নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব মাসিক

মাসিক চক্র বা রজঃচক্র কী ?

Written by Maya Expert Team

মাসিক চক্র বা রজঃচক্র কী ?
মাসিক চক্র (menstrual cycle) হচ্ছে একজন নারীর মাসিকের প্রথম দিন থেকে পরেরবার মাসিক শুরু হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত সময়কাল। ৮ বছর বয়সের পর যে কোন সময় থেকে মেয়েদের মাসিক শুরু হতে পারে, তবে বাংলাদেশের মেয়েদের মাসিক শুরুর গড় বয়স ১২ বছর। আমাদের দেশের নারীদের মেনোপজ (যখন থেকে মাসিক হওয়া বন্ধ হয়ে যায়) হয় সাধারণত ৪৫-৫০ বছর বয়সের মধ্যে।


মাসিক চক্রের সময় কী ঘটে?
প্রথমে মেয়েদের প্রজনন অঙ্গ সম্বন্ধে দ্রুত কিছু ধারনা নেয়া যাক।

এখানে দুটি ডিম্বাশয় (ovaries) থাকে। ডিম্বাশয় প্রতিমাসে, সাধারণত আপনার মাসিকের প্রথম দিন থেকে পরের ১৫ দিনের মধ্যে একটি ডিম্বাণু সংরক্ষণ, বৃদ্ধি এবং নির্গমনের কাজটি করে।

জরায়ুতে (uterus) নিষিক্ত (fertilised) ডিম্বাণুটি থাকে এবং গর্ভাবস্থা অগ্রসর হয়।

ডিম্ববাহী নালী (fallopian tubes) নামের দুটি সরু টিউব দিয়ে ডিম্বাশয়টি জরায়ুর সাথে সংযুক্ত থাকে। এই নালীর মধ্য দিয়ে ডিম্বাণুটি ডিম্বাশয় থেকে জরায়ুতে আসে।

জরায়ু মুখ (cervix) হচ্ছে জরায়ু বা গর্ভাশয়ের নিচের অংশ যার মাধ্যমে জরায়ুটি যোনি (vagina)-র সাথে সংযুক্ত থাকে।

যোনি (vagina) হচ্ছে একধরনের টিউব যার মাধ্যমে জরায়ু মুখ শরীরের বাইরের অংশের সাথে সংযুক্ত থাকে।

মাসিক চক্র দুইটি হরমোন, এস্ট্রোজেন (oestrogen) এবং প্রোজেস্টেরোন (progesterone) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিটি চক্রে এস্ট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি হওয়ার কারনে ডিম্বাশয় একটি ডিম্বাণু বড় করে এবং ছেড়ে দেয়, যাকে ডিম্বস্ফূটোন (ovulation) বলে। ডিম্বস্ফূটোনের পর প্রোজেস্টেরোনের কারনে জরায়ুর ভিতরের আস্তরণটি পুরু হয়ে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। ডিম্বাণুটি ডিম্ববাহী নালীর মধ্য দিয়ে নিচে নেমে আসে। যদি গর্ভধারণ না হয় তাহলে ডিম্বাণুটি পরিত্যাক্ত হয়। এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরোনের মাত্রা কমে যায়, এবং গর্ভাশয়ের পুরু হয়ে যাওয়া আস্তরণ খসে পড়ে এবং মাসিক আকারে বেরিয়ে যায়। ডিম্বাশয় একটি ডিম্বাণু ছাড়ার সময় থেকে মাসিক শুরু হওয়া পর্যন্ত ১০-১৬ দিন লাগতে পারে। এই সময়ে আপনার গর্ভবতী হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। ডিম্বাশয় থেকে ভের হয়ে আসার পর একটি ডিম্বাণু ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ভাল থাকে।


মাসিক

মাসিক তৈরি হয় রক্ত এবং জরায়ুর আস্তরণের মিশ্রণে। মাসিকের প্রথম দিনটি হচ্ছে মাসিক চক্রের প্রথম দিন। মাসিক ৩ দিন থেকে ৭ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। কোন কোন মহিলার এসময় অন্যদের চাইতে বেশি রক্তপাত হয়, তবে বেশি রক্তপাত হওয়ার কারনে সমস্যা হলে সেটির সমাধান বা চিকিৎসা করা সম্ভব।


ডিম্বস্ফূটোন (ovulation)

ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বের হয়ে আসাকে ডিম্বস্ফূটোন বলে। একজন নারী তার সবগুলো ডিম্বাণু নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। একবার তাঁর মাসিক শুরু হলে, প্রতি মাসিক চক্রের সময় একটি (কখনো কখনো দুটি) ডিম্বাণু বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, পূর্ণতা লাভ করে এবং গর্ভাশয়ে বা জরায়ুতে আসে।

ডিম্বস্ফূটোনের পর, ডিম্বাণুটি ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সজীব থাকে। যদি কোন মাসে দুটি ডিম্বাণু ছাড়া পায়, তাহলে প্রথম ডিম্বাণুটি গর্ভাশয়ে আসার ২৪ ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় ডিম্বাণুটি গর্ভাশয়ে আসে।

কোন পুরুষের শুক্রানু স্পার্ম (Sperm) ডিম্বাণুটির সাথে মিলিত হলে এবং সেটিকে নিষিক্ত করলে গর্ভধারণ ঘটে। যৌনমিলনের পর শুক্রানু সাত দিন পর্যন্ত ডিম্ববাহী নালীতে টিকে থাকতে পারে।

শুক্রানু ডিম্ববাহী নালীতে থাকাকালীন সময়ে ডিম্বস্ফূটোন না ঘটলে কোন নারী গর্ভধারণ করতে পারেন না। কয়েক ধরনের হরমোনভিত্তিক গর্ভনিরোধক (hormonal methods of contraception), যেমন মিশ্র বড়ি (combined pill), প্যাচ (patch), ইনজেকশন এবং আই.ইউ.ডি, ডিম্বস্ফূটোন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে কাজ করে।


গর্ভধারণের সম্ভাবনা কখন সবচেয়ে বেশি থাকে?

হিসেব অনুযায়ী নারীদের মাসের খুব অল্প কয়েকদিন সময় গর্ভধারণ করতে পারার কথা, এবং সেই সময়টি হচ্ছে ডিম্বস্ফূটোনের আগে ও পরের কয়েকদিন। আপনি ফার্টাইলিটি অ্যাওয়ারনেস (fertility awareness) চর্চা না করলে, ওভুলেশন ঠিক কখন হচ্ছে সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারাটা কঠিন। বেশিরভাগ নারীর ডিম্বস্ফূটোন পরবর্তী মাসিক চক্র শুরুর ১০-১৬ দিন আগে ঘটে।

গর্ভধারনের পরিকল্পনা করার জন্য বা গর্ভধারণ এড়ানোর জন্য আপনি ফার্টাইলিটি অ্যাওয়ারনেস চর্চা করতে পারেন। এটি করতে হলে আপনাকে যোনি রসের পর্যবেক্ষণ, প্রতিদিন আপনার শরীরের তাপমাত্রা মাপা, এবং আপনার মাসিক চক্রের একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করতে হবে যা দিয়ে আপনার ডিম্বস্ফূটোনের সময়টি নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। মায়ার একটি নিজস্ব ডিম্বস্ফূটোন টুল () রয়েছে যা দিয়ে মাসের কোন সময়ে আপনার গর্ভধারণ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তা নির্ণয় করতে পারেন।

মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে যোনি রসের বিভিন্ন পরিবর্তন হয়। ডিম্বস্ফূটোন ঘটার সময় এটি আরও পাতলা হয়ে যায় এবং এর আঠালো ভাব কমে যায়, যা কিছুটা কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মত।

মাসিক চক্রের ১৪তম দিনে মেয়েদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে এমনটা বলা যাবে না। যেসব নারীদের নিয়মিত ২৮ দিনের চক্র হয় তাদের জন্য এটি সত্য হতে পারে, তবে যাদের চক্রটি এই সময়ের চেয়ে কম বা বেশি দিন ধরে হয় বা অনিয়মিতভাবে হয় তাদের ক্ষেত্রে এটি সঠিক নয়।

About the author

Maya Expert Team