মাসিক না হওয়ার কারণসমূহ

মাসিক না হওয়ার কারণসমূহ
জীবনের কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে মাসিক বন্ধ হওয়া স্বাভাবিক, তবে কখনো কখনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাসিক বন্ধ হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না ।


প্রাকৃতিকভাবে মাসিক বন্ধ হওয়া
গর্ভবতী অথবা শিশুকে স্তন্যপান করানোর সময় মাসিক বন্ধ হওয়া স্বাভাবিক। সবার ক্ষেত্রেই মেনোপজের (রজঃনিবৃত্তি) সময় মাসিক অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ৫০ বছর বয়সকালে ডিম্বাশয় নিয়মিত ভাবে ডিম্বাণু উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, এ অবস্থাকে মেনোপজ বলে ।

অজান্তেও অনেকে গর্ভবতী হয়ে পড়তে পারেন, এর জন্যও মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যখন জন্ম নিরোধক পদ্ধতি ঠিকমত কাজ করে না তখন এমনটা হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় ও স্তন্যপান করানোর সময়কালে বন্ধ হয়ে যাওয়া মাসিক সময়ের সাথে ফিরে আসে । মেনোপজের পর মাসিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় ।


শারীরিক বিকাশে বিলম্ব হওয়া
সাধারনত ১২ বছর বয়সকালে মেয়েদের মাসিক শুরু হয়ে থাকে । তবে কিছু কিছু মেয়েদের ক্ষেত্রে ১২ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও মাসিক শুরু হয় না, বিশেষ করে যাদের মা কিংবা বড় বোনের মাসিক দেরীতে শুরু হওয়ার ইতিহাস আছে।

সাধারনত এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন পড়ে না; কেননা অধিকাংশ মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৬-১৮ বৎসর বয়সের মধ্যে মাসিক শুরু হয়ে যায়।


জন্মনিরোধক পদ্ধতি
জন্মনিরোধক ইমপ্লান্ট, গর্ভনিরোধক ইনজেকশন (যেমন সোমাজেক্ট) কিংবা সাধারণভাবে গর্ভনিরোধক পিল (মিনি পিল হিসেবেও পরিচিত) প্রভৃতি পদ্ধতি গ্রহণকারী কিছু মহিলাদের মাসিক অনিয়মিত বা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যেতে পারে ।

উক্ত জন্মনিরোধক পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করা বাদ দিলে মাসিক পুনরায় নিয়মিত হয়ে যায়, যদিও মাঝে মাঝে এসব পদ্ধতির প্রভাব স্থায়ী হয়ে যেতে পারে ।

যদি এসব জন্মনিরোধক পদ্ধতি বন্ধ করার ৬ মাস বা তার অধিক সময় পরও মাসিক শুরু না হয়ে থাকে, তাহলে পরামর্শের জন্য ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন ।


শারীরিক অসুস্থতা
মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে কয়েকটি স্বাস্থ্যগত বা রোগজনিত কারণও রয়েছে । এসব স্বাস্থ্যগত সমস্যা মাসিক শুরু হওয়ার স্বাভাবিক সময়ের আগে দেখা দিলে তখন প্রাইমারি বা প্রাথমিক অ্যামোনোরিয়া হয়। আর স্বাভাবিক নিয়মে মাসিক শুরু হওয়ার পর এসব স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হলে তখন সেকেন্ডারি বা দ্বিতীয় পর্যায়ের অ্যামেনোরিয়া হয়।

মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার রোগজনিত কারণসমূহের প্রধান কয়েকটি নিচে আলোচনা করা হল-


পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম
মাসিক বন্ধ হওয়ার প্রতি ৩টি কেসের মধ্যে ১টি কেসই ঘটে থাকে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওস) এর কারনে ।

পিসিওসের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলোঃ

  • ডিম্বাশয়ের অধিকাংশ ফলিকল (follicles) অপুষ্ট থাকা
  • নিয়মিতভাবে ডিম্বস্ফোটন না হওয়া
  • শরীরে পুরুষ হরমোন (এন্ডোজেন) উচ্চ মাত্রায় উপস্থিত থাকা
  • মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পিসিওসের অন্যান্য লক্ষণসমূহ হলো অত্যাধিক চুল গজানো, সন্তান ধারনে ও ওজন বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি হওয়া।


হাইপোথ্যালামিক অ্যামোনোরিয়া

মস্তিষ্কের যে অংশ দ্বারা মাসিক চক্র পরিচালিত হয় সে অংশ হাইপোথ্যালামাস নামে পরিচিত । এ অংশ হরমোন উৎপাদন করে যা ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সৃষ্টি করে । হাইপোথ্যালামিক অ্যামোনোরিয়ার ক্ষেত্রে হাইপোথ্যালামাস হরমোন উৎপাদন বন্ধ করে দেয় যার ফলে মাসিক চক্র থেমে যায় ।

ঠিক কী কারণে হাইপোথ্যালামাসে এরকম হয়ে থাকে তা এখনো অস্পস্ট, তবে নিম্নোক্ত কারণগুলো  এক্ষেত্রে ভুমিকা রাখে

  • অত্যাধিক ওজন হ্রাস, উদাহরণস্বরূপ অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা (anorexia nervosa) নামক অসুখের কথা বলা যায়, এ রোগে আক্রান্তরা খাবার খেতে পারে না, ফলে ওজন কমে যায়
  • অধিক ব্যায়াম বা শরীরচর্চা
  • মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা
  • দীর্ঘ মেয়াদী (ক্রনিক) অসুস্থতা, যেমন হৃদরোগ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
  • ক্রীড়াবিদ বা নৃত্যশিল্পী যাদের শারীরিক ফিটনেস বা সুস্থতা ও কম ওজন বজায় রাখতে হয়, সেসব পেশায় নিয়োজিত মহিলাদের মধ্যে হাইপোথ্যালামিক অ্যামোনোরিয়া সবচেয়ে বেশি হতে দেখা যায়।

মাসিক না হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় না থাকলেও যদি হাইপোথ্যালামিক অ্যামোনোরিয়ার লক্ষণগুলো দেখা দেয় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, কেননা এ রোগের কারণে হাড় ভঙ্গুর (অস্টিওপোরোসিস) হয়ে যায়, ফলে হাড়ে ফাটল দেখা দিতে পারে বা সহজেই ভেঙ্গে যেতে পারে।


হাইপারপ্রোল্যাকটিনিমিয়া
শরীরে প্রোল্যাকটিন নামক হরমোন উচ্চ মাত্রায় উপস্থিত থাকলে তাকে হাইপারপ্রোল্যাকটিনিমিয়া বলে ।

শুধুমাত্র শিশু জন্মের পর উচ্চ মাত্রার প্রোল্যাকটিন থাকা প্রয়োজন, কেননা সে সময়ে এ হরমোন বুকে দুধ উৎপাদন করতে সাহায্য করে । শিশু জন্ম ব্যতীত অন্যান্য সময়ে বেশি প্রোল্যাকটিনের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাসিক চক্রতে বিঘ্ন ঘটায় যার ফলে মাসিক বন্ধ হয়ে যায় ।

প্রত্যেক ২০০ জনের মধ্যে ১ জন মহিলা এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। আরো অন্যান্য কারনেও এ রোগের সৃষ্টি হতে পারে, যেমন

  • মস্তিষ্কের টিউমার
  • মাথায় তীব্র বা জটিলভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে
  • কিডনী জনিত রোগ
  • লিভার সিরোসিস

হাইপারপ্রোল্যাকটিনিমিয়া নিম্নোক্ত ঔষধ ও চিকিৎসার প্বার্শপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও সৃষ্টি হতে পারেঃ

  • রেডিওথেরাপি
  • বিষন্নতা দূরকারী ঔষধ
  • ক্যালসিয়াম চ্যানেল ভঙ্গকারী ঔষধ যা উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়
  • ওমিপ্রাজোল জাতীয় ঔষধ যা পাকস্থলির আলসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়
  • হেরোইন জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়মিতভাবে গ্রহণকারী মহিলারা প্রায়ই হাইপারপ্রোল্যাকটিনিমিয়াতে আক্রান্ত হোন ।

প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিওর
মেনপোজের নির্দিষ্ট বয়েসের আগেই (সাধারণত ৪৫ বছর) যদি ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় তখন তার পিছনে দায়ী থাকে প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিওর ।

ধারণা করা হয় ৪০ বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১ জন এবং ৪৫ বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগে প্রতি ২০ জনের মধ্যে ১ জন মহিলা প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিওরে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিওরের আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভুলের দরুণ ডিম্বাশয় আক্রান্ত হওয়ার কারনে এটা হয়ে থাকে। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি গ্রহণের সাথেও এ রোগ হওয়ার সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয় । মাসিক না হওয়া নিয়ে চিন্তা না থাকলেও প্রিম্যাচিউর ওভারিয়ান ফেইলিওরের লক্ষণ অনুভূত হলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত । কেননা এ সমস্যার ফলে পরবর্তীতে অস্টিওপোরেসিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।


থাইরয়েড জনিত সমস্যা
থাইরয়েড গ্রন্থি গলায় উপস্থিত থাকে । এ গ্রন্থি থেকে হরমোন উৎপন্ন হয় যা রক্ত প্রবাহে নিঃসৃত হয়ে শরীরের বৃদ্ধি ও রাসায়নিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। হৃদপিন্ডের স্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা প্রভৃতি কার্যপ্রক্রিয়াও এ হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং শরীরকে কর্মক্ষম রাখার জন্য এ হরমোন খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।

কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে, থাইরয়েড গ্রন্থি নিম্নোক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে

  • অতিরিক্ত পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন তৈরি হওয়া- এ অবস্থাকে অতিসক্রিয় থাইরয়েড গ্রন্থি বা হাইপারথাইরোডিজম বলে
  • স্বল্প পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন তৈরি হওয়া- এ অবস্থাকে কম সক্রিয় থাইরয়েড গ্রন্থি বা হাইপারথাইরোডিজম বলে

হাইপারথাইরোডিজম ও হাইপোথাইরোডিজম উভয় অবস্থায়ই মাসিক বন্ধ করে দেয় ।


জীনগত সমস্যা
জীনগত সমস্যা থেকে সৃষ্ট কিছু রোগ বা অবস্থার কারণেও মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যদিও এটা খুব একটা দেখা যায় না। এ অবস্থা বা রোগ গুলো হলোঃ

  • টার্নার সিনড্রোম (Turner syndrome) – প্রত্যেক ২০০০ নারীর মধ্যে ১ জন নারী এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন বলে ধারণা করা হয় । এ সমস্যায় আক্রান্তরা যে জাতীয় ডিম্বাশয় নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, তা থেকে মাসিক চক্র পরিচালনাকারী প্রয়োজনীয় হরমোন উৎপন্ন করে না ।
  • ক্যালমান সিনড্রোম (Kallmann syndrome) – এটি একটি বিরল রোগ যাতে প্রতি ১০০০ জনের মধ্যে ১জন আক্রান্ত হোন । যৌন বৈশিষ্ট বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন এ রোগের কারণে নিঃসৃত হয় না ।
  • এন্ডোজেন ইনসেনসিটিভিটি সিনড্রোম (androgen insensitivity syndrome) – ২০০০ জন মহিলার মধ্যে ১জন মহিলা এ বিরল রোগে আক্রান্ত হোন । এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি জীনগতভাবে পুরুষ থাকেন কিন্তু তাদের যৌনাঙ্গ মহিলাদের মত হয়ে থাকে ।


জন্ম ত্রুটি
বিরল ক্ষেত্রে মাসিক না হওয়ার পিছনে জন্মগত নারীর প্রজনন তন্ত্রের গঠন ও বিকাশের সমস্যা দায়ী থাকতে পারে, তা হতে পারে জরায়ু বা যৌনাঙ্গ ব্যতীত জন্ম গ্রহণ করা।