নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব পিসিওএস

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম
ভূমিকা

১৫ বছর বয়সী একটি কিশোরী মেয়ে তার মাসিক শুরু হওয়ার সময় থেকেই তীব্র ব্রণের সমস্যায় ভূগছে। কিছুদিন আগে, সে তার চিবুক ও গালে ঘন চুল লক্ষ্য করল, যার জন্য স্কুলে সে খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। ওয়াক্সিং, থ্রেডিং, ব্লিচিং অনেকবার করানোর পরও সে কোনো ফল পেলো না এবং সেই কিশোরী মেয়েটির জীবন দুঃসহ হয়ে উঠল।

৯ মাস সময় যাবত এক দম্পতি সন্তান নেবার চেষ্টা করছেন যা বারবার বিফল হচ্ছে। অধিক জনসংখ্যাময় একটি দেশ, যেখানে বন্ধ্যাত্ব সমস্যা ও যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণার গুরুতর অভাব রয়েছে, সেখানে কোনো দম্পতি কেন সন্তান নিতে অক্ষম হচ্ছেন, তার কারণ নিয়ে সাধারণত ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে। বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়দের দোষারোপ করা হয়, স্ত্রীর উপর অপবাদ ও অনুযোগের আঙ্গুল তোলা হয়, যা ঐ অবস্থাকে আরো জটিল করে তোলে।

একজন ২৭ বছর বয়সী নারী, অনিয়মিত মাসিকের তীব্র সমস্যায় আক্রান্ত। গত ১ বা ২ বছরে তার ওজন অত্যাধিক বেড়ে গেছে। তার শরীর মেদবহুল হয়ে গেছে এবং এই স্থূল হয়ে পরার জন্য তার পরিবার, বন্ধুদের সামনে অস্বস্তিবোধ করেন। মাসিক না হওয়ার কারণে তিনি তার ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, বিশেষ করে তিনি যখন বিয়ে ও সন্তান নিয়ে চিন্তা করে থাকেন।

একজন ২২ বছর বয়সী নারী তলপেটে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করেন। যখন তিনি হাসপাতালে যান, ডাক্তার তখন ঐ মহিলার এপেন্ডিসাইটিস হয়েছে বলে সন্দেহ করেন, কিন্তু আল্ট্রাসাউন্ড ও অন্যান্য পরীক্ষায় দেখা যায় তার অ্যাপেন্ডিক্স সম্পূর্ণ ঠিক আছে। তিনি তার ছেলেবন্ধুর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন এবং এ বিষয়ে তার পরিবার, এমনকী ডাক্তার পর্যন্ত যাতে না জানতে পারে, সেজন্যে নিজের সম্পর্কে সীমিত তথ্য জানিয়েছেন।

নারীদের প্রজনন সক্ষম বয়সকালে বর্তমানে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া হাজারো সমস্যার মধ্যে ৪টি সমস্যা এখানে বলা হলো। এসব সমস্যার পিছনের প্রধান কারণ প্রায়ই অনুচ্চারিত থাকে, কিছুটা লুকানো এই অবস্থা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) নামে পরিচিত। কোন রোগে আক্রান্ত আছেন তা অনেকে জানতে বা বুঝতে না পারলেও, প্রজনন বয়সকালে বাংলাদেশের ২২% মহিলা পিসিওএসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন (তথ্যঃস্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ এর প্রফেসর কোহিনূর বেগম কর্তৃক ২০০০ সালে প্রকাশিত জার্নাল)

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগিদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে থাকে, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলি হলোঃ

  • অলিগো বা অ্যানোভিউলেশন হওয়া অর্থাৎ ডিম্বাশয়ে একেবারেই ডিম্বস্ফোটোন না হওয়া অর্থাৎ ডিম্বাণু নির্গত না হওয়া বা প্রত্যেক মাসে না হওয়া
  • হাইপারঅ্যান্ড্রোজেনিজম অর্থাৎ শরীরে পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরনের উচ্চ মাত্রায় উপস্থিতির কারণে বিভিন্ন উপসর্গ যেমন ব্রণ, চুল পড়া, মুখ ও শরীরে অত্যাধিক চুল গজানো প্রভৃতি প্রকাশিত হওয়া
  • পলিসিস্টিক ওভারি, যখন আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ডিম্বাশয়ে ১২ বা তার অধিক পেরিফেরাল ফলিকুলার সিস্ট উপস্থিত থাকা

অন্যান্য সকল লক্ষণসমূহ যেমন বন্ধ্যাত্ব, অনিয়মিত বা অস্বাভাবিক মাসিক হওয়া, মেদবৃদ্ধি প্রভৃতি উপরোক্ত ৩টি লক্ষণের সাথে সম্পর্কযুক্ত।


ডাক্তার যেসব পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন সেগুলো হলোঃ

  • একটি আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা
  • রক্তে টেস্টোস্টেরন, এফএসএইচ, এলএইচ, প্রোল্যাকটিন প্রভৃতি হরমোনের মাত্রা পরিমাণ পরীক্ষার জন্য রক্ত পরীক্ষা
  • শর্করার মাত্রা, বিশেষ করে সকালের নাস্তা করার ২ ঘন্টার পর পরিমাপের জন্য রক্ত পরীক্ষা


বন্ধ্যাত্ব (ইনফার্টিলিটি
)-এর সাথে সম্পর্ক

কোনো নারী পিসিওএসে আক্রান্ত হলে সাধারণত প্রথমবার তখনই শনাক্ত করা যায় যখন দম্পতিরা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করে অসফল হোন । বিশ্বব্যাপী বন্ধ্যাত্ব সমস্যার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হল পিসিএস । যখন কোনো মহিলা পিসিওএসে আক্রান্ত হন, তখন প্রত্যেক মাসে তাদের ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হয় না এবং কয়েক মাস ধরে ডিম্বস্ফোটন বন্ধ থাকতে পারে । ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে মাসের পর মাস সেই দম্পতিকে সন্তান নেয়ার চেষ্টা করতে হয়। এটি অনেক মহিলার জন্য বেদনাময় ও হৃদয়বিদারক হতে পারে । পিসিওএসে আক্রান্ত হওয়ার মানে এই নয় যে আক্রান্ত হওয়া নারী কখনোই মা হতে পারবেন না । এতে আক্রান্ত হওয়ার এই অর্থ দাঁড়ায় যে গর্ভবতী হওয়ার জন্য সার্বজনীনভাবে যে সময় প্রয়োজন হয়, আক্রান্ত নারী তার থেকে একটু সময় বেশি লাগতে পারে ।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা গ্রহণ ও জীবনপদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।  স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, শরীরচর্চা, মেটফোরমিন অথবা ক্লোমিফেন সাইট্রেট জাতীয় ঔষধ গ্রহণ কিংবা গোনাড্রোট্রোফিনস এর সাথে ডিম্বাশয় উদ্দীপত কারী ঔষধ প্রভৃতি গ্রহণের মাধ্যমে পিসিওএসে আক্রান্ত সকল মহিলা গর্ভবতী হতে পারেন । ল্যাপোরোস্কোপিক ওভারিয়ান ডায়াথার্মি নামক একটি ছোট অস্ত্রোপচার পদ্ধতি পরিচালনা কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে।

এ বিষয়টি মনে রাখা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে পিসিওএসে আক্রান্ত হলে গর্ভবতী হওয়া যাবে না, এ কথা ঠিক নয় । যদি পরীক্ষাতে আপনার পিসিওএস ধরা পড়ে, তবে আশাহত হবেন না। চিকিৎসা গ্রহণ ও জীবনপদ্ধতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি গর্ভধারণে সক্ষম হবেন।


চিকিৎসা
পিসিওএসের সর্ব প্রথম চিকিৎসা হচ্ছে ওজন কমানো । পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের অধিকাংশদেরই ওজন সাধারণত অতিরিক্ত থাকে । নিয়মিত ব্যায়াম ও মিষ্টিমুক্ত খাবার গ্রহণ ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং পিসিওএসের উপসর্গগুলোকে নিয়ন্ত্রনে আনে । ইনসুলিন ও ডায়াবেটিসের সাথে পিসিওএস সম্পর্ক আছে। সেই কারণে অতিরিক্ত চিনিও শর্করাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয় । চিনিমুক্ত খাবার গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা শুধুমাত্র ওজন হ্রাসের মাধ্যমেই অনেক মহিলা গর্ভবতী হতে পারেন ।

উচ্চ পরিমাণে জি আই সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণও অত্যাবশ্যক । উচ্চ মাত্রার জি আই চাল (পূর্ণভা নামে অধিকাংশ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং কিছু ফার্মেসিতে পাওয়া যায়) এবং শস্যদানা থেকে তৈরি ময়দা হলো জি আই সমৃদ্ধ খাবার ।

খাদ্য তালিকায় ফাইটোস্ট্রোজেনস যুক্ত করুন, যা হলো একটি ক্যামিকেল এবং এটি শরীরে ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে । যদিও প্রাকৃতিকজাত এসব ক্যামিকেল বা রাসায়নিক পদার্থ ফলপ্রসূ হয় কি না তা নিয়ে ভিন্ন মত প্রচলিত আছে, তবে শুধুমাত্র ফাইটোস্ট্রোজেন গ্রহণ বৃদ্ধি করে অনেক মহিলাই ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছেন বলে জানা যায় । তিসির তেল, সয়া দুধ ও টফুতে ফাইটোস্ট্রোজেন উপস্থিত থাকে । যদিও এসব খাবার আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের অন্তর্গত নয়, কিন্তু উক্ত খাদ্য সমূহে এই ক্যামিকেল উচ্চ মাত্রায় থাকে । অন্যান্য যেসব খাবারে ফাইটোস্ট্রোজেন থাকে সেগুলো হলো ছোলা, শিম, বাঁধাকপি, ব্রুকলি (ফুলকপি), গাজর প্রভৃতি। এসব খাবার গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি করুন এবং তা ফলপ্রসূ হয় কি না দেখুন ।

মাসিক চক্রকে নিয়মিত করার জন্য ডাক্তার জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ি গ্রহণের পরামর্শ দিতে পাবেন । এর পাশাপাশি ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করার ঔষধ গ্রহণের কথাও বলা হতে পারে । এ জাতীয় ঔষধগুলি মূলত হরমোন সমৃদ্ধ যা ডিম্বস্ফোটন ত্বরান্বিত করে । গর্ভধারণে সক্ষম করার জন্য ক্লোমিফেন ও মেটফোরমিন জাতীয় ঔষধ গ্রহণের কথাও বলা হতে পারে । ব্রণ ও অন্যান্য উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্যান্য আরো কিছু ঔষধ গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হবে ।


পূর্ব সতর্কতা
কারা পিসিওএসে আক্রান্ত হবেন তা ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। এর পিছনে কোনো প্রত্যক্ষ কারণ নেই। তবে, তরুণী ও কিশোরী মেয়েরা যাতে সুষম খাদ্য গ্রহণ ও স্বাস্থ্যকর জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করে তার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। আপনার মেয়েকে সবচেয়ে মূল্যবান যে শিক্ষাটি দিতে পারেন তা হচ্ছে তাকে শরীরচর্চা ও ব্যায়ামের গুরুত্ব শেখানো। যেসব পরিবারে পিসিওস হওয়ার ইতিহাস আছে, সেসব পরিবারে এ শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরী।

আধুনিক জীবন যাপনের অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি, যেমন খাবারের মাধ্যমে যে সমস্থ বিষাক্ত পদার্থ আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে, তা হঠাৎ করে পিসিওএসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবনতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের জীবন থেকে সম্পূর্ণরূপে এসব কীটনাশক ও প্রিজার্ভেটিভসমূহকে (খাদ্য সংরক্ষক) বর্জন করা সম্ভব হবে না, তবে এগুলোকে যতটুকু সম্ভব সীমিতভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

About the author

Maya Expert Team