অটিজম বিশেষ চাহিদা

অটিজম এবং ডাউন’স এর মধ্যে পার্থক্য

আমাদের মধ্যে অনেকেই অটিস্টিক শিশু এবং ডাউন সিন্ডোমে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেননা। এগুলো একেবারেই আলাদা পরিস্থিতি এবং এসব রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা

অটিজম কি?

অটিজম স্পেকট্রাম সিন্ড্রোম (ASD) এক ধরণের অবস্হা যা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, যোগাযোগ, আগ্রহ এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। এর মধ্যে রয়েছে এস্পারজার সিন্ড্রোম এবং শৈশব অটিজম।

সাধারণত অটিজম এর প্রধাণ বৈশিষ্ট্যগুলো শৈশবেই বিকাশ লাভ করে। যদিও তার প্রভাব তেমন বোঝা যায়না যতক্ষণ পর্যন্ত না আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। অটিজম এর কোনো ‘নিরাময়’ নেই, কিন্তু শিক্ষা ও আচরণগত সহযোগিতাসহ বিস্তৃত চিকিৎসা পদ্ধতি এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। এক্ষেত্রে অটিজম আক্রান্ত শিশুর বাবা-মার ভুমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তারাই পারেন আক্রান্ত শিশুটিকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে, তার দক্ষতা বৃদ্ধিতে যথাযথ সহায়তা করাতে।

লক্ষণ ও উপসর্গ

অটিজম এর অনেক ধরণের লক্ষণ রয়েছে, যেগুলোকে প্রধানত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়, যেমনঃ

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও যোগাযোগের সমস্যা-এর মধ্যে রয়েছে অন্য ব্যক্তির আবেগ ও অনুভূতি সম্পর্কে অসচেতনতা ও বুঝতে না পারার অক্ষমতা। এরসাথে আরও যোগ হতে পারে ভাষার বিলম্বিত বিকাশ ও দেরিতে কথোপকথন শুরু করা এবং তাতে সঠিক ভাবে অংশ নিতে না পারা।

চিন্তা, আগ্রহ ও শারীরিক আচরণে সীমাবদ্ধতা ও পুনরাবৃত্তিমূলক নিদর্শন –এর মধ্যে রয়েছে শরীরের নড়াচড়ার পুনরাবৃত্তি, যেমন হাত দিয়ে টোকা মারা বা হাত মোচড়ানো – এরকম কিছু ক্রমাগত ভাবে করতেই থাকা, এবং তাতে বাধাপ্রাপ্ত হলে মন খারাপ করা বা রেগে যাওয়া। এএসডি আক্রান্ত শিশু, তরুন ও প্রাপ্তবয়স্করা প্রায়ই অন্যান্য মানসিক সমস্যাও ভোগেন। তার মধ্যে একটি হলো – Attention deficit hyperactivity disorder(ADSD), এর কারনে তাদের মনোযোগের সমস্যা হয়, অবাধ্য হয়, সারাক্ষন কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কারো কারো মধ্যে দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতাও থাকতে পারে। এএসডি আক্রান্তদের অর্ধেকেরই বিভিন্ন মাত্রায় শিক্ষণ জটিলতা থাকে, অর্থাৎ তারা পড়তে পারে না, বুঝতে পারে না, পড়া মনে রাখতে পারে না। তবে উপযুক্ত সহায়তা পেলে তাদের অনেককেই স্বাবলম্বী হতে পারে।

অধিক গুরুতর লক্ষণ এবং শিক্ষণ জটিলতাযুক্ত শিশুদের আরও বেশি যত্ন ও সহায়তার প্রয়োজন হয়, যাতে তারা প্রাপ্ত বয়স্কদের মতো জীবনযাপন করতে পারে। যদিও, তারা ও তাদের পরিবার কেন একটি স্বাভাবিক জীবন উপভোগ করতে পারবেনা তার পেছনে কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই।

রোগ নির্ণয় করা 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুই থেকে তিন বছর বয়েসি শিশুদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণগুলো ধরা পড়ে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে, তাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে উপসর্গগুলো আরও বেশি করে বোঝা যায়।

যদি আপনি আপনার শিশুর বিকাশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন বা তার মধ্যে অটিজমের কোনো উপসর্গ লক্ষ্য করে থাকেন তাহলে ডাক্তারকে দেখান। আপনার সন্তানকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর প্রয়োজন আছে কিনা সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনারা একসাথে বসে আপনার উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। আপনি আপনার উদ্বেগ নিয়ে আপনার সন্তানের নার্সারি বা স্কুলের শিক্ষকদের সাথেও আলোচনা করতে পারেন। এটিও অনেকসময় সহায়ক হতে পারে।

অটিজম এর কারণ

অটিজম এর সঠিক কারণ অজানা, তবে ধরে নেওয়া হয় যে এর সাথে বেশকিছু জটিল জিনগত ও পরিবেশগত বিষয় জড়িত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, জন্মগত পরিস্থিতি অটিজম এর কারণ হিসেবে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

অতীতে, কিছু মানুষ এমএমআর টিকাকে অটিজম এর কারণ হিসেবে ভাবতো। কিন্তু এই বিষয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে লক্ষাধিক শিশুর উপর পরিচালিত গবেষনায় ব্যপক অনুসন্ধান করা হয়েছে, এবং বিজ্ঞানীরা এমএমআর ও অটিজম এর মধ্যে যোগাযোগ আছে এমন কোনো প্রমাণ পাননি।

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অটিজম

কিছু কিছু অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি আছে যাদের শৈশবে এর লক্ষণগুলো ছিলো, তবে বড় হওয়ার পর আর কখনোই পরীক্ষা করা হয়নি। যাইহোক, প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে পরীক্ষা করানোটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে পরিস্থিতি বুঝতে এবং কি ধরণের সহযোগিতা তাদের প্রয়োজন তা নিরূপণ করতে সাহায্য করে। অটিজমে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের সাহায্য করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু সেবা কেন্দ্র রয়েছে যেখান থেকে তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা পেতে পারে। যে কাজ তারা পছন্দ করে এবং যেভাবে থাকতে তারা পছন্দ করে, তেমন পরিবেশে তেমন কাজে তাদের কে সম্পৃক্ত করা গেলে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

সামাজিক চাহিদা এবং কাজের সাথে জড়িত রুটিন পরিবর্তনের কারণে কিছু কিছু অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তির কাজ খুজে পেতে অসুবিধা হতে পারে।

ডাউন ‘স সিন্ড্রোম কি

ডাউন’স সিন্ড্রোম, যা ডাউন সিন্ড্রোম নামেও পরিচিত, একটি জিনগত রোগ। এতে সাধারণত শিক্ষণ অক্ষমতার সাথে কিছু বিশেষ বৈশিষ্টপূর্ণ শারীরিক লক্ষণও থাকে।

যে সব শিশু ডাউন’স সিন্ড্রোম নিয়ে জন্মগ্রহন করে, তাদের মধ্যে যে সব লক্ষন দেখা যায় সেগুলো হলোঃ

শরীরের মাংসপেশি শক্তিশালী না হওয়া বা মাংসপেশিতে স্বাভাবিক শিশুদের মত জোর না থাকা। একে মাংসপেশির শিথিলতা বা হাইপোটোনিয়া বলে এবং এ ধরনের শিশুদের ফ্লপি বেবী বলে।

দুই চোখের বাইরের কোনা বাঁকাভাবে উপরের দিকে থাকা

তাদের হাতের তালু জুড়ে একটিমাত্র রেখা থাকতে পারে (সিংগেল পামার ক্রীজ),

জন্মের সময় শিশুর ওজন ও দৈর্ঘ্য, গড় ওজন ও দৈর্ঘ্যের চেয়ে কম থাকা

ডাউন’স সিন্ড্রোম  আক্রান্ত শিশুদের কিছু  সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্য  থাকে, যদিও তা সবার জন্য একই রকম নাও হতে পারে। ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্ত একটি শিশু দেখতে অন্য সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুর তুলনায় তার মা, বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো বেশি হয়।

ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্তদের মধ্যে ব্যক্তিত্ব ও সক্ষমতায় পার্থক্য থাকে। ডাউন’স সিন্ড্রোম নিয়ে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকেরই বিভিন্ন মাত্রার শিক্ষণ অক্ষমতা থাকে। শিক্ষণ অক্ষমতার মাত্রা একেকজনের জন্য একেকরকম।

ডাউন’স সিন্ড্রোম নির্ণয়ের পরীক্ষা

কিছু ক্ষেত্রে, জন্মপূর্ব পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর জন্মের পূর্বেই শিশুর ডাউন’স সিন্ড্রোম আছে কি না তা সনাক্ত করা যায়। স্ক্রিনিং টেষ্ট নিশ্চিত ভাবে বলতে পারে না, গর্ভস্থ শিশুর ডাউন’স সিন্ড্রোম আছে কিনা, গর্ভস্থ শিশুর ডাউন’স সিন্ড্রোম থাকার সম্ভবনা শতকরা কতভাগ সে সম্পর্কে ধারনা দিতে পারে। শিশুর রক্তের নমুনা ব্যবহার করে ক্রমোজোম পরীক্ষা করাই সুনির্দিষ্টভাবে এই রোগ নির্ণয়ের একমাত্র উপায়।

কারা আক্রান্ত হয় ?

শিক্ষণ জটিলতার সবচেয়ে সাধারণ জেনেটিক কারণ হচ্ছে ডাউন’স সিন্ড্রোম। সকল শ্রেণী, ধর্ম ও আর্থিক অবস্হার মানুষের ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হবার সম্ভবনা সমা্ন। শিশুর কোষে একটি অতিরিক্ত ২১তম ক্রমোজোমের উপস্থিতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ডাউন’স সিন্ড্রোম আক্রান্ত শিশু যেকোনো মায়েরই হতে পারে,যদিও মায়ের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ধরণের শিশুর জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।গর্ভাবস্থার পূর্বে বা গর্ভকালীন কোনো ঘটনা এর জন্য দায়ী বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ডাউন’স সিন্ড্রোমের সাথে জীবন যাপন

পরীক্ষায় যদি গর্ভস্থ শিশুর ডাউন’স সিন্ড্রোম ধরা পড়ে, প্রায় সব পরিবারের জন্যই ব্যপারটা নেনে নেয়া কঠিন। এ পরিস্থিতিতে নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আসাটাও অস্বাভাবিক নয়।

জন্মের পর পর শিশু যত বেশি বাবা-মার আদরে সাড়া দেয়, যত বেশি নতুন নতুন কর্মকাণ্ড করে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালবাসা তত বেশি বিকশিত হয়। ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুরা এভাবে বাবা মার আকর্ষণ বাড়াতে ব্যর্থ হয়। তবে এটি মনে রাখা জরুরী যে অন্যসব শিশুদের মত ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুরও একই ধরণের চাহিদা রয়েছে। পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া এক্ষেত্রে খুবই জরুরী।

যদিও ডাউন’স সিন্ড্রোমের কোনো প্রতিকার নেই, তবে এ ধরণের শিশুদের সহায়তার অনেক উপায় আছে যাতে করে তারা সুস্থ ও পরিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে উঠে স্বাবলম্বী হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছেঃ

বিশেষায়িত উন্নত স্বাস্হ্যসেবা

শিশু ও তাদের বাবা-মাদেরকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ সেবা,

সন্তান প্রতিপালন বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষন

আক্রান্ত শিশুদের বাবা-মা,বন্ধুবান্ধব ও পরিবারকে তথ্য ও সহায়তা যোগানোর জন্য শিক্ষা ও সহায়ক গ্রুপ।

উন্নত শিক্ষা ও সহায়তা ডাউন’স সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আরো বেশি সুযোগ এনে দেয়।এর মধ্যে রয়েছে ঘরের বাইরে যাওয়া, নতুন সম্পর্ক তৈরী করা, কর্মসংস্হানের ব্যবস্হা করা এবং স্বাধীন জীবন যাপন করা।

তবে এটি মনে রাখা জরুরী যে প্রতিটি শিশুই আলাদা এবং ব্যক্তি কিভাবে বিকষিত হবে তা আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়।বিশেষ চাহিদাযুক্ত শিশুদের জন্য সঠিক স্কুলের অভাব এবং পরিস্থিতি মেনে নিতে বাবা-মায়ের অনীহার মানে হলো দেরীতে শিশুদের রোগ নির্ণয় হওয়া এবং আরো দেরীতে প্রয়োজনীয় সাহায্য পাওয়া। কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেমন Proyash বিশেষ এ ধরনের শিশুদের সাহায্য করে থাকে।

জটিলতাসমূহ

ডাউন’স সিন্ড্রোম আক্রান্ত অনেক শিশুর স্বাস্হ্যগত সমস্যা থাকে। সম্ভব জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

হৃদরোগ,

অন্ত্রের অস্বাভাবিকতা,

হজমের সমস্যা,

শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির বৈকল্য,

থাইরয়েডের ত্রুটিপূর্ণ ক্রিয়া,

সংক্রমণ,

ঘাড়ের হারের (Cervical spine) সমস্যা,

রক্তের রোগ,

এই সমস্যা গুলোর তীব্রতা ব্যক্তি বিশেষে পরিবর্তিত হয়।কিছু শিশুর এর কোনোটিই হয়না, আবার কাউকে এর কয়েকটি ভোগ করতে হয়। আপনার শিশুকে অন্য শিশুদের তুলনায় ঘনঘন শিশু বিশেষ জ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করাতে হতে পারে যাতে করে নিত্যনতুন সমস্যাগুলোকে দ্রুত সনাক্ত করা যায়।

About the author

Maya Expert Team