নারী স্বাস্থ্য- প্রসব এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংকোচন

প্রসব যন্ত্রণার উপশম

প্রসব যন্ত্রণার উপশম
প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটিতেই মা প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করেন। তাই এসময় ব্যাথা কিছুটা হলেও উপশম করার উপায়গুলো জেনে নেয়া উচিৎ। এজন্যে আপনার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

নিচে ব্যাথা উপশমের বিভিন্ন উপায় দেয়া হল।


নিজ চেষ্টা
প্রসবের সময়টা নিজেকে শান্ত রাখতে আর ব্যাথা সহনীয় করতে নিচের উপায়গুলো অবলম্বন করতে পারেন –

  • প্রসব সম্পর্কে জানুন। এতে প্রসব নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা দূর হবে এবং প্রসব সহনীয় হবে। গর্ভধারন ও প্রসবের ওপর বই বা ইন্টারনেট থেকে জানুন, ডাক্তারের সাথে কথা বলুন বা অন্যান্য মায়েদের কাছ থেকে জানুন।
  • লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে শান্ত থাকার অভ্যাস করুন, যেন প্রসবের সময় এর প্রয়োগ করতে পারেন।
  • একভাবে বসে থাকলে অনেক সময় ব্যাথা বেশি অনুভব করতে পারেন। সামনে পিছে দুলুন বা হাঁটাহাঁটি করুন।
  • প্রসবের সময় সাথে স্বামী, বান্ধবী বা আত্মীয় কাউকে কাছে রাখতে পারেন। কাউকে না পেলে চিন্তা করবেন না, ডাক্তার/ নার্সই আপনাকে সাহায্য করবেন।
  • আপনার সঙ্গীকে বলুন আপনার কোমর এবং পিঠ মালিস করে দিতে (যদিও সম্ভবনা আছে যে এ সময় কেউ আপনাকে ধরলে আপনার আপনার অস্বস্তি লাগবে)
  • গোসল করে নিতে পারেন – ভাল লাগবে।


হাইড্রোথেরাপি (পানিতে বসা)
অনেক মায়েরা কুসুম গরম পানিতে বসলে আরাম বোধ করেন এবং জরায়ুর সঙ্কোচনে ব্যাথা কম অনুভব করেন। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন আপনি বার্থ পুল ব্যবহার করতে পারবেন কিনা। লক্ষ্য রাখবেন পানির তাপমাত্রা ৩৭°সে এর বেশি যেন না হয়।


এন্টোনক্স (গ্যাস এন্ড এয়ার নামেও পরিচিত)
এটা নাইট্রাস অক্সাইড আর অক্সিজেনের সমানুপাতিক মিশ্রন। নাইট্রাস অক্সাইড বহুদিন যাবৎ ভাল চেতনানাশক গ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই মিশ্রন আপনাকে সম্পূর্ণ অচেতন করবেনা তবে ব্যাথা লাঘব করতে সহায়তা করতে পারে। ঢাকার দামী হাসপাতালগুলোতে এই সুবিধা পেতে পারেন, তবে এদেশে এর চল নেই বললেই চলে।

কিভাবে কাজ করে
আপনি নিজে এর মাস্কটি ধরে রাখবেন এবং এর ভেতর শ্বাস নিতে থাকবেন। কাজ শুরু হতে ১৫-২০ সেকেন্ড সময় লাগে, তাই ব্যাথা কমাতে সঙ্কোচন শুরুর সাথে সাথেই শ্বাস নিন।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
এতে আপনার বা আপনার শিশুর ক্ষতির কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে এতে আপনার মাথা ঝিমঝিম করতে পারে। অনেকের এতে ঘুম ঘুম ভাব লাগতে পারে। এরকম হলে এটি নেয়া বন্ধ করুন।

এন্টোনক্সে কাজ না হলে ব্যাথানাশক ইঞ্জেকশন নিতে পারেন।


ইঞ্জেকশন
ব্যাথা কমানোর আরেকটি উপায় ইঞ্জেকশন যেমন- পেথিডিন বা ডাইমর্ফিন। এসব ইঞ্জেকশন দেয়া হয় মাংসপেশিতে তাই কাজ শুরু করতে ২০মিনিটের মত সময় লাগতে পারে এবং এর প্রভাব ২-৪ ঘন্টা স্থায়ী হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন:

  • মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা ভুলোমনা।
  • প্রসবের শেষ দিকে এর প্রভাব থাকলে বাচ্চা বের করার জন্য মা প্রয়োজনীয় চাপ দিতে না পারতে পারেন (এজন্যে শুরুতে অর্ধেক ডোজ নিয়ে দেখতে পারেন আপনার উপর এর প্রভাব কেমন)।
  • যদি প্রসবের শেষের দিকে পেথিডিন বা ডাইমর্ফিন দেয়া হয় তবে এর কারনে জন্মের পর বাচ্চার শ্বাসে অসুবিধা হতে পারে। এরকম হলে বাচ্চাকে পেথিডিনের এ্যান্টিডোট দেয়া লাগতে পারে।
  • বাচ্চা বুকের দুধ খাওয়া শুরু হতেও সমস্যা হতে পারে এসব ওষুধের জন্য।


এপিডুরাল
এপিডুরাল একপ্রকার স্থানীয় চেতনানাশক। যেসব স্নায়ু প্রসবের রাস্তা থেকে মস্তিষ্কে ব্যাথার অনুভুতি পৌঁছায় সেগুলিকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয় এটি। এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যাথানাশক। অনেক নারী, বিশেষত যারা লম্বা সময় ধরে প্রসব ব্যাথায় রয়েছেন, তাদের জন্য এটি বেশ ভাল একটি ওষুধ।

এপিডুরাল দেয়ার জন্য অবশ্যই একজন এ্যানাস্থেটিস্ট প্রয়োজন। আপনি এপিডুরাল নিতে চাইলে আজই নিশ্চিত হোন আপনার হাসপাতালে এ্যানাস্থেটিস্ট সর্বদা আছেন কিনা।

একটি সরু এবং লম্বা সুঁচের মাধ্যমে মেরুদন্ডের মধ্যে এই ওষুধ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সুঁচটি বসাতে ২০ মিনিট লাগে আর ওষুধ কাজ করতে আরও ১৫-২০ মিনিট সময় লাগতে পারে।

কিভাবে কাজ করে
এপিডুরাল পাবার সময়:

  • আপনি এক হাতে স্যালাইন পেতে থাকবেন।
  • আপনাকে বসিয়ে এ্যানাস্থেটিস্ট আপনার মেরুদন্ডের একটি জায়গা পরিষ্কার করে নিয়ে কিছু স্থানীয় চেতনানাশক দিয়ে দিবেন।
  • একটি সরু এবং লম্বা সুঁচের মাধ্যমে মেরুদন্ডের মধ্যে এই ওষুধ ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সুঁচটি বসাতে ২০ মিনিট লাগে আর ওষুধ কাজ করতে আরও ১৫-২০ মিনিট সময় লাগতে পারে।
  • এপিডুরাল লাগানো হয়ে গেলে এর ভেতর দিয়ে যন্ত্রের মাধ্যমে ওষুধ দেয়া যেতে পারে। এটি নার্স করতে পারেন বা আপনিও বোতাম চেপে প্রয়োজন অনুসারে নিতে পারেন। এসময় আপনার এবং আপনার বাচ্চার হৃৎপিণ্ডের গতিবেগ যন্ত্রের সাহায্যে লক্ষ্য রাখতে হবে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে যেমন:

  • পা ভারী ভারী লাগা।
  • এতে ঘুম আসা বা বমিভাব হওয়ার কথা না।
  • রক্তচাপ কমে যেতে পারে। যেন না কমে তাই হাতে স্যালাইন দেয়া হয়ে থাকে।
  • এর কারনে প্রসবের সময় দীর্ঘায়িত হতে পারে। কখনও কখনও বাচ্চাকে যন্ত্রের সাহায্যে বের করা লাগতে পারে। তবে বাচ্চা সুস্থ থাকলে ডাক্তার অপেক্ষা করতে পারেন। অনেক সময় ডাক্তার প্রসবের শেষভাগে ব্যাথানাশক কমিয়ে দিতে পারেন যেন আপনি স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসব করতে পারেন।
  • যদি এপিডুরালের কারনে প্রস্রাবে সমস্যা হয় তবে আপনাকে ক্যাথেটার দেয়া হতে পারে।
  • এপিডুরালের কারনে অনেক নারীর মাথাব্যাথা অনুভব করেন, ডাক্তারকে বললে এজন্য ওষুধ দিতে পারেন।
  • অনেকের পায়ে ঝিম ঝিম বা সুঁই ফোটার মতন অনুভব করতে পারেন। এটি এপিডুরালের জন্য নয় বরং প্রসবের কারনে হয়ে থাকে। ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন কখন আপনি হাটাচলা করতে পারবেন।


ব্যাথা নাশের অন্য উপায়
অনেকেই উপরোল্লিখিত ব্যাথানাশের উপায় মানতে চান না। তাদের কেউ কেউ আকুপাংচার, কেউ এ্যারোমাথেরাপি, হোমিওপ্যাথি, হিপনোসিস, মাসাজ বা রিফ্লেক্সোলজীর ওপর আস্থা রাখেন। এসবের কোনটিই প্রকৃতপক্ষে ব্যাথা নাশের কার্যকারী উপায় নয়। এগুলোর কোনটি নিতে চাইলে আগে ডাক্তার এবং হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এবং নিশ্চিত হোন যে ব্যাক্তিই আপনাকে সেবা দিচ্ছেন তিনি যোগ্য এবং দক্ষ কি না।

About the author

Maya Expert Team