন্য আপনাকে দায়ী করা
  • রেগে গিয়ে নিজেকে আঘাত করার হুমকি দেয়া
  • আপনাকে সবসময় চাপে রাখা, নিয়ন্ত্রণ করে রাখা
  • “আমি না পেলে আর কেউ তোমাকে পাবে না” -এধরনের কথা বলা

আপনার সঙ্গী যদি আপনার সাথে এধরনের কোন আচরণ করে থাকে তবে আপনার বোঝা উচিত যে আপনাদের সম্পর্ক হচ্ছে হিংস্র আর আপনার সঙ্গী আপনার সাথে যে আচরণগুলো করছে তা অনৈতিক। আপনার শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এ ধরনের আচরণ অনেক খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অবমাননা একটি প্রকট সামাজিক এবং শারিরিক সমস্যা যা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ নারীর জীবনে প্রভাব ফেলে। শুধু শারীরিক বা সামাজিক নয়, এর কারণে মানসিক অনেক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। আর এই আচরণ শুধু শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনে সীমাবদ্ধ নয়, যৌন, অর্থনৈতিক বিভিন্ন ভাবেই এই অবমাননা হয়ে থাকে।

অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অবমাননার প্রকারভেদ

অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অবমাননা অনেক ধরনের হতে পারে, কোন ব্যক্তি একই সাথে কয়েক ধরনের অবমাননার শিকার হতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অবমাননা হচ্ছেঃ

১। শারীরিক নির্যাতন

২। মৌখিক, আবেগিয় এবং মানসিকভাবে নির্যাতন

৩। যৌন নির্যাতন

৪। অর্থনৈতিক নির্যাতন

শারীরিক নির্যাতন

সবচেয়ে বেশী হয়ে থাকা নির্যাতন হচ্ছে শারীরিক নির্যাতন যার কারণে বিভিন্ন ধরনের আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সবচেয়ে বেশী দেখা যায় এবং সবচেয়ে ক্ষতিকর নির্যাতন হচ্ছে এটি। শারীরিক নির্যাতন সবসময় ছোট থেকেই শুরু হয়, হয়তো ঝগড়ার সময় ছোট একটা ধাক্কা, কব্জি ধরে হাত মুচড়ে দেওয়া দিয়ে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বড় ধরনের নির্যাতনের দিকে চলে যায়। এর ফলাফল স্বরূপ ভিকটিমের মৃত্যুও হতে পারে। শারীরিক ভাবে জোর করা থেকে শুরু করে হতায় পর্যন্ত সবই শারীরিক নির্যাতন। মার দেওয়া, লাথি দেওয়া, ঘুসি দেওয়া, চড় দেওয়া, গলায় ফাঁস দেওয়া, ঝাকুনি দেওয়া,পুড়িয়ে দেওয়া,ঠাণ্ডা লাগিয়ে দেওয়া, ধাক্কা দেওয়া, চিমটি দেওয়া, কেটে দেওয়া, কামড় দেওয়া, কিছু ছুড়ে মারা, অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা- এসবই শারীরিক নিরযাতনের অন্তর্ভুক্ত। অসুস্থ ব্যক্তির ওষুধ লুকিয়ে রাখা, ওষুধ নিতে দেরি করিয়ে দেওয়া- এসবও শারীরিক নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত।

মৌখিক, আবেগিয় এবং মানসিক নির্যাতন

আবেগিয়,মানসিক এবং মৌখিক নির্যাতন সাধারণত শারীরিক নির্যাতনের সাথে হয়ে থাকে যা শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও ক্ষতিকর। অযৌক্তিক দাবি করা, ইচ্ছে করে টেনশন বোধ করানো, অপরাধবোধ করানো, কথা এবং কাজের মাধ্যমে সঙ্গীকে হীনমন্যতায় ভোগানো, সঙ্গীর মতামত ও প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করা এধরনের নির্যাতনের মধ্যে পড়ে। এধরনের ব্যবহার করে ব্যক্তিকে ভয় এবং জোর করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। গালি দেওয়া, চিৎকার করা, অপমান করা, সবার সামনে ছোট করা, ভয় দেখানো, একা করে ফেলা, জোর করা, সঙ্গীর শারীরিক কোন ব্যাপার নিয়ে মজা করা, অপমান করা, সঙ্গীর পরিবার নিয়ে অপমান করা, সঙ্গীকে মেরে ফেলা বা আঘাত করার হুমকি দেওয়া, সঙ্গীর সম্পত্তি নষ্ট করা, সঙ্গীর সুনাম ক্ষুণ্ণ করা, এধরনের ব্যবহার করেও অস্বীকার করা, নিজের ব্যবহারের জন্য অন্যকে দোষারোপ করা এসবই মানসিক ও আবেগিয় নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত।

যৌন নির্যাতন

যৌন নির্যাতন বলতে জোর করে যে কোন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণকে বোঝায়। অপ্রীতিকর স্পর্শ, জোর করে করা যৌন সম্পর্ক, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক সেটা যেমনই হোক না কেন, যৌন সম্পর্কের সময় আঘাত করা বা অপমানমূলক আচরণ করা( যেমন, ভিকটিম এর গায়ে মুত্র ত্যাগ), গায়ে হাত দেওয়া, যৌনাঙ্গে আঘাত করা, পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা, সঙ্গী অসুস্থ থাকলে বা না চাইলেও জোর করে সহবাস করা, জোর করে নগ্ন হতে বাধ্য করা, কোন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সহবাসে বাধ্য করা, ডেট রেপ বা দাম্পত্য জীবনে ধর্ষণ, খুবই ঈর্ষাপরায়ণতা দেখানো, নেতিবাচক মন্তব্য করা, যৌন কার্যক্রমের সময় ফটো বা কোন ভিডিও করা, যৌনতা সংক্রান্ত নেতিবাচক মন্তব্য করা, গালিগালাজ করা, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত, যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া এসবই যৌন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে।

অর্থনৈতিক নির্যাতন

ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা, শিক্ষা এবং কাজের সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে অর্থনৈতিক নির্যাতন। এই নির্যাতন বিভিন্ন রপে হতে পারে, সঙ্গীকে টাকা পয়সা থেকে বঞ্চিত করে রাখা, সঙ্গীর উপরে সকল অর্থনৈতিক দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া, টাকা পয়সা লুকিয়ে রাখা, অর্থনৈতিক ব্যাপার সঙ্গীকে না জানানো ইত্যাদি এই নির্যাতনের নানান ধরণ।

আইপিভি এর প্রভাব

অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অবমাননায় শুধু এর শিকার মানুষদের উপরেই প্রভাব পড়ে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপরও এর প্রভাব পড়ে। যেসব পরিবারে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের অবমাননা হয়ে থাকে সেসব পরিবারের শিশুরা শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায় ভোগে, হিংস্র আচরণ, পরালেখায় পিছিয়ে থাকা,শিখতে সমস্যা হওয়া- এধরনের সমস্যাও দেখা যায়। কেউ কেউ বড় হয়ে অবমাননা ও নির্যাতনকারি হয়ে উঠে। যেসব গর্ভবতী মায়েরা এ সময়ে আইপিভি এর শিকার হন তাদের শিশুরা প্রিম্যাচুর, খুবই কম ওজন নিয়ে জন্মানোর আশঙ্কা থাকে। নবজাতক মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে এসব ক্ষেত্রে।

অন্তরঙ্গ সম্পর্কে নির্যাতনের ক্ষেত্রে আপনার, আপনার পরিবারের, এমনকি আপনার সঙ্গীরও দ্রুত সাহায্য নেওয়া উচিত। হিংসাত্মক ব্যবহার দূর করতে শুরু থেকেই সাহায্য চাইতে কোন লজ্জা নেই, বরং এধরনের ব্যবহার করা ও এমন ব্যবহার সহ্য করাটাই লজ্জাজনক।

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment