নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব মাসিক

দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত

দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত
স্বাভাবিকভাবে মাসিক গড়ে চার দিন স্থায়ী হয় এবং স্বভাবত প্রতি ২৮ দিন পরপর হয় (৭দিন কম বা বেশি)
দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে এবং মাসিকচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার (menopause) পর রক্তপাত হওয়া অস্বাভাবিক এবং তা বিভিন্ন কারণে হতে পারে, এটা একটি রোগ এবং সাধারণত ক্ষতিকর। ক্যান্সার বা প্রাক-ক্যান্সারের কারণে যোনি থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। তাই যে কোন ধরনের অস্বাভাবিক রক্তপাত পরীক্ষা করাটা জরুরী। মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাতের কারণসমূহ

  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতাঃ ইস্ট্রজেন এবং প্রোজেসটেরন হরমোনের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা স্পটিং (spotting)-এর জন্য দায়ী। অকার্যকর গর্ভাশয় বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম, থাইরয়েড গ্রন্থির ভারসাম্যহীনতা, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাওয়া আরম্ভ করা বা বন্ধ করা – এসবই আপনার হরমোনের ভারসাম্যর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
  • জরায়ুস্হ জন্মবিরতিকরন যন্ত্র (Intrauterine device) একটি কপার ও প্লাস্টিক নির্মিত যন্ত্র যা জরায়ুর ভেতরে ঢোকানো হয় এবং এটি অস্বাভাবিক রক্তপাতের কারণ হতে পারে।
  • জরুরী গর্ভনিরোধক বড়ি গ্রহণ,
  • সাম্প্রতিক গর্ভপাত,
  • গর্ভধারণে জটিলতাঃ গর্ভাবস্হা্য় যেকোন ধরণের স্পটিং অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে। গর্ভসঞ্চারনের সময় সামান্য রক্তপাত হওয়াটা স্বাভাবিক এবং তারপরও তা পরীক্ষা করানো আবশ্যক। গর্ভপাত বা অস্বাভাবিক গর্ভাবস্হা (যেখানে নিষিক্ত ডিম্বানু জরায়ূর বাইরে সাধারণত গর্ভনালীতে প্রতিস্হাপিত হয়) – রক্তপাতের কারণ হতে পারে।
  • যোনির শুষ্কতা,
  • সংক্রমণঃ যেকোন সংক্রমনই প্রদাহ ও রক্তপাতের কারণ হতে পারে। যৌনক্রিয়া বা গর্ভনিরধের জন্য ডুশ দেয়ার পরে সংক্রমণ হতে পারে অথবা শ্রোণীর প্রদাহ রোগ (Pelvic Inflammatory Disease) বা যৌন সংক্রমণের STI–এর কারণেও হতে পারে। শ্রোণীর প্রদাহ রোগের ক্ষেত্রে প্রজননঅংগে ক্ষতসহ প্রদাহ দেখা যায়।
  • জরায়ুর ক্ষতিকর টিউমারঃ এগুলো অ-ক্যান্সারজনক কোষ যা জরায়ুতে তৈরী হয়। এরাও রক্তপাত ঘটাতে পারে।
  • ক্যান্সারঃ গর্ভাশয়ের সংকীর্ণ অংশে, যোনি, জরায়ু ও গর্ভাশয়ে ক্যান্সারের কারণেও রক্তপাত হতে পারে।
  • বিরল কারণসমূহঃ শারীরিক ধকল, ডায়বেটিস, অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাত, রক্তের ঘনত্ব কমিয়ে দেয় এমন কিছুর ব্যবহার।

হরমোনাল জন্মনিয়ন্ত্রকসমূহ

হরমোনাল গর্ভনিরোধ পদ্ধতি শুরু করার তিন মাসের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাত, যেমন-  মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত, হওয়াটা স্বাভাবিক, যেমনঃ

  • সমন্বিত মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি (combined oral contraceptive pill)
  • শধুমাত্র প্রজেস্টোজেনযুক্ত গর্ভনিরোধক বড়ি (progestogen-only contraceptive pill )
  • গর্ভনিরোধক প্যাচ(ট্রান্সডার্মাল প্যাচ) (contraceptive patch (transdermal patch))
  • গর্ভনিরোধক ইমপ্লান্ট বা ইনজেকশন (contraceptive implant or injection )
  • ইনট্রাইউটেরিন ব্যবস্থা (আইইউএস) (intrauterine system (IUS) )

যদি আপনি রক্তপাতের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হন, বা এটি তিন মাসের বেশি দীর্ঘ হয়, সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।

এছাড়াও মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে আপনার রক্তপাত হতে পারে যদিঃ

  • কোনো বড়ি খাওয়া বাদ পড়লে (miss any combined pills )
  • কোনো প্রোজেস্টোজেনযুক্ত বড়ি বাদ পড়লে (miss any progestogen-only pills )
  • আপনার প্যাচ বা যোনিতে পরানো রিং নিয়ে কোনো সমস্যা হলে
  • বড়ি খাচ্ছেন এবং সেই সাথে অসুস্হতা বা ডায়রিয়া হয়েছে
  • এন্টিবায়োটি্‌ক, নির্দেশিত ওষুধ নিচ্ছেন এবং বড়ি,প্যাচ, রিং বা ইমপ্লান্ট ব্যবহার করছেন
  • বড়ি বাদ পড়েছে-, প্যাচ বা রিংমুক্ত সপ্তাহ- যখন আপনি বড়ি নিচ্ছেন না অথবা প্যাচ বা রিং পরছেন না।

ঘরে  যত্ন নেওয়া
যেকোন ধরনের অতিরিক্ত রক্তপাতকে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করাতে হবে। রক্তপাতের পরিমান নির্ধারন করার জন্য আপনি পুরোটা সময় ধরে কতগুলো প্যাড ব্যবহার করেছেন, কত ঘনঘন আপনাকে প্যাড বদলাতে হয়েছে এবং প্যাডগুলো কতটা ভেজা ছিলো তার একটা হিসাব রাখুন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন
যদি আপনার রক্তপাতের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হন তাহলে ডাক্তারকে দেখান। যদিঃ

  • আপনি গর্ভবতী হন
  • দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে যেকোন সময়ে অনাকাঙ্খিত রক্তপাত হলে
  • মেনোপেজের পরে রক্তপাত হয়
  • মাসিকের সাথে অধিক রক্তপাত হয়
  • অস্বাভাবিক রক্তপাতের সাথে মাথা ঘোরা, ক্লান্তি

একজন স্বাস্হ্য পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ আপনার লক্ষণগুলো নিয়ে কথা বলবেন। আপনার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তারা কিছু পরীক্ষা করাতে বলতে পারে, যেমনঃ

  • গর্ভধারণের পরীক্ষা,
  • জরায়ুর স্ক্রীনিং পরীক্ষা, যদি আপনি ২৫-৬৪ বছর বয়সী হন এবং এগুলো সম্প্রতি না করে থাকেন।
  • আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান,
  • যৌনরোগ সনাক্ত করার পরীক্ষা,

কিছু পরিস্হি্তি সনাক্ত করার জন্য আপনার এরকম পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে, যেমনঃ

  • স্পেকুলাম পরীক্ষা – স্পেকুলাম একটি চিকিৎসা যণ্ত্র যা যোনীর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।
  • আঙ্গুলের সাহায্যে যোনীর এক ধরণের আভন্ত্যরীন পরীক্ষা (বাইম্যানুয়াল পরীক্ষা)

চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো আপনার জন্য কিছুটা জটিল ও যন্ত্রনাদায়ক হতে পারে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনি শান্ত থাকেন এবং ডাক্তারের সঙ্গে সহযোগীতা করেন। এভাবে আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে সর্বনিম্ন অস্বস্তির মধ্যে সবগুলো পরীক্ষা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

About the author

Maya Expert Team