নরমাল বার্থ নারী স্বাস্থ্য- প্রসব এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত

এপিসিওটমি

অনেক সময় প্রসব চলাকালীন সময়ে ডাক্তার মায়ের যোনিপথের কিছু জায়গা কেটে দিতে পারেন যেন যোনিপথ বড় হয়ে আসে। এতে বাচ্চা সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে।

এদেশে প্রায় সময়ই স্বাভাবিক প্রসবে এপিসিওটমি দেয়া হয়ে থাকে। নাইস (ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর হেলথ এ্যান্ড ক্লিনিকাল এক্সিলেন্স) এর মতে বাচ্চার যদি সমস্যা হয় বা দ্রুত প্রসব করানো প্রয়োজন হয় অথবা যদি দিয়ে প্রসব করাতে হয় তবে এপিসিওটমি দেয়া যেতে পারে।

কোনও কোনও নারীর ক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসবের সময় যোনিপথ বা এর আশেপাশে ছিঁড়ে যেতে পারে। যদি আপনার যোনিপথে এপিসিওটমি দেয়া হয় বা ছিঁড়ে যায় তবে সেলাই দেয়া লাগতে পারে। প্রসবের কোনও পর্যায়ে এপিসিওটমি প্রয়োজন হলে ডাক্তার আপনার সম্মতি নিয়ে তবেই এপিসিওটমি দিবেন।

এপিসিওটমির সেলাই সাধারনত এক মাসে মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। এই সেলাই কাটার জন্য হাসপাতালে যাওয়া লাগে না কেননা এমন সেলাই দেয়া হয় যা মিলিয়ে যায়।

প্রসবের পর দুই থেকে দিন সপ্তাহ পর্যন্ত এপিসিওটমির যায়গায় ব্যাথা থাকতে পারে। প্রথম কয়েকমাস এর কারনে স্বামীর সঙ্গে সহবাসে অসুবিধা হতে পারে।

এপিসিওটমি কেন লাগতে পারে

বাচ্চার যদি কোনও সমস্যা হয় (ফিটাল ডিস্ট্রেস) তবে এপিসিওটমি লাগতে পারে। ফিটাল ডিস্ট্রেস এ বাচ্চার হৃদস্পন্দন অত্যন্ত দ্রুত/ ধীরে যেতে থাকে। এটি নির্দেশ করে যে পেটের ভেতর শিশু যথেষ্ট অক্সিজেন পাচ্ছে না, এবং বাচ্চার স্থায়ী বিকলাঙ্গতা বা এড়াতে বাচ্চাটিকে দ্রুত প্রসব করানো প্রয়োজন।

মায়ের যোনিপথে ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও এপিসিওটমি দেয়া হতে পারে। এপিসিওটমির ঘা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এবং এতে জটিলতা হয় না অন্যপক্ষে যোনিপথ বা এর আশেপাশে ছিঁড়ে গেলে তাতে জটিলতার সম্ভাবনা থাকে এবং সহজে এই ঘা শুকায় না। পরবর্তী গর্ভধারনেও এপিসিওটমির স্থানে ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না। বাসায় কারও সাহায্য ছাড়া প্রসব করালে এরকম সমস্যা হবার সম্ভাবনা বেশি।

যন্ত্রের সাহায্যে প্রসব করানোর জন্য যখন যোনিপথ বড় করতে হয় তখনও এপিসিওটমি দেয়া লাগে।

যন্ত্রের সাহায্যে প্রসব করানো প্রয়োজন হয় যদি:

  • বাচ্চা পেটে উলটে থাকে
  • প্রসবে সময় বেশি লাগলে এবং মা ক্লান্ত হয়ে পড়লে
  • মায়ের হার্টের কোনও অসুবিধা থাকলে এবং শারীরিক পরিশ্রমে স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে।

কিভাবে এপিসিওটমি দেয়া হয়

এপিসিওটমি হচ্ছে একটি ছোট্ট অপারেশন। আগে কিছু স্থানীয় চেতনানাশক দেয়া হয় যেন ব্যাথা না লাগে। এরপর মায়ের যোনিপথে কোনাকুনিভাবে একদিকে কাটা হয়। প্রসবের পর ক্ষতস্থানটি সেলাই করে দেয়া হয়।

এপিসিওটমি থেকে সেরে ওঠা

বাচ্চা প্রসবের এক ঘন্টার মধ্যেই এপিসিওটমি সেলাই করে দেয়া হয়। কাটার পর ক্ষতস্থান থেকে বেশ রক্ত বের হতে পারে তবে সেলাই করার পর এবং চাপ দিয়ে ধরে রাখলে এই রক্তপাত কমে আসবে।

এমন সেলাই দেয়া হয় যেন তা মিলিয়ে যায় তাই সেলাই কাটতে হাসপাতালে যেতে হয় না। বাচ্চা জন্মের এক মাসের মধ্যেই সেলাই ঠিক হয়ে যায়। এসময় কি করবেন আর কি করবেন না তা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন। হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবার সময় ডাক্তারের থেকে এসম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

এপিসিওটমির স্থানে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যাথা থাকা স্বাভাবিক। হাঁটা বা বসার সময় ব্যাথা বেশি লাগতে পারে। প্রস্রাবের সময়ও ক্ষতস্থানে ব্যাথা হতে পারে।

ব্যাথা মানিয়ে নেয়া

  • এপিসিওটমির পর কিছুটা ব্যাথা হওয়া স্বাভাবিক। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মায়েরা ব্যাথানাশক হিসেবে প্যারাসিটামল খেতে পারেন। এছাড়াও আপনার বাচ্চা যদি প্রিম্যাচার বা কম ওজনের না হয়ে থাকে বা কোনও স্বাস্থ্য-সমস্যা না থাকে তবে আপনি আইবুপ্রফেন ও খেতে পারেন। তবে ব্যাথানাশক হিসেবে এ্যাস্পিরিন খাওয়া নিরাপদ নয় কেননা এটি মায়ের দুধের সঙ্গে বাচ্চার শরীরে চলে যেতে পারে।
  • ডোনাট-আকৃতি বালিশ ব্যবহার করে বা নিতম্ব শক্ত করে বসলে ব্যাথা কম অনুভূত হয়।
  • গবেষকদের মতে শতকরা ১ শতাংশ নারী এপিসিওটমি স্থানে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করবেন যা তাদের প্রাত্যহিক কাজ-কর্মেও প্রভাব ফেলতে পারে। এরকম ব্যাথা আরও শক্তিশালী ব্যাথানাশক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে – যেমন কোডিন। এসব ওষুধ সেবন করলে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখতে হবে। তবে অপারেশনের দুই-তিন সপ্তাহের পর এই ব্যাথা থাকার কথা না।
  • বালিশের ওপর বরফ-ব্যাগ দিয়ে বা তোয়ালের ভেতর বরফ রেখে এর উপর বসলেও ব্যাথা কম লাগবে। তবে বরফ সরাসরি ত্বকের ওপর প্রয়োগ করলে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।
  • কাটাস্থান খোলা রেখে দিলে তাড়াতাড়ি শুকায়। প্রতিদিন এক বা দুবার আন্ডারওয়্যার খুলে ১০ মিনিট বিছানায় একটি তোয়ালে বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে থাকুন, ঘা দ্রুত শুকাবে।

বাথরুম করা

  • ক্ষতস্থান এবং এর আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নইলে ইনফেকশন হতে পারে। বাথরুমে গিয়ে গরম পানি দিয়ে যোনি এবং আশপাশ পরিষ্কার করুন। প্রস্রাব করার সময় গরম পানি দিলেও আরাম লাগবে। কমোডে বসার চেয়ে লো-ডাউনএ পায়ের ওপর বসলে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া করবে না।
  • পায়খানা করার সময় ক্ষতস্থানে একটি পরিষ্কার প্যাড রাখুন। শৌচ করার পর ভালভাবে মুছে ক্ষতস্থান শুকনা করে নিন। মোছার সময় খেয়াল করে সামনে থেকে পেছন দিকে মুছবেন। এতে করে ইনফেকশন হবার সম্ভাবনা কম হবে।
  • পায়খানায় ব্যাথা হলে অল্প ল্যাক্সেটিভ যেমন খেতে পারেন। এতে পায়খানা নরম হবে।

সহবাসের সময় ব্যাথা হলে

  • বাচ্চা জন্মের পর ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সহবাস করতে নিষেধ করা হয়। এসময় মায়েরা অনেক ক্লান্ত বোধ করেন। সহবাসের জন্য জলদি করবেন না, এতে সহবাস সুখকর হবে না।
  • বাচ্চা জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যেই আপনি পুনরায় গর্ভধারন করতে পারেন। তাই সহবাসের সময় জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহার করুন (যদি না আপনি গর্ভবতী হতে চান)।
  • হাসপাতাল ছাড়ার আগেই ডাক্তারের সঙ্গে এব্যাপারে কথা বলে নিতে পারেন। এর পরেও যে কোনও সময় ডাক্তারের কাছে গিয়ে এবিষয়ে আলাপ করতে পারেন।
  • যদি আপনার এপিসিওটমি হয়ে থাকে তবে সহবাসে সময় প্রথম কয়েক মাস ব্যাথা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এপিসিওটমি হয়েছে এমন মহিলাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের মতেই প্রসবের পর সহবাসে ব্যাথা হয় এবং সময়ের সাথে সাথে এই ব্যাথা চলে যায়।
  • যদি সহবাসে সমস্যা হয় তবে তা আপনার স্বামীকে জানান। ব্যাথা নিয়ে সহবাস করলে পরবর্তীতে সহবাসকে সুখকর না মনে হয়ে কষ্টদায়ক মনে হবে এবং আপনি এবং আপনার স্বামী উভয়েরই এতে সমস্যা হবে। যৌনাঙ্গ প্রবেশ না করিয়েও আপনারা একান্তে সুখকর কিছু সময় কাটাতে পারেন (পারস্পরিক হস্তমৈথুন করতে পারেন)। তবে এপিসিওটমি থাকলে ৬ সপ্তাহের মধ্যে কানিলিঙ্গাস ভাল নয়।
  • অনেক সময় যোনি শুকনো থাকলেও ব্যাথা হতে পারে। এজন্য পানি-জাতীয় লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করতে পারেন। তৈল-জাতীয় লুব্রিক্যান্ট যেমন ভ্যাসলিন, ময়সচারাইজিং লোশান ব্যবহার করবেন না কেননা এতে যোনির প্রদাহ হতে পারে এবং বা এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

ইনফেকশন

ক্ষতস্থানে ইনফেকশনের কোনও চিহ্ন আছে কিনা ভাল করে লক্ষ্য করুন, যেমন লাল ভাব, ফুলে ওঠা, পুঁজ বের হওয়া বা সবসময় ব্যাথা হওয়া। এরকম কিছু হলে আপনার ডাক্তারকে জানান যেন তিনি সেইমতে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন।

ব্যায়াম

  • দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে এবং সেলাই এর যায়গায় চাপ কমাতে যোনি এবং পায়ুর (পেল্ভিক ফ্লোর) মাংসপেশি শক্তিশালী করার জন্য ব্যায়াম করতে পারেন।
  • পেল্ভিক ফ্লোর ব্যায়াম করতে থেমে থেমে মল বা বায়ুত্যাগ থামানোর মতন করে পায়ু ও যোনির মাংসপেশি ক্রমান্বয়ে শক্ত এবং নরম করতে হয়।

এপিসিওটমি রোধে করনিয়

  • গর্ভাবস্থার শেষ ছয় সপ্তাহ যোনি এবং এর আশপাশ মাসাজ করলে এপিসিওটমি লাগে না বা ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না – এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
  • এপিসিওটমি এড়ানো একমাত্র সম্ভব যখন বাচ্চার মাথা যোনি থেকে দৃশ্যমান হয় যেই অবস্থায়। ডাক্তার এসময় আপনাকে ঠেলতে বারন করবেন এবং লম্বা শ্বাস নিতে বলবেন বা দ্রুত ছোট ছোট কয়েকটি শ্বাস নিতে বলবেন।
  • এতে ধিরে ধিরে বাচ্চার মাথা বের হয়ে আসবে এবং যোনির আশপাশে ছিঁড়ে যাবে না। তবে যদি বাচ্চা বের হতে বেশি দেরি হয় তবে প্রয়োজনবোধে ডাক্তার এপিসিওটমি দিতেই পারেন।

About the author

Maya Expert Team