সিদ্ধান্ত নিন কোথায় আপনার সন্তান হবে

সিদ্ধান্ত নিন কোথায় আপনার সন্তান হবে
একজন অন্ত:সত্ত্বা মায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সন্তান জন্মের জন্য স্থান নির্বাচন। কোথায় আপনার সন্তান প্রথম আলোর মুখ দেখবে, কি ধরনের সেবা আপনি চান, কতটা নিশ্চয়তা চান আপনার ও আপনার শিশুর জীবনের, এটা আগে থেকেই ভেবে নেওয়াটা খুব জরুরি। তবে আপনার সামনে যেসব পছন্দ থাকবে তা নির্ভর করছে আপনি কোথায় থাকেন তার ওপর। এ ব্যাপারে আপনি আপনার জীবনের পার্টনার এবং চিকিৎসক, সেইসাথে নিকটজনের পরামর্শও নিতে পারেন। আরও একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আপনার সাধ যেন সাধ্যের মধ্যে হয়।

এই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে আপনি একটু খোঁজখবর নিতে পারেন আপনার আশেপাশে কত ধরনের মাতৃস্বাস্থ্য ক্লিনিক আছে, তাদের সেবাসমূহ কি কি, সেখানে চিকিৎসক কারা, ইত্যাদি। এমনকি লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেও জেনে নিতে পারেন এসব ক্লিনিকের সাফল্যের ইতিহাস কতটা। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আপনার আকাঙ্খার সাথে মিলে যায়, তাহলেই আপনার পক্ষে সিদ্ধান্তে আসা সহজ হবে।


এবার বাছাই করুন, কোথায় হবে আপনার সন্তান
আপনি চাইলে নিজ বাসাতেও সন্তানের জন্ম দিতে পারেন। অথবা বেছে নিতে পারেন কোন হাসপাতাল। আপনার প্রয়োজন, ঝুঁকির মাত্রা এবং কোথায় আপনার বাসা, এসবের ওপর মূলত নির্ভর করে এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমাদের দেশের মতো দরিদ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব কঠিন। এখানে সাধ আর সাধ্যের মিলন ঘটানো সত্যিই কঠিন।

বাংলাদেশে এখন ভাল স্বাস্থ্য সেবা বলতে বোঝায় আপনি টাকা দিয়ে কতটা সেবা কিনতে সক্ষম। সুতরাং আপনার নিরাপত্তা, শিশুর নিরাপত্তা এসবই আপনাকে কিনতে হবে। টাকা নেই তো সুরক্ষাও নেই।


সুরক্ষা
আপনি যে স্থান নির্বাচন করবেন, স্বভাবতই সেটিই হবে আপনার জন্য নিরাপদ। কারণ আপনি ভেবেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন। তাছাড়া কত ধরনের নিরাপদ সেবা প্রতিষ্ঠান আছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কোন গবেষণা আজতক হয়নি। অন্যদিকে, যেসব মা নিজ বাড়িতেই সন্তানের জন্ম দেন বা সিদ্ধান্ত নেন, তাদের খুব একটা সেবা লাগেও না। যেমন, ফরসেপ বা ভেনটোজ ব্যবহার এক্ষেত্রে হয় না বললেই চলে। অর্থাৎ ইন্সট্রুমেন্টাল ডেলিভারি হয় না তাদের ক্ষেত্রে। আদিমতম পদ্ধতিতেই বাড়িতে সন্তান প্রসব করানো হয়। ২০০৮ সাল থেকে এসএমসি বাজারে এনেছে “সেফটি কিট” যা বাড়িতে সন্তান প্রসবের জটিলতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছে।

কাজেই আপনি যদি একান্তই ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকেন বাড়িতে সন্তান জন্মের ব্যাপারে, তারপরও আপনার চিকিৎসক বা আশপাশে নার্স বা সেবিকা কেউ থেকে থাকলে তাদের জানিয়ে রাখা ভাল। প্রয়োজনে তারাই আপনার সহায় হতে পারেন। অনেক জটিলতা এড়াতে পারবেন। তবে আপনার শারীরিক অবস্থা যদি সুস্থ বা সমস্যাবহুল থাকে, তাহলে আপনাকে হাসপাতালেই যেতে হবে। অন্তত চিকিৎসকরা আপনাকে সেই পরামর্শই দেবেন।


সিদ্ধান্তটি সবার জানা প্রয়োজন
সন্তানের জন্ম কোথায় দেবেন এ ব্যাপারে সমস্ত তথ্য আপনার ও আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছে থাকা প্রয়োজন। এটা আপনাদের একান্ত সিদ্ধান্ত, তবে যেকোনো মূহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন, সেটাও আপনাদেরই ব্যক্তিগত বিষয়। আপনার যারা শুভাকাঙ্খী আছেন, চিকিৎসক আছেন তারা শুধু আপনাকে কিছু পথ বলে দিতে পারবেন, তা মেনে নেওয়া, না নেওয়া সব আপনার।


সন্তান জন্মদানের বিষয়ে তথ্য আপনি কোথায় পাবেন
নার্স বা সেবিকা ছাড়াও যেসব জায়গা থেকে তথ্য পেতে পারেন:

  • আপনার চিকিৎসকের যদি কোন ক্লিনিক থেকে থাকে
  • স্থানীয় মাতৃস্বাস্থ্য সেবা ইউনিটসমূহ
  • মাতৃস্বাস্থ্য সেবাসমূহের সাথে সম্পৃক্ত কমিটি
  • দক্ষ ধাত্রীদের কোন সুপারভাইজার অথবা এসওএম

যেখানেই সন্তান প্রসব করুন না কেন, আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন।


কিছু পরামর্শ
হাসপাতাল, ক্লিনিক, মাতৃস্বাস্থ্য কেন্দ্র হলো সন্তান প্রসবের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। বাড়িতে অনেকে সন্তান জন্ম দিলেও, প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে হওয়াই ভাল। যেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালের সুবিধা আছে, সেখানে বাসা-বাড়িতে এই ঝুঁকি না নেওয়াই ভাল। তবে কিছু কিছু বাড়ি আছে, যেখানে অভিজ্ঞ লোকজন বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি থাকে, সেক্ষেত্রে আলাদা বিষয়।

তবে শেষপর্যন্ত যেখানেই সন্তান হোক না কেন, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসককে দেখানো এবং তার পরামর্শ নেওয়াটা খুব জরুরি। এতে করে ভয় ও সংকোচ দুটোই কেটে যায়। আর চিকিৎসকের প্রতি একধরনের নির্ভরতাও আসে। হাসপাতালে যদি সন্তান জন্মের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে আগে থেকেই হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করে সেখানকার প্রসব-পূর্ব পরিচর্যা বিভাগে (Antenatal Department) নাম লিখে কার্ড সংগ্রহ করে রাখতে হবে আপনাকে। আর তাদের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভধারনের প্রথমদিকে মাসে একবার করে এবং শেষের দিকে এক-দুই সপ্তাহ পর পর পরীক্ষার জন্য যেতে হবে।


কাদের জন্য হাসপাতাল জরুরি

  • প্রথম সন্তান জন্মের সময়।
  • যেসব মায়ের চার কিংবা তার বেশি সন্তান আছে।
  • যমজ বা একাধিক সন্তানসম্ভবা হলে।
  • রক্তচাপ স্বাভাবিক না থাকলে।
  • গর্ভকালীন বিভিন্ন জটিলতায় ভুগে থাকলে।
  • রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হলে।
  • যেসব মায়ের আগের সন্তান জন্মের সময় জটিলতা ছিল, যেমন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভফুল না পড়া ইত্যাদি।
  • হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা, জন্ডিস, পা ফোলা – এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে।
  • পেটে শিশুর অবস্থানে তারতম্য থাকলে, অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় না থাকলে।
  • প্রসব ব্যথার গতি অস্বাভাবিক হলে।
  • আগে কোন সন্তান প্রসবকালে মারা গেলে।
  • মায়ের জরায়ুতে আগে কোন ধরনের অপারেশন হয়ে থাকলে।
  • গর্ভবতী মা অজ্ঞান হয়ে পড়লে বা খিঁচুনি দেখা দিলে।
  • আগের সন্তান নির্দ্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম নিয়ে থাকলে, অর্থাৎ অপরিপক্ক শিশুর জন্ম হলে।
  • বিয়ের অনেক বছর পর সন্তান ধারণ করলে।
  • বেশি বয়সে মা হলে।
  • পরিবারে মা বা বোন কারও সন্তান প্রসব নিয়ে কোন জটিলতার ইতিহাস থাকলে।
  • সর্বোপরি, যেকোনো জটিলতা এড়াতে এবং সুস্থ, স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিতে চাইলে অভিজ্ঞ, দক্ষ স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প কিছু নেই। আর এজন্য হাসপাতালই একমাত্র জায়গা।