অন্তরঙ্গ সম্পর্কে সহিংসতা আইনি নারীর প্রতি সহিংসতা

ঘনিষ্ঠতা যখন সহিংসতার রূপ নেয়

‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে – বুঝবে সেদিন বুঝবে!’ কবির এ অভিব্যাক্তি তোমার বাস্তব জীবনের অনুভূতি হোক এটা আমরা চাই না। ভালবাসার মানুষটিকে তোমার মন-প্রাণ দিয়ে তুমি ভালবাসবে এটাই আমরা চাই। কিন্তু তোমার কাছের মানুষটিকে তুমি যেমনটা চেয়েছিলে তেমনটা যদি না হয় তাহলে তুমি কি করবে?

প্রথম দিকের ছোট ছোট পাওয়াগুলো দুজনেরই অনেক ভাল লাগতে থাকে। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখবে যে, যে বিষয়গুলো দুজনেই অনেক উপভোগ করতে তা হয়ত আর করছ না। তুমি যখন তোমার কাছের মানুষটিকে পুরোটা বিশ্বাস করতে শুরু করবে তখন তার সাথে তোমার ঘনিষ্ঠতা অনেক বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কেননা তোমার মাঝে এ বিশ্বাসটি জন্মায় যে এ মানুষটি তোমায় কখনো আঘাত করবেনা, কষ্ট দিবেনা। আর পরস্পরের উপর এ বিশ্বাস যখন বাড়তে থাকে তখনই বাড়তে থাকে পরস্পরের কাছে প্রত্যাশা।

তোমার সঙ্গী হয়ত তোমাদের সম্পর্কের আরো একটু উচ্চ পর্যায় তথা শারীরিক সম্পর্কে যেতে চাইবে, যেটা তুমি চাওনা। এখন তোমার সঙ্গী হয়ত শারীরিক সম্পর্কে যাবার জন্য নানাভাবে তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। আর কাছের মানুষটিকে খুশি করতে তুমিও হয়ত অনেক কিছুই করবার চেষ্টা করবে। কিন্তু কালকে হয়ত এমনি কিছু করার জন্য তোমায় জোর করবে যেটাতে তুমি মোটেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করনা। মনে রাখবে মানসিক অত্যাচারই একসময় শারীরিক অত্যাচারের রূপ নেয়।

যখন তোমার কাছে তোমার সঙ্গীর প্রত্যাশা অনেক বাড়তে থাকে যেগুলোর সাথে তুমি মোটেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো না, তখন তুমি কি করবে? তোমার সবসময় একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, তোমার সঙ্গী তোমাকে কি মানসিক বা শারীরিকভাবে জোর করছে নাকি । তোমার সঙ্গীর এমন কিছু আচরণ যেটাকে তুমি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারোনা সেটা সম্পর্কে তোমার একটু সচেতন হতে হবে। কেননা কেউ তোমার মতামত বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক বা মানসিকভাবে কখনই জোর করতে পারেনা, এটি একটি বিবাহিত দম্পত্তির ক্ষেত্রেও সত্য। এটা আইন বিরোধী একটি কাজ।

আর এ মুহূর্তগুলোতে তোমাকে একটু বেশিই সচেতন হতে হবে। কেননা যখনই তুমি তোমার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা অত্যাচারের শিকার হবে তখন তোমাকে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে তোমার সঙ্গীর বাইরে কারো সাথে যৌন সম্পর্ক থেকে থাকেতে পারে। আর সে হয়ত তোমার সাথে যৌন সঙ্গমের সময় কনডমও ব্যবহার করতে চাইবে না। যা তোমার এইচআইভি সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

যদিও ’মায়া আপা’তে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা সম্পর্কিত প্রশ্নের সংখ্যা খুব কম (প্রায় ৩%) তাও এটা দিয়ে এর বাস্তব সংখ্যাটি কেমন তা বোঝা যায় না। এর প্রকৃত কারণ এই যে আমাদের মাঝে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা সম্পর্কে ধারণা খুব কম। ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার লক্ষণগুলো জেনে নাও । সে সাথে আরো জেনে নাও কিভাবে তুমি নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে.

যদি তুমি মনে করো যে তোমার সঙ্গী তোমার উপর অত্যাচার করছে তাহলে বেশ কিছু বিষয় তোমাকে মাথায় রাখতে হবে যেগুলো তোমাকে অনেকটা নিরাপদ রাখবে। যেমন-

  • যখন তোমার সঙ্গীর সাথে তোমার কোন বিষয় নিয়ে বিবাদ হবে এবং তুমি মনে করবে যে তোমাকে আঘাত করার সম্ভাবনা আছে সে মুহুর্তে তুমি নিজেকে রান্নাঘর বা যেসমস্ত স্থানে তোমাকে প্রহার করবার মত হাতিয়ার থাকে সেসমস্ত জায়গা থেকে নিজেকে দূরে রাখবে।
  • নিজ সন্তানকে এ মুহূর্তগুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে।
  • নিজ পরিবারের সদস্য, বাবা-মার সাথে বিষয়টি শেয়ার করবে।
  • প্রয়োজন হলে সরাকারি হেল্পলাইন নাম্বারে (১০৯২১ অথবা ০১৭১৩৩৯৮৩১৮ ) ফোন করবে।
  • যদি তোমার সঙ্গী তোমায় প্রহার করে তাহলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা সেবা নিবে।
  • পারলে তোমার আঘাতগুলোর ছবি তুলে রাখবে।
  • তোমার কাছে সবসময় ফোন রাখার চেষ্টা করবে যাতে তুমি জরুরী নাম্বারগুলোতে তাড়াতাড়ি কল করতে পারো।
  • বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর সাথে বিষয়টি আগে থেকেই শেয়ার করে রাখবে এবং এ মুহূর্তগুলোতে তাদের তাড়াতাড়ি সাহায্য পেতে কোন প্রতীকি শব্দ বা যন্ত্র ব্যবহার করবে।
  • ছোট একটি ব্যাগে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আগে থেকেই গুছিয়ে রাখবে যাতে প্রয়োজনে তুমি তাড়াতাড়ি সেগুলো নিয়ে বাইরে চলে যেতে পারো।

যাদের এ ধরণের সহিংস সম্পর্কের কোন ধারণা নাই তারা এটা হরহামেশাই বলে থাকে যে “কেন মেয়েটি এত অত্যাচার সহ্য করে এখনও তার সাথে অবস্থান করছে?” কিন্তু কেন একটি মেয়ে এ অত্যাচারীত সম্পর্কেই থেকে যাই সেটা আমরা বুঝি। তোমার হয়ত আর্থিক কোন সমস্যা থেকে থাকতে পারে। সমস্ত কিছু ছেড়ে চলে আসার পর তোমার হয়ত নিজেকে ও সন্তানকে সহায়তা করা অনেক কষ্টের হতে পারে। তোমার পরিবার বা বন্ধুদের সাহায্য নেয়াটাও হয়ত অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথবা তুমি ভীত ও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছ যে আদৌ তুমি ছেড়ে যেতে পারবে কিনা।

তুমি যদি মনে করে থাকো যে, তুমি সে মানুষটির সাথে আর থাকবে না তাহলে একটি বিষয় মনে রাখবে যে, এ অত্যাচার আরো বাড়তে পারে। তাছাড়া তোমার আরো ভালো ও সুস্থ্য থাকার অধিকার রয়েছে। এরপরও তুমি যদি মনে করো যে সে পরিবর্তিত হতে পারে এবং তুমি সেখানেই থাকবে তাহলেও কিছু বিষয় তোমায় অবশ্যই খেয়াল করতে হবে। দেশে বেশ কিছু সংস্থা রয়েছে যারা নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করে। ব্লাস্ট এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র তেমনই ‍দুটি সংস্থা যেখান থেকে ‍তুমি সাহায্য পেতে পার। এর পাশাপাশি মায়া আপা কেও তোমার বিষয় খুলে বলতে পার।

About the author

Maya Expert Team