টিকা এবং পরীক্ষা করানো নারী স্বাস্থ্য- গর্ভাবস্থা

সিকেল সেল ও থ্যালাসেমিয়া

সিকেল সেল ও থ্যালাসেমিয়া
জন্মগত রক্তের রোগের মাঝে সিকল সেল (sickle cell) ও থ্যালাসামিয়া মেজর (thalasaemia major) বেশ গুরুতর। এই রোগে রক্তের হিমোগ্লোবিন (রক্তের একটি উপাদান যা শরীরে অক্সিজেন বহন করে) আক্রান্ত হয়। এসব রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির আজীবন বিশেষ যত্নের প্রয়োজন।


সিকেল সেল আক্রান্ত মানুষের

  • ঘন ঘন তীব্র ব্যথা হতে পারে
  • মারাত্মক জীবনঘাতি সংক্রমণ হতে পারে
  • সবসময় রক্তস্বল্পতা থাকে
  • শিশুকাল থেকেই ঔষধ ও ইনজেকশনের প্রয়োজন হয় এবং তা সারাজীবন চলতে থাকে


থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত মানুষের

  • সবসময় ভীষণরকম রক্তস্বল্পতা থাকে
  • ৬ সপ্তাহ পর পর রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়
  • সারাজীবনই ঔষধ ও ইনজেকশনের প্রয়োজন হয়

এসব কারনেই সবসময় এই রোগগুলোর স্ক্রিনিং পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে আপনি চাইলে নাও করাতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে আপনার মতামতকেই গুরুত্ব দেয়া হবে।


সিকেল সেল ও থ্যালাসেমিয়া কিভাবে বংশানুক্রমে আসে?
কিছু অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন জীনের মাধ্যমে এই রোগ বাবা-মা হতে তাদের সন্তানের মাঝে আসে। এই বংশানুক্রমিক রোগগুলোতে কেউ একজন তখনই আক্রান্ত হবে, যখন সে ২টি অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন জীন পাবে, একটি মায়ের ও একটি বাবার কাছ থেকে। যারা শুধুমাত্র একটি জীন পায় তাদের বাহক (carrier) বলা হয়। বাহকেরা সুস্থ , স্বাভাবিকই থাকে তবে দুইজন বাহক বা একজন বাহক ও একজন আক্রান্ত ব্যাক্তি যদি বাচ্চা নেয় তবে বাচ্চার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।


কে কে বাহক হতে পারে?
যে কেউই বাহক হতে পারে। তবে আপনি বা আপনার পূর্বপুরুষের কেউ যদি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত অঞ্চল হতে আসেন তবে আপনার বাহক হবার সম্ভাবনা বেশি। কারন একজন বাহকের ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। এর মানে আপনার পূর্বপুরুষেরা যদি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল (যেমন সাইপ্রাস, ইটালি, পর্তুগাল ও স্পেন), আফ্রিকা, ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জ, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আমেরিকা বা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাসিন্দা হয় তবে আপনার বাহক হবার সম্ভাবনা বেশি।


সিকেল সেল ও থ্যালাসেমিয়ার স্ক্রিনিং/ নির্ণয়
স্ক্রিনিং এ একটি সাধারন রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এটি করার সবচেয়ে ভাল সময় গর্ভবতী হবার ১০ সপ্তাহের মধ্যে। সব গর্ভবতী মহিলাকেই থ্যালাসেমিয়ার স্ক্রিনিং করতে বলা হয়। তবে সবসময় সিকেল সেল এর পরীক্ষা করতে নাও বলা হতে পারে। আপনাকে আপনার পরিবার বা আপনার বাচ্চার বাবার পরিবার এবং পূর্বপুরুষ নিয়ে কিছু প্রশ্ন করা হবে। তেমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে না হলে সাধারণত সিকেল সেল টেস্ট করতে বলা হয় না। তবে আপনি চাইলে নিজে থেকেই টেস্ট করিয়ে নিতে পারবেন।

যদি ব্লাড টেস্ট এ দেখা যায় যে আপনি বাহক তাহলে আপনার সঙ্গীকেও টেস্ট করার জন্য অনুরোধ করা হবে। উভয়ই বাহক হলে আপনার বাচ্চার বংশগত ভাবে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে; সে বাহকও হতে পারে এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থও হতে পারে।

গর্ভকালীন সময়ের প্রথম দিককার এই পরীক্ষাগুলো আপনাকে কাউন্সেলরের সাথে কথা বলার ও রোগগুলো এবং এ বিষয়ে করনীয় সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিবে। আপনি চাইলে বাচ্চার অন্য কোন সমস্যা আছে কিনা জানার জন্য অন্যান্য পরীক্ষাও করাতে পারেন (অ্যামনিওসেন্টেসিস ও কোরিওনিক ভিলাস স্যামপ্লিং দেখুন)।

আপনি বাহক হলে আপনার পরিবারের অন্যদেরও বাহক হবার সম্ভাবনা থাকে। আপনি তাদেরও পরীক্ষা করাতে পরামর্শ দিতে পারেন, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যদি এমন কেউ থেকে থাকে যে বাচ্চা নিতে আগ্রহী।

যদিও সিকেল সেল এর বাহকেরা সম্পূর্ণ সুস্থ, তারপরও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে তাদের শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন নাও থাকতে পারে ( যেমন অস্ত্রপ্রচারের সময় যখন অচেতন করা হয় বা কেউ যখন গভীর সমুদ্রে ডাইভিং করে)। তখন তাদের কিছু সমস্যা হতে পারে। একারনেই আগে থেকে জানা থাকলে বাহকের পক্ষে এসব পরিস্থিতি ভালভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। তবে থ্যালাসেমিয়া এবং অন্যান্য অস্বাভাবিক হিমোগ্লবিন জীনের বাহকদের এইরকম কোন সমস্যা হয় না।


বাচ্চার বাবা কেন পরীক্ষা করাবেন?
বাচ্চা তখনই আক্রান্ত হবে যখন বাবা-মা উভয়ই অস্বাভাবিক জীনের বাহক। তাই আপনি যদি বাহক হন তবে এটা জানা জরুরী যে আপনার সঙ্গীও বাহক কিনা। যদি তিনি বাহক না হন বা যদি তিনি পরীক্ষা করাতে না চান তবে আপনাকে অন্য পরীক্ষা (অ্যামনিওসেন্টেসিস ও কোরিওনিক ভিলাস স্যামপ্লিং দেখুন) করাতে হবে যাতে বোঝা যায় বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেল আছে কিনা।


বাবাও যদি বাহক হন
যদি এমন হয় যে আপনি ও আপনার সঙ্গী উভয়ই থ্যালাসেমিয়া, সিকেল সেল বা অন্য কোন অস্বাভাবিক জীনের বাহক তবে প্রতি বাচ্চার ক্ষেত্রে;

২৫% সম্ভাবনা বাচ্চার কিছুই হবে না (মানে বাহক বা আক্রান্ত কিছুই হবে না)

৫০% সম্ভাবনা বাচ্চা বাহক হবে

২৫% সম্ভাবনা বাচ্চা আক্রান্ত হবে

যদি আপনারা উভয়ই বাহক হন তবে বাচ্চা আক্রান্ত হয়েছে কিনা জানার জন্য আপনাদের একটি টেস্ট করতে বলা হবে। এটি অ্যামনিওসেন্টেসিস বা কোরিওনিক ভিলাস স্যামপ্লিং হতে পারে।


অন্যান্য বংশগত ব্যাধি

সিসটিক ফাইব্রোসিস (Cystic Fibrosis)
এটি একটি বংশগত রোগ যা শরীরের প্রধান অঙ্গগুলোকে (প্রধানত ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র) আক্রান্ত করে। এর কারনে এই অঙ্গগুলোতে একধরনের ঘন চটচটে শ্লেষ্মা জমে যার ফলে এই অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক কাজ বাধাগ্রস্থ হয়। একই সাথে ঘামের গ্রন্থিগুলোও আক্রান্ত হয়। এই রোগটিও বংশগত এবং বাচ্চার হতে হলে বাবা-মা উভয়ের বাহক হতে হবে। যদি কারো পরিবারে সিসটিক ফাইব্রোসিস বা মাস্কুলার ডিসট্রোফির (Muscular Dystrophy) ইতিহাস থাকে তবে তাদের গর্ভাবস্থায় এই রোগের পরীক্ষা করতে বলা হবে।

স্যচ রোগ (Sachs Disease)
আপনি বা আপনার সঙ্গী যদি অ্যাশকেনাজি ইহুদি (Ashkenazi Jew) হন এবং আপনারা যদি মনে করেন আপনারা ঝুঁকিতে আছেন তবেই আপনাকে এই রোগের পরীক্ষা অফার করা হবে।

About the author

Maya Expert Team