নারী স্বাস্থ্য- প্রসব এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিজারিয়ান প্রসব

সিজার কি?

সিজার কি?
সিজার হচ্ছে মায়ের পেট ও জরায়ুর দেয়াল কেটে বাচ্চা প্রসব করানোর একটা পদ্ধতি

সিজার হতে পারেঃ
১) পরিকল্পিত  (প্ল্যান্ড/ইলেক্টিভ) – গর্ভাবস্থায়ই যখন সিজার করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে বা মা নিজ ইচ্ছায় যখন সিজার করাতে চান।
২)জরুরী (ইমারজেন্সি)  – যখন মা বা বাচ্চার কোনও সমস্যার কারনে সিজার করা হয়।

সিজার করা হয় কোমরের নিচ থেকে অবশ করে। এর প্রভাব ৩০-৪৫ মিনিট পর্যন্ত থাকে। একে স্পাইনাল এ্যানেস্থেসিয়া বলে।


পরিকল্পিত সিজার
অনেক মায়েরাই প্রসব ব্যাথা ভয় পান এবং তারা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সিজার করাতে চান। এরকম হলে তাদের স্বাভাবিক ডেলিভারির সুবিধা এবং সিজারের অসুবিধাগুলি জানিয়ে দেয়া উচিৎ; যদিও কিভাবে সন্তান প্রসব করাবেন তা ঠিক করবেন মা ই।

আগে থেকে সিজার করার চিন্তা করে থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব করা সম্ভব হয় না। যেমন-

  • প্রচন্ড প্রি-একলাম্পসিয়া: মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকতে পারে। যার কারণে পরবর্তীতে খিঁচুনী হতে পারে। গর্ভাবস্থা চালিয়ে গেলে তা মা এবং বাচ্চা উভয়ের জীবনই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে – এমতাবস্থায় ডাক্তার তারিখের আগেই সিজার করতে পারেন।
  • যমজ বাচ্চা: যমজ বাচ্চার ক্ষেত্রে তারিখের আগেই সিজার করে নিরাপদ প্রসব করানো যেতে পারে। যমজ বাচ্চারা মাঝে মধ্যে পেটের ভেতর উলটে থাকতে পারে বা লকড্ টুইনস্ অবস্থায় থাকতে পারে।
  • কোমরের নীচের অংশ (শ্রোনী) সরু হলে: যদি মায়ের শ্রোনী সরু হয় এবং বাচ্চার মাথার স্থান সংকুলান না করতে পারে তবে যোনিপথে বাচ্চা প্রসব করা অসম্ভব হতে পারে। এমতাবস্তায় স্বাভাবিক প্রসব করার চেষ্টা করাও মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি হতে পারে।
  • বাচ্চার অবস্থান: মায়ের জরায়ুর মধ্যে বাচ্চা উলটে থাকলে স্বাভাবিক প্রসবে মায়ের যোনিতে ক্ষত হবার সম্ভাবনা থাকে এমনকি প্রসবের এক পর্যায়ে বাচ্চার মাথা আটকে যেতে পারে।
  • প্লাসেন্টা প্রিভিয়া (ফুল নিচের দিকে থাকা): যখন গর্ভফুল জরায়ুর নিচের দিকে অর্থাৎ জরায়ুমুখের কাছে থাকে তখন তা বাচ্চা প্রসবে বাধা সৃষ্টি করে।
  • ইনফেকশন: কোনও কোনও ইনফেকশন যোনি থেকে সংক্রমিত হয়। তাই এসব ক্ষেত্রে সিজার করলে মা থেকে বাচ্চার শরীরে রোগ সংক্রমন প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন- যৌন হার্পিস।
  • মায়ের সমস্যা: মায়ের কোনও সমস্যা যেমন- হার্টের অসুখ থাকলে স্বাভাবিক প্রসবের ধকল এড়াতে সিজার করা যেতে পারে।
  • বাচ্চার বৃদ্ধি কম/ থেমে গেলে: যেসব বাচ্চারা মায়ের গর্ভে ঠিকমতন বাড়ে না সেসব বাচ্চা প্রসবের আগে আগে মাতৃগর্ভেই মরে যাবার সম্ভাবনা থাকে। যদিও এসব ক্ষেত্রে সিজারের গুরুত্ব তেমনভাবে গবেষনা করা হয়নি তবে এসব ক্ষেত্রেও আপনার ডাক্তার সিজার করতে পরামর্শ দিতে পারেন।
  • বড় বাচ্চা : বাচ্চা যদি বড় হয় (যেমন ডায়েবেটিক মায়েদের ক্ষেত্রে) তবে সিজার প্রয়োজন হতে পারে।
  • আগের সিজার: আগে পেটে বড় কোনও অপারেশন হয়ে থাকলে বা আগের দুটি সিজার হয়ে থাকলে জরায়ুর দেয়াল ফেটে যাওয়া এড়াতে ডাক্তার সিজার করতে চাইতে পারেন।
  • গর্ভাবস্থায় জরায়ুর কোনও টিউমার (ক্যান্সার ব্যতীত): কখনও কখনও গর্ভাবস্থায় নারীদের টিউমার ধরা পড়তে পারে। টিউমারের কারনে প্রসবে সমস্যাও দেখা দিতে পারে অথবা বাচ্চার জন্মগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে তারিখের ২-৩ সপ্তাহ আগেই ইলেক্টিভ সিজার করা হতে পারে।


জরুরী সিজার
ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে হয়ত রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে ডাক্তার বুঝিয়ে বলার সময় নাও পেতে পারেন। যদি স্বাভাবিক প্রসবে মা বা বাচ্চার সমস্যা হবার সম্ভাবনা থাকে তবে ডাক্তার সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দুঃখের বিষয় এই যে, বাংলাদেশে ধাত্রীরা সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত না হবার কারনে ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদেরকে এমন দেরী করে ডাক্তারের কাছে পাঠান যখন মায়ের ও বাচ্চার জীবন অনেকাংশে বিপদগ্রস্থ হয়ে আছে।

জরুরী সিজারের কিছু ক্ষেত্র:

  • বাচ্চা ঠিকমতন অক্সিজেন পাচ্ছেনা এমন সময় স্বাভাবিক প্রসবের কালক্ষেপন করলে বাচ্চা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
  • প্রসব অগ্রসর হচ্ছে না যদিও মা চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এবং সময়মতন বাচ্চা প্রসবের রাস্তা দিয়ে নামছে না। এতে মা ও শিশু উভয়েরই সমস্যা হতে পারে।
  • ইন্ডাকশন দেয়ার পরও স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় সঙ্কোচন না হলে।
  • মাসিকের রাস্তা থেকে রক্তপাত প্রসবের সময় হলে।
  • ইমারজেন্সি ক্ষেত্রে বাচ্চাকে দ্রুত প্রসব করাতে হয় (সাধারনত ৩০ মিনিটের মধ্যে)। এক্ষেত্রে মা ও শিশু উভয়ের কথা চিন্তা করে সিজার সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি।
  • বেশি বয়সে মাতৃত্ব। ৩৫ বছরের উর্দ্ধে মা হলে গর্ভাবস্থায় জটিলতা দেখা দিতে পারে এবং এসব ক্ষেত্রে সিজার প্রয়োজন হতে পারে। যেসব জটিলতা হতে পারে:
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • গর্ভাবস্থায় ডায়েবেটিস
  • জরায়ুমুখ ঠিকমতন প্রসারন না হওয়া।
  • ঔষধ দেয়ার পরও ইন্ডাকশন ঠিকমতন না হওয়া।
  • বড় বাচ্চা হওয়া।
  • বাচ্চা মায়ের পেটের ভেতর উলটে যাওয়া বা ব্রিচ হওয়া।
  • গর্ভফুল নীচের দিকে থাকা (প্লাসেন্টা প্রিভিয়া)

About the author

Maya Expert Team