ইটিং ডিজঅর্ডার বা খাদ্যে অনীহা

পরিচিতি

খাদ্যে অনীহা হচ্ছে খাবার গ্রহণের প্রতি এক ধরণের অস্বাভাবিক আচরণ যা কোনো ব্যক্তির খাদ্য গ্রহণ প্রণালি ও আচরণে পরিবর্তন আনে। খাদ্যে অনীহাে আক্রান্ত ব্যক্তি তার ওজন, দেহের গঠনের প্রতি অত্যাধিক মনোযোগ দেয় যার ফলে সে খাবারের ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সাথে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়।

খাদ্যে অনীহার ধরণ

খাদ্যে অনীহার ফলে সৃষ্ট সমস্যা গুলি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ধরণগুলো হচ্ছেঃ

  • অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা- যখন কেউ তার ওজন যতটুকু সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করে, উদাহরণস্বরূপ নিজেকে অনাহারী রেখে বা অত্যাধিক ব্যায়াম করে।
  • বুলিমিয়া- যখন কেউ অতিরিক্ত খাবার খায় তারপরে ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থ হয় অথবা জোলাপ (অন্ত্র খালি করার ঔষধ) খেয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
  • অত্যাধিক খাদ্যগ্রহণ- যখন কেউ অত্যাধিক খাদ্যগ্রহণে নিজেকে বাধ্য মনে করে।

কিছু কিছু ব্যক্তি, বিশেষ করে তরুণ বয়সীদের ক্ষেত্রে খাদ্যে অনীহার অরেকটি ধরন দেখা যায় (eating disorder not otherwise specified – EDNOS)। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, অ্যানোরোক্সিয়া কিংবা বুলিমিয়া’র মত খাদ্যে অনীহার সব প্রধান বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হবে না, কিন্তু কিছু কছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে তারা খাদ্যে অনীহা-তে আক্রান্ত থাকবে।

খাদ্যে অনীহার কারণসমূহ

এ সমস্যার কারণ হিসেবে প্রায়ই শুকনা থাকার সামাজিক চাপকে দায়ী করা হয়, কেননা ব্যক্তি হিসেবে তরুণেরা নির্দিষ্ট ধরনের চেহারায় নিজেদের দেখতে চায়। তবে প্রকৃতপক্ষে, খাদ্যে অনীহার কারণগুলো আরো জটিল।

এর পিছনে জীনগত কারণ অথবা অন্য প্রভাবক থাকতে পারে, সেই সাথে এমন ঘটনা থাকতে পারে যা এই সমস্যাকে চালিকাশক্তি দেয় এবং রোগটিকে ধারাবাহিক করার জন্য অন্যান্য কারণগুলো অনুপ্রেরণা দিতে পারে।

যেসব কারণ কাউকে খাদ্যে অনীহায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে বা সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, সেগুলো হলোঃ

  • খাদ্যে অনীহা, বিষন্নতা কিংবা ড্রাগ নির্ভরশীলতা প্রভৃতি মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকার পারিবারিক ইতিহাস
  • শরীরের গঠন, খাদ্যাভ্যাস বা ওজনের জন্য যদি সমালোচিত হতে হয়
  • শরীরর গঠন পাতলা রাকাহার বিষয়ে অত্যাধিক চিন্তিত থাকলে, বিশেষ করে এর সাথে সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রেও শুকনা থাকার চাপ (উদাহরণস্বরূপ ব্যালে নৃত্যশিল্পী, মডেল অথবা ক্রীড়াবিদ) যুক্ত হলে
  • কিছু নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকলে, যেমন অবসেসিভ পার্সোনালিটি, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, কম আত্মসম্মানবোধ অথবা সবকিছু নিখুঁত করতে চাওয়ার প্রবণতা থাকা
  • বিশেষ ঘটনা, যেমন যৌন অথবা মানসিক নিপীড়ন অথবা কাছের কারো মৃত্যু
  • পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্ক ভালো না থাকা
  • চাপযুক্ত পরিস্থিতি, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যালয় অথবা কর্মক্ষেত্রে সমস্যা

আমি কী খাদ্যে অনীহা-তে আক্রান্ত?

খাদ্যে অনীহা-তে আক্রান্ত কী না তা বুঝতে ডাক্তাররা অনেক সময় “স্কফ” প্রশ্নাবলী (SCOFF-Sick,Control,OneStone,Fat,Food) নামক কিছু প্রশ্ন করে থাকেন। এতে ৫টি প্রশ্ন অন্তর্ভূক্ত থাকেঃ

  • অসুস্থঃ অস্বস্তিকরভাবে পেট ভরা মনে হলে আপনি কি কখনো নিজে নিজেকে অসুস্থ কী করে তুলেন?
  • নিয়ন্ত্রণঃ খাদ্য গ্রহণের পরিমাণের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন ভেবে কী আপনি দুশ্চিন্তা করেন?
  • এক স্টোন সম্প্রতি গত ৩ মাসকালের মধ্যে আপনি কি ১ স্টোন-এর (৬ কেজি) চেয়েও বেশি ওজন হারিয়েছেন?
  • মোটাঃ অন্যরা খুবই পাতলা বললেও আপনি কী বিশ্বাস করেন যে আপনি মোটা?
  • খাবারঃ আপনি কি মনে করেন যে খাবার আপনার জীবন নিয়ন্ত্রণ করে?

যদি দুই বা ততোধিক প্রশ্নের উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে আপনি খাদ্যে অনীহা নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

অন্যদের মধ্যে খাদ্যে অনীহা শনাক্ত করা

প্রিয় কোনো ব্যক্তি অথবা বন্ধু খাদ্যে অনীহা-তে আক্রান্ত থাকলে তা বুঝতে পারা প্রায়ই অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যেসব সতর্কীকরণ লক্ষণ দেখতে হবে, সেগুলো হলঃ

  • খাবার গ্রহণ না করা
  • তাদের ওজন স্বাভাবিক কিংবা তার চেয়ে কম হলেও, মোটা হওয়ার জন্য অনুযোগ করা
  • বারবার নিজের ওজন মাপা এবং আয়নাতে নিজেদের দেখা
  • তারা ইতিমধ্যে খেয়ে ফেলেছে কিংবা অল্প সময়ের মধ্যে বাইরে কোথাও খেতে যাবে এরকম দাবি বারবার করা
  • অন্যদের জন্য ভারী অথবা আড়ম্বরপূর্ণ খাবার তৈরি করা কিন্তু নিজেরা সে খাবার কম খাওয়া কিংবা একদম না খাওয়া
  • অন্যদের উপস্থিতিতে কেবল লেটুস বা সেলেরির মতো কম-ক্যালরি সম্পন্ন কিছু খাবার খাওয়া
  • রেস্তোরার মত জনবহুল জায়গায় খেতে অস্বস্তিবোধ করা বা প্রত্যাখ্যান করা
  • “প্রি-অ্যানোরেক্সিয়া” মূলক ওয়েবসাইটসমূহ ব্যবহার
  • যদি কোনো বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যকে নিয়ে আপনি চিন্তায় থাকেন, তাহলে কী করতে হবে তা জানা কঠিন হতে পারে। কারন খাদ্যে অনীহা-তে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারনত গোপনীয়তা বজায় রাখে, তাদের খাদ্য গ্রহণ, ওজন নিয়ে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে থাকে এবং অসুস্থ থাকার বিষয়টি সহজে মেনে নিতে চায় না।

কারা খাদ্যে অনীহায় আক্রান্ত হন?

যদি নির্দিষ্ট কিছু বয়সী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাদ্যে অনীহা সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তবে যেকোন বয়সী ব্যক্তিরা এতে আক্রান্ত হতে পারেন।

জীবনকালে ২৫০ জন মহিলার মধ্যে ১জন এবং ২০০০ পুরুষের মধ্যে অন্তত ১জন অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসাতে আক্রান্ত হোন। ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে সমস্যাটি সৃষ্টি হয়।

অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসাতে থেকে বুলিমিয়া ৫ গুণ বেশি দেখা যায় এবং  বুলিমিয়াতে আক্রান্ত ৯০% ব্যক্তিই হচ্ছে মহিলা। ১৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে সাধারণত এটি সৃষ্টি হয়।

অত্যাধিক খাদ্যগ্রহণ জাতীয় ডিজঅর্ডার সাধারণত পুরুষ ও মহিলা উভয়ই আক্রান্ত হোন এবং এ সমস্যা মূলত জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে অর্থাৎ ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে পরিলক্ষিত হয়। অত্যাধিক খাদ্যগ্রহণকে সুনির্দিষ্ট ভাবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন হওয়ার এ সমস্যার ব্যাপ্তি আসলে কতটুকু তা সহজে বোঝা যায় না।

খাদ্যে অনীহার চিকিৎসা

চিকিৎসা গ্রহণ না করলে এ রোগের কারণে ব্যক্তির কাজ অথবা বিদ্যালয়ের কাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। শারীরিক ক্ষেত্রে এ রোগের প্রভাব কখনো কখনো মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়।

খাদ্যে অনীহার চিকিৎসা থাকলেও তা নিরাময় হওয়া সময়সাধ্য ব্যাপার। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে সুস্থ হওয়ার ইচ্ছা থাকা গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবার, বন্ধুদের সমর্থন ও সহযোগিতা অমূল্য।

চিকিৎসার জন্য মূলত রোগীর শারীরিক স্বাস্থ্য নিরীক্ষার পাশাপাশি অন্তর্নিহিত মানসিক সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে সে ব্যাপারে তাকে সহযোগীতা করা হয়। এর মধ্যে আছেঃ

  • একজন থেরাপিস্টের বা অন্যান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিজে শেখার ম্যানুয়াল এবং বই পড়ে নিজের চিকিৎসা করা।
  • কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি) – একজন কীভাবে কোনো পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করে, সেটাতে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে এই চিকিৎসা পদ্ধতি কাজ করে। যা পরিবর্তীতে কিভাবে তারা আচরন করে সেটাতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।
  • ব্যাক্তিগত সাইকোথেরাপি- কথা বলার মাধ্যমে পরিচালিত থেরাপি যা পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করে।
  • খাদ্য সম্পর্কিত কাউন্সেলিং – কথা বলার মাধ্যমে পরিচালিত থেরাপি যা ব্যক্তিকে স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্থ করতে সাহায্য করে।
  • সাইকোডাইনামিক থেরাপি – এক ধরণের কাউন্সেলিং যা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও জীবনের অভিজ্ঞতা কীভাবে তাদের বর্তমান চিন্তা-চেতনা, অনুভব, সম্পর্ক ও আচরণকে প্রভাবিত করে, তাতে মনোযোগ দেয়।
  • পারিবারিক থেরাপি- পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে পরিচালিত থেরাপি যেখানে খাদ্যে অনীহা কীভাবে তাদেরকে এবং তাদের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে সে সম্পর্কে আলোচনা হয়।
  • ঔষধ- উদাহরণস্বরূপ, বুলিমিয়া নারভোসা অথবা অত্যাধিক খাদ্যগ্রহণের ডিজঅর্ডার চিকিৎসার জন্য সিলেকটিভ সেরেটোনিন রিআপটেক ইনহিবিটরস (SSRIs) নামক এক জাতীয় বিষন্নতা দূরকারী ঔষধ দেওয়া হতে পারে।