নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব পিসিওএস

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের চিকিৎসা

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের চিকিৎসা
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস) নিরাময় করা সম্ভব নয়, তবে উপসর্গগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, কেননা পিসিওসে আক্রান্তদের কেউ কেউ বিভিন্ন ধরণের অথবা কেউ কেউ শুধুমাত্র একটি লক্ষণ অনুভব করতে পারেন ।

প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি গুলোর বিস্তারিত আলোচনা নিচে করা হয়েছে ।


জীবনযাপন
পদ্ধতি পরিবর্তন
অতিরিক্ত স্থুল মহিলাদের ক্ষেত্রে ওজন কমানোর মাধ্যমে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের (পিসিওএস) লক্ষণসমূহ ও দীর্ঘ মেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি সহজেই কমানো যায় । শুধুমাত্র ৫% ওজন কমলেও, পিসিওস নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আপনার ওজন ঠিক আছে কী না তা আপনার ‘শরীরের ভরের সূচক’ বা বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) গণনার মাধ্যমে জানতে পারা যায় । বিএমআই হচ্ছে একটি পরিমাপ যা ওজনের সাথে উচ্চতার সামঞ্জস্যতা নিরুপণ করে । বিএমআই- এর সাধারণ ও নিরাপদ মান হচ্ছে ১৯ থেকে ২৫ । যদি আপনার বিএমআই স্বাস্থ্যকর সীমায় থাকে, তাহলে বিএমআই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে ব্যায়াম করুন ।

নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ওজন কমানো যায় । আপনার খাদ্য তালিকায় প্রচুর পরমাণে ফল ও শাকসব্জি, শস্য দানা (যেমন গমের ব্রেড, সিরিয়াল, ও বাদামি চাল), চর্বি মুক্ত মাংস, মাছ ও মুরগির মাংস থাকা উচিত । আপনার খাবার তালিকায় কি কি থাকবে সে সম্পর্কে জানার জন্য গাইনোকোলোজিস্ট আপনাকে একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়ার জন্য বলবেন ।

ক্যালরি গণনা, স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং ব্যায়াম করার মাধ্যমে ওজন কমানো সম্পর্কে জানতে আরো পড়ুন ।


চিকিৎসা
পদ্ধতি
পিসিওসের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন উপসর্গের ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা রয়েছে, তা নিম্নে আলোচনা করা হল।


অনিয়মিত
মাসিক বা মাসিক না হওয়া
গর্ভনিরোধক বড়ি বা প্রোজেস্টেরন ট্যাবলেটের ( নিয়মিত বা মাঝে মাঝে) গ্রহনের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিতকরণ করার পরামর্শ দেয়া হতে পারে । এর ফলে মাসিক নিয়মিত না হওয়ার কারনে জরায়ুর আস্তরণে সৃষ্ট ক্যান্সার (এন্ড্রোমেট্রিয়াল ক্যান্সার) হওয়ার দীর্ঘ মেয়াদী ঝুঁকিও হ্রাস পায়। আইইউএস (ইনট্রাউটেরিন সিস্টেম) দ্বারাও এই ঝুঁকি কমানো যায় তবে তাতে মাসিকের সমস্যা দূর হয় না।


বন্ধ্যাত্ব
সমস্যা
পিসিওসে আক্রান্ত অধিকাংশ মহিলারাই চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে গর্ভবতী হতে সক্ষম হোন ।ক্লোমিফেন ও মেটফোরমিন নামক চিকিৎসা হচ্ছে পিসিওসে আক্রান্ত যেসব মহিলা গর্ভবতী হতে চেষ্টা করছেন তাদের জন্য প্রথম চিকিৎসা । এই জাতীয় চিকিৎসা ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়াকে উদ্দীপ্ত করে । আপনাকে এই দুই চিকিৎসা পদ্ধতির যে কোন একটি অথবা উভয় পদ্ধতিই প্রদান করা হতে পারে ।

ক্লোমিফেন ও মেটফোরমিন গ্রহণ সত্ত্বেও যদি গর্ভবতি হওয়া সম্ভব না হয়, তবে গোনাডোট্রোফিনস নামক একটি ভিন্ন ধরণের চিকিৎসা প্রদান করা যেতে পারে । তবে, এ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে ডিম্বাশয়ে অত্যাধিক পরিমাণে উদ্দিপনা সৃষ্টি হতে পারে এবং একাধিক গর্ভধারণের সৃষ্টি হতে পারে।

গোনাডোট্রোফিনস পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে ল্যাপোরোস্কোপিক ওভারিয়ান ড্রিলিং (নীচে দেখুন) নামক একটি সার্জিক্যাল (অস্ত্রোপচার) পদ্ধতি রয়েছে । গোনাডোট্রোফিনস –এর মতো এই পদ্ধতি ব্যবহার করাও ফলপ্রসূ ও কার্যকর হয়, তবে এটি একাধিক গর্ভধারণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে না।

উপরোক্ত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো প্রয়োগের পূর্বে, আপনার ডিম্ববাহী নালী (ফেলোপিয়ান টিউব) বন্ধ অবস্থায় আছে কী না, তা পরীক্ষা করা হবে ।

কেননা ডিম্ববাহী নালী (ফেলোপিয়ান টিউব) বন্ধ অবস্থায় থাকলে, উপরোক্ত চিকিৎসা কার্যকরী হবে না।


অবাঞ্চিত
চুল গজানো ও চুল পড়া
অত্যাধিক চুল গজানো (হির্সুটিজম) ও চুল পড়া (টাক পড়া) নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলঃ

  • বিশেষ ধরণের মিশ্রি জন্মনিরোধক বড়ি (যেমন কো-সিপ্রিনডায়োল, ডায়ানেট, মারভেলন ও ইয়াসমিন)
  • সাইপ্রোটেরন এসিটেট
  • স্পাইরোনোল্যাক্টোন
  • ফ্লোটামাইড
  • ফিন্যাসটেব্রাইড

পুরুষ হরমোন যেমন টেস্টোস্টেরণের প্রভাব প্রতিহত করে এই চিকিৎসা পদ্ধতি কাজ করে । সেই সাথে ডিম্বাশয়ে পুরুষ হরমোন উৎপাদনকেও এই চিকিৎসা পদ্ধতি বাধা দান করে।

এফলোরনাইথিন নামক একটি ক্রীম ব্যবহার মুখের অবাঞ্চিত লোম সৃষ্টির হারকে হ্রাস করে । এই ক্রীম চুল পড়া বা অবাঞ্চিত চুলের চিকিৎসা করে না, তাই এটির পাশাপাশি চুল অপসারণের পণ্য ব্যবহার করা যেতে পারে । এই চিকিৎসা গ্রহণের ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে অবস্থার উন্নতি দেখতে পাওয়া যায় ।

তবে, এই ক্রীম সবসময় সব ফার্মেসিতে পাওয়া যায় না এবং ডাক্তার যদি মনে করেন ব্যবহার করা উচিত তাহলে শুধুমাত্র তখনই ব্যবহার করতে হবে ।

অবাঞ্ছিত লোম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে অতিরিক্ত চুল অপসারণের পদ্ধতি, যেমন প্লাকিং, শেভিং বা কামানো, থ্রেডিং ক্রীম বা লেজার দ্বারা অপসারণ প্রভৃতি পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন । এই পদ্ধতিগুলোর অধিকাংশই সস্তা এবং অধিকাংশ বিউটি পার্লারে এসব করানো যায় । লেজার দ্বারা অপসারণের জন্য লেজার সেন্টারে যেতে হয় এবং এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল । তবে এই পদ্ধতি চুল অপসারণের একমাত্র দীর্ঘ মেয়াদী পদ্ধতি ।


অন্যান্য
লক্ষণসমূহ

পিসিওসের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য উপসর্গ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা-

-শরীরের ওজন অতিরিক্ত হলে ওরলিস্ট্যাট জাতীয় ঔষধ ব্যবহার যা ওজন হ্রাস করে

-কোলেস্টরলের মাত্রা কমানোর ঔষধ (স্ট্যাটিন) ব্যবহার করা, যদি রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টরলর থাকে।


ব্রণের চিকিৎসা
বিভিন্ন ক্রিম, ঔষধ এবং জীবনধারায় পরিবর্তন করলে ব্রণ এর সমস্যায় উপকার পাওয়া যায়।


সার্জারি
বা অস্ত্রোপচার

পিসিওস কারনে সৃষ্ট বন্ধ্যাত্ব সমস্যার চিকিৎসার জন্য ল্যাপোরোস্কোপিক ওভারিয়ান ড্রিলিং (এলসডি) নামক একটি ক্ষুদ্র অস্ত্রোপচার করা হতে পারে ।

অ্যানেসথেশিয়া (চেতনা নাশক) ব্যবহার করে ডাক্তার তলপেটে একটি ছোট ছিদ্র করবেন এবং ল্যাপোরোস্কোপ নামক একটি ছোট, লম্বা নল ছিদ্রের মধ্য দিয়ে তলপেটে প্রবেশ করাবেন । অতঃপর তাপ অথবা লেজারের মাধ্যমে এন্ডোজেন (পুরুষ হরমোন) উৎপন্নকারী টিস্যু (কোষ) ধ্বংস করে দেয়া হয়।

ল্যাপোরোস্কোপিক ওভারিয়ান ড্রিলিং দ্বারা টেস্টোস্টেরণ ও লুটেইনিজিং হরমোনের (এলএইচ) মাত্রা কমার এবং ফলিকল উদ্দিপনাকারী হরমোন (এফ এস এইচ) এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় । এর দ্বারা হরমোনের তারতম্য নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ডিম্বাশয়ের সাধারণ কার্যক্ষমতা ফিরে আসে।

About the author

Maya Expert Team