নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব বন্ধ্যাত্ব

বন্ধ্যত্ব নির্ণয়

বন্ধ্যত্ব নির্ণয়
কোন ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা ছাড়া নিয়মিত (কমপক্ষে দুই বা তিন দিন অন্তর অন্তর) শারীরিক মিলনে শতকরা ৮৪ ভাগ দম্পতি ১ বৎসরের মধ্যে গর্ভধারণ করে। যদি ১ বৎসর পরও গর্ভধারণ না হয় তবে আপনাকে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

তবে কিছু কিছে ক্ষেত্রে তার আগেই আপনাকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে যেমন,

  • যে সমস্থ কারনে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে, তেমন কিছু যদি ইতিপূর্বে আপনার হয়ে থাকে, যেমন আপনি যদি ক্যান্সারের জন্য কেমোথেরাপি নিয়ে থাকেন
  • আপনার বয়স যদি ৩৬ এর বেশি হয় (মেয়েদের ক্ষেত্রে)

বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ের জন্য রোগীর ইতিহাস এবং পরীক্ষা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, সে কারনে দ্রুতই ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ (gynaecologist) আপনার ইতিহাস শুনবেন, শারীরিক পরীক্ষা-নিরিক্ষা করবেন, তারপর কি করতে হবে আপনাকে বুঝিয়ে দিবেন। এসব ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর এক সঙ্গেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। কারন বন্ধ্যত্বের কারন স্বামী বা স্ত্রীর, যে কোন জনের হতে পারে, অনেক সময় দুজনেরই সমস্যা থাকতে পারে। সর্বোপরি এই বিষয়টার সঙ্গে অনেকখানি আবেগ জড়িয়ে থাকে, ফলে একজন অন্যজনকে মানসিক সহায়তা দিতে পারেন। ভুলে গেলে চলবে না মানসিক চাপ বন্ধ্যত্বের অন্যতম প্রধান কারন।

ডাক্তার যখন আপনার ইতিহাস পর্যালোচনা করবেন, তখন আপনার কাছ থেকে যে সমস্থ বিষয়ে জানতে চাইবেন সে গুলো হলো


ব্যক্তিগত ইতিহাস
অতীতে আপনার কি কি রোগ হয়েছিল, তার জন্য কি চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল, আপনার যৌনজীবন কেমন, আপনার সামাজিক জীবন কেমন – এ সমস্থ কিছু জেনে, আপনার বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারন সম্পর্কে ডাক্তার একটা ধারনা করবেন।

বয়স
মেয়েদের বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে বয়স খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডাক্তার আপনার বয়স জানতে চাইবেন, বয়সের কারনে বন্ধ্যত্ব হলে সেটা আপনাকে বুঝিয়ে বলবেন।

সন্তান সংক্রান্ত তথ্য
যদি ইতিপূর্বে আপনার সন্তান হয়ে থাকে তবে ডাক্তার তাদের জন্মের সময়টার কথা জানতে চাইবেন। এর আগে গর্ভধারণে কোন সমস্যা হয়েছিল কিনা, পূর্বতন গর্ভাবস্থার সময়টাতে কোন সমস্যা হয়েছিল কিনা, কখনো গর্ভপাত হয়েছিল কিনা – এসব বিস্তারিত ভাবে জানতে চাইবেন।

কতদিন ধরে সন্তান ধারনের চেষ্টা করছেন
আপনারা কতদিন ধরে সন্তান ধারনের চেষ্টা করছেন, এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়েও ডাক্তার জানতে চাইবেন। পরিসংখ্যান বলে প্রতিরোধক ছাড়া নিয়মিত শারীরিক মিলনে

  • ১৯ থেকে ২৬ বৎসর বয়সী মেয়েদের মধ্যে শতকরা ৯২ ভাগ ১ বৎসরের মধ্যে এবং শতকরা ৯৮ ভাগ ২ বৎসরের মধ্যে গর্ভধারণ করে
  • ৩৫ থেকে ৩৯ বৎসর বয়সী মেয়েদের মধ্যে শতকরা ৮২ ভাগ ১ বৎসরের মধ্যে এবং শতকরা ৯০ ভাগ ২ বৎসরের মধ্যে গর্ভধারণ করে

আপনার বয়স যদি বেশি না হয়ে থাকে এবং আপনি যদি নিরোগ হয়ে থাকেন তবে ডাক্তার আপনাকে আরও কিছুদিন চেষ্টা করতে বলবেন।

যৌনজীবন
ডাক্তার আপনার কাছে জানতে চাইবেন, কতটা নিয়মিত আপনারা শারীরিক মিলন করে থাকেন। শারীরিক মিলনে আপনাদের কোন সমস্যা হয় কিনা। যৌনজীবন সংক্রান্ত এ ধরনের আলোচনায় হয়ত আপনি অস্বস্তি বোধ করতে পারেন, কিন্তু অবশ্যই আপনাকে খোলামেলা এবং সঠিক উত্তর দিতে হবে। কারন বন্ধ্যত্বের কারন যদি এটা সংক্রান্ত হয় তবে সহজেই তা দূর করা সম্ভব।

কবে আপনারা জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বন্ধ করেছেন
এতদিন আপনারা জন্ম নিয়ন্ত্রণের কোন পদ্ধতি ব্যবহার করতেন এবং কবে সেটা বন্ধ করেছেন, ডাক্তার তা জানতে চাইবেন। কারন কোন কোন জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বন্ধ করে দেয়ার পরও তার কার্যকারিতা কিছুদিন থেকে যায় ফলে গর্ভধারণে দেরি হয়।

রোগ সম্পর্কিত তথ্য
বর্তমানে আপনার কোন অসুখ আছে কিনা এবং আগে কি কি অসুখ হয়েছিল, বিশেষ করে যৌন বাহিত রোগের ব্যপারে ডাক্তার জানতে চাইবেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে মাসিক সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইবেন যেমন, নিয়মিত মাসিক হয় কিনা, দুই মাসিকের মধ্যে রক্ত যায় কিনা, শারীরিক মিলনের পর রক্ত যায় কিনা

ওষুধ সম্পর্কিত তথ্য
আপনি বর্তমানে কি কি ওষুধ খাচ্ছেন ডাক্তার সে সম্পর্কে জানতে চাইবেন। কারন কিছু কিছু ওষুধের কারনে সাময়িক বন্ধ্যত্ব হতে পারে। যদি তেমন কোন ওষুধ আপনি খেতে থাকেন তবে তা বদলে আপনাকে বিকল্প ওষুধ দেয়া হবে। ডাক্তারের পরামর্শ পত্রের বাইরে আপনি যদি অন্য কোন ওষুধ যেমন, হারবাল ওষুধ খেয়ে থাকেন, সেটাও ডাক্তারকে জানান, এ ধরনের ওষুধ থেকেও সাময়িক বন্ধ্যত্ব হতে পারে।

দৈনন্দিন অভ্যাস
দৈনন্দিন অনেক অভ্যাস আপনার সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ডাক্তার এসব সম্পর্কে জানতে চাইবেন। যেমন আপনাকে জিজ্ঞাস করা হবে

  • আপনি ধূমপান করেন কিনা
  • মদপান করেন কিনা
  • আপনি দুশ্চিন্তায় ভুগেন কিনা
  • কোন ধরনের অবৈধ ড্রাগ নেন কিনা
  • খুব চাপের মধ্যে থাকেন কিনা

আপনার যদি এমন কোন অভ্যাস থেকে থাকে, তবে ডাক্তার সে গুলো বদলাতে বলবেন। ইতিহাস নেয়া শেষ হলে, ডাক্তার আপনার শারীরিক পরীক্ষা করবেন, তারপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য পাঠাবেন।


শারীরিক পরীক্ষার সময় যা দেখা হবে

  • আপনার ওজন নেয়া হবে, আপনার উচ্চতার তুলনায় ওজন অর্থাৎ BMI ঠিক আছে কিনা তা দেখা হবে
  • আপনার প্রজননতন্ত্র পরীক্ষা করা হবে, সেখানে কোন সংক্রমন (infection) আছে কিনা, চাপ দিলে ব্যথা লাগে কিনা, কোথাও ফুলে আছে কিনা – এসব দেখা হবে

রোগের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং সাধারন পরীক্ষার মাধ্যমে যদি বন্ধ্যত্বের কারন নির্ণয় হয়ে যায়, তবে ডাক্তার আপনার ব্যবস্থাপত্র দিয়ে দিবেন। যদি না হয়, সেক্ষেত্রে আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবেন। এধরনের বিশেষজ্ঞের সহায়তা আপনি ঢাকা এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহরে পাবেন। এ পর্যায়ে যে পরীক্ষা গুলো করানো হয় সে গুলোও শুধু বড় শহরে গুলোতে সম্ভব।

মেয়েদের বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ের পরীক্ষা
হরমোন পরীক্ষাঃ ডিম্বস্ফুটনের পর ডিম্বাশয় থেকে প্রজেস্টেরন (progesterone) হরমোন নিঃসরণ হয়। রক্তে প্রজেস্টেরনের মাত্রা পরীক্ষা করে বুঝা যায় ডিম্বস্ফুটন হয়েছে কিনা। রক্তে আরেকটি হরমোনের মাত্রা দেখা হয়, তার নাম গোনাডোট্রফিনস (gonadotrophins)। এই হরমোনটি ডিম্বাশয়কে উদ্দীপ্ত করে ডিম্বস্ফুটনের জন্য, এর পরিমান কম থাকলে ঠিকমত ডিম্বস্ফুটন হয় না।

ডিম্বাশয়ের পরীক্ষাঃ ডিম্বাশয়ের পরীক্ষা দুইভাবে করা হয়। প্রথমত রক্তে নির্দিষ্ট হরমোনের মাত্রা দেখে, দ্বিতীয়ত ডিম্বাশয়ের আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে দেখা হয়, ডিম্বাশয়ের ফলিকল (follicles) গুলোর অবস্থা, কারন এই ফলিকল পুষ্ট হয়েই তার থেকে ডিম্বাণু জন্ম নেয়।

ক্ল্যামিডিয়া টেস্ট (Chlamydia test): ক্লামাইডিয়া এক ধরনের যৌনবাহিত রোগ, যার কারনে বন্ধ্যত্ব হতে পারে। জরায়ু মুখ থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয় ক্লামাইডিয়া সংক্রমন আছে কিনা। যদি থাকে তবে আপনাকে এন্টি-বায়োটিক দেয়া হবে।

হিস্টেরোসালপিঞ্জোগ্রাম (hysterosalpingogram) : এটি একটি বিশেষ ধরনের এক্সরে। প্রজননতন্ত্রের ভিতরে বিশেষ ধরনের রং ঢুকিয়ে দিয়ে এক্সরে করা হয়। এই রং জরায়ুর ভিতরের দেয়ালে, ডিম্বনালীর ভিতরে কিছু সময়ের জন্য লেগে থাকে, ফলে ঐ বিশেষ ধরনের এক্সরেতে বুঝা যায়, জরায়ুর ভিতরে কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা, ডিম্বনালীতে কোন ত্রুটি আছে কিনা বা কোন প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা।

হিস্টেরোসালপিঞ্জো–কন্ট্রাস্ট–আলট্রাসনোগ্রাফী (hysterosalpingo-contrast-ultrasonography): এটি বিশেষ ধরনের আলট্রাসনোগ্রাম। এতে জরায়ু মুখ দিয়ে বিশেষ এক ধরনের তরল ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে দেখা হয়, এই তরল দুটি ডিম্বনালী দিয়ে ঠিক মত যাচ্ছে কিনা, না কোথাও বাধা পাচ্ছে। যদি বাধা পায় তাহলে বুঝতে হবে, ডিম্বনালীতে কোথাও প্রতিবন্ধকতা আছে যার কারনে ডিম্বানু চলাচলে বাধার কারনে গর্ভধারণ হচ্ছে না।

ল্যপারোস্কপি (laparoscopy) : এটি একই সঙ্গে পরীক্ষা এবং চিকিৎসা পদ্ধতিও। এতে তলপেটে ছোট্ট একটি ছিদ্র করে তার মধ্য দিয়ে চিকন একটি নল তলপেটের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এই নলটি টেলিস্কোপের মত কাজ করে, এর মধ্য দিয়ে জরায়ু, ডিম্বনালী এবং ডিম্বাশয় ভাল করে দেখা হয়। এই অঙ্গ গুলোর কোথাও কোন ত্রুটি আছে কিনা, প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা খুজে দেখা হয়। কখনো কখনো এই পরীক্ষারা সময় জরায়ু মুখ দিয়ে বিশেষ এক ধরনের রং ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এই রং ডিম্বনালীতে যায়, যার মাধ্যমে কোথাও কোন প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা আরো ভাল ভাবে বুঝা যায়।

ডাক্তার যখন সন্দেহ করেন প্রজননতন্ত্রের কোথাও কোন সমস্যা আছে, তখন নিশ্চিত হবার জন্য ল্যপারোস্কপি করানো হয়। যেমন কারো যদি পূর্বে তলপেটে প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ হয়ে থাকে, তবে তার প্রজননতন্ত্রের কোথাও প্রতিবন্ধকতা থাকার সম্ভবনা বেশি। সেটা নিশ্চিত হবার জন্য তখন ল্যপারোস্কপি করানো হয়। বাংলাদেশে প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণের হার বেশি, সেই কারনে ডিম্বনালীতে প্রতিবন্ধকতার সংখ্যাও বেশি। ল্যপারোস্কপির মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা নির্ণয়ের পাশাপাশি, ঐ সরু নলের ভিতর দিয়ে সুক্ষ ছুরিকাঁচি পাঠিয়ে ছোট্ট অপারেশনের মাধ্যমে সেটা ঠিকও করে দেয়া হয়।


পুরুষের বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ের পরীক্ষা

শারীরিক পরীক্ষার সময় ডাক্তার যে জিনিস গুলো দেখবেন

  • অণ্ডকোষ – অণ্ডকোষের কোথাও কোন টিউমারের মতো ফোলা আছে কিনা বা অন্য কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা।
  • পুরুষাঙ্গ – পুরুষাঙ্গের আকার আকৃতি দেখবেন, অন্য কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন

পরবর্তীতে আরো যে সমস্ত পরীক্ষা করাতে পারেন

  • বীর্য পরীক্ষা – এর মাধ্যমে বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা, তাদের গঠন, তাদের চলন শক্তি, এসব দেখা হবে। এর যে কোন একটিতে সমস্যা হলে বন্ধ্যত্ব হতে পারে।
  • ক্লামাইডিয়া টেস্ট (Chlamydia test): ক্লামাইডিয়া এক ধরনের যৌনবাহিত রোগ, যার কারনে বন্ধ্যত্ব হতে পারে। মুত্রের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয় ক্লামাইডিয়া সংক্রমন আছে কিনা। যদি থাকে তবে এন্টি-বায়োটিক দেয়া হবে এবং একজন চর্ম ও যৌনরোগ বিশেশজ্ঞের কাছে পাঠান হবে।

About the author

Maya Expert Team