নারী স্বাস্থ্য ও দেহতত্ত্ব বন্ধ্যাত্ব

বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা

বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা নির্ভর করে তার কারনের উপর। বন্ধ্যত্বের কারন দূর করাই চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য। বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আপনার আর্থিক সামর্থ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারন বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার কিছু কিছু পদ্ধতি খুবই ব্যায়বহুল এবং সরকারি পর্যায়ের যে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কেন্দ্র গুলো রয়েছে, তাতে সব ধরনের বন্ধ্যত্বের সব পর্যায়ের চিকিৎসা হয় না। বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে আপনি এই বিশেষ সেবা পেতে পারেন। তবে এই প্রতিষ্ঠান গুলো মুলত ঢাকা কেন্দ্রিক। আপনি যদি দেশের অন্য স্থানে থাকেন, এই সংক্রান্ত বিশেষ কিছু পরীক্ষা ও ব্যবস্থাপনার জন্য আপনাকে ঢাকা আসতে হবে।

আপনার বন্ধ্যত্বের কারন নির্ণয়ের পর, ডাক্তার আপনাকে যে চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলবেন, সে ব্যপারে আপনাকে একটু খোঁজখবর নিতে হবে। যে বিষয় গুলো জানার চেষ্টা করবেন, তা হলো

  • কোন কোন বিশেষায়িত হাসপাতালে আপনাকে যে চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে তা হয়ে থাকে
  • তাদের সাফল্যের হার কেমন
  • খরচ কেমন, আপনার সাধ্যের মধ্যে কিনা
  • বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎ পেতে, চিকিৎসা শুরু করতে কতটা সময় অপেক্ষা করতে হবে (সাধারনত নামকরা প্রতিষ্ঠান গুলোতে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হয়ে থাকে।)


বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার প্রকার
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা ৩ প্রকারের হতে পারে

  • ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
  • অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা
  • বিশেষ সহায়তায় গর্ভধারণ


ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় যে সমস্থ ওষুধ ব্যবহার করা হয় তার তালিকা নিচে দেয়া হলো। এই ওষুধ গুলো সাধারনত মেয়েদের জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে ক্ষেত্র বিশেষে ছেলেদেরও দেয়া হয়।

ক্লমিফেন (Clomifene) – এই ওষুধ ডিম্বস্ফুটনে সহায়তা করে। যাদের একেবারেই ডিম্বস্ফুটন হয় না বা যাদের অনিয়মিত ডিম্বস্ফুটন হয়, তাদের এই ওষুধ দেয়া হয়।

টমক্সিফেন (Tamoxifen) – এটি ক্লমিফেনের বিকল্প ওষুধ, একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।

মেটফরমিন (Metformin) – যাদের পলিসিস্টিক ওভারী সিনড্রোম (Polycystic ovary syndrome) আছে, তাদেরকে এই ওষুধ দেয়া হয়।

গোনাডোট্রফিন্স (Gonadotrophins) – এই ওষুধ ডিম্বস্ফুটনের জন্য ডিম্বাশয়কে উদ্দীপ্ত করে। পুরুষের বন্ধ্যত্ব দূর করতেও অনেক সময় এটা ব্যবহার করা হয়।

গোনাডোট্রফিন রিলেজিং হরমোন এন্ড ডোপামিন এগোনিস্ট (Gonadotrophin-releasing hormone and dopamine agonists) – এটিও ডিম্বাশয়কে উদ্দীপ্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

তবে, বন্ধ্যত্বের কারন ডিম্বস্ফুটন সংক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে এই ওষুধ গুলো ব্যবহার করা উচিত না।


মেয়েদের বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় অপারেশন

ডিম্বনালীর অপারেশন
আপনার ডিম্বনালী যদি বন্ধ হয়ে যেয়ে থাকে বা তার মধ্যে স্কার (scar) হয়ে থাকে তবে অপারেশনের মাধ্যমে তা ঠিক করতে হবে। মুলত প্রজননতন্ত্রের সংক্রমনের কারনে এমনটা হয়ে থাকে। অপারেশনের মাধ্যমে ডিম্বনালীর স্কার অপসারন করা হয় যাতে ডিম্বাণু চলাচলে কোন বাধা না থাকে।

এই অপারেশনের সাফল্য নির্ভর করে, ডিম্বনালী কতটা ক্ষতিগ্রস্থ ছিল তার উপর। একটি গবেষণা বলে, যাদের ডিম্বনালী কম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অপারেশনের পর তাদের মধ্যে শতকরা ৬৯ জন গর্ভধারণ করে জীবিত সন্তান জন্ম দিতে পারে। অন্য পরিসংখান বলে এর হার ২০ থেকে ৫০ ভাগ।

ডিম্বনালীর অপারেশনের সবচেয়ে বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ (ectopic pregnancy)। ডিম্বনালীর অপারেশনের পর, শতকরা ৮ থেকে ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে এমনটা হতে পারে।

ল্যপারোস্কপিক অপারেশনের মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিয়সিস (endometriosis) এর চিকিৎসা করা হয়। জরায়ুর দেয়ালের ভিতরের স্তরটিকে বলা হয় এন্ডোমেট্রিয়াম। কখনো কখনো এই এন্ডোমেট্রিয়াম জরায়ুর বাইরে অন্যান্য জায়গায় তৈরি হতে পারে, এটাকেই বলা হয় এন্ডোমেট্রিয়সিস। অপারেশনের মাধ্যমে এই জায়গা গুলো থেকে এন্ডোমেট্রিয়াম অপসারণ করা হয়। এছাড়া, ল্যপারোস্কপিক অপারেশনের মাধ্যমে সিস্ট (cyst) এবং ফাইব্রয়েড (fibroids) এর চিকিৎসাও করা হয়।

পলিসিস্টিক ওভারী সিনড্রোম (Polycystic ovary syndrome) এর ক্ষেত্রে ওষুধে যদি কাজ না হয়, তখন ল্যপারোস্কপিক অপারেশনের করতে হয়। এর মাধ্যমে লেসার (laser) দিয়ে সিস্টে পরিনত হওয়া ফলিকল গুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।


ছেলেদের বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় অপারেশন
এপিডিডাইমিস (epididymis) হলো পুরুষের অণ্ডকোষের ভিতর চক্রাকারে থাকা এক ধরনের নল, যার মধ্যে শুক্রানু তৈরি হয়ে জমা থাকে এবং ভাস ডিফারেন্সে যেয়ে বীর্যের সঙ্গে মিশে। এই এপিডিডাইমিসের মধ্যে কোন কারনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে শুক্রানু আটকা পরে যায়, বীর্যপাতের সাথে বের হয়ে আসতে পারে না। এই কারনে বন্ধ্যত্ব হলে, অপারেশনের মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়।

বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে অণ্ডকোষ থেকে অপারেশনের মাধ্যমে শুক্রানু বের করে আনা হয়। যেমন,

  • সংক্রমন বা আঘাত থেকে এপিডিডাইমিসে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে এবং অপারেশনের মাধ্যমে তা দূর করা সম্ভব না হলে
  • জন্মগত ভাবে এপেডিডাইমিসে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলে বা এপিডিডাইমিস না থাকলে।

এক্ষেত্রে যা করা হয়, তা হলো অণ্ডকোষের চামড়ায় ছোট্ট করে কেটে অণ্ডকোষের কিছু কোষ বায়পসি (biopsy) করে নিয়ে আসা হয়।

দুটি অপারেশনই ছোট, খুব বেশি সময় লাগে না এবং স্থানীয় ভাবে অবশ করে করা হয়। অণ্ডকোষের যে কোষ গুলো সংগ্রহ করা হয়, তার মধ্যে যদি শুক্রানু থাকে, তবে তা বিশেষ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন সংরক্ষন করা যায়। তা দিয়ে একাধিক বার কৃত্রিম ভাবে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়। এই শুক্রানু সংরক্ষনের ব্যবস্থা কেবল মাত্র বিশেষায়িত কিছু হাসপাতালেই আছে।

বিশেষ সহায়তায় গর্ভধারণ (Assisted conception)

কৃত্রিম ভাবে জরায়ুর ভিতরে শুক্রানু ঢুকিয়ে দেয়া (Intrauterine insemination)
এই পদ্ধতিতে যা করা হয় সেটা হলো, প্রথমে শুক্রানু সংগ্রহ করে বিশেষ এক ধরনের তরলে তা ধোয়া হয়। তার মধ্য থেকে বেছে বেছে সবচেয়ে সুস্থ্য, সবল, এবং যাদের চলন ক্ষমতা ভাল এমন কিছু শুক্রানু পৃথক করা হয়।

এই নির্বাচিত শুক্রানু গুলোকে সরু নলের মাধ্যমে জরায়ু মুখ দিয়ে জরায়ুর ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। মাসিকের হিসাব অনুযায়ী যখন ডিমস্ফুটন হবার কথা, তখনই এটা করা হয়। একই সঙ্গে ডিম্বাশয়কে উদ্দীপ্ত করে ডিমস্ফুটন করানোর যে ওষুধ তাও খাওয়ানো হয়, যাতে ডিম্বানু শুক্রানুর নিষিক্ত হবার সম্ভবনা বাড়ে। এই প্রক্রিয়ায় কোন ব্যথাই হয় না। সরু নলটি জরায়ু মুখ দিয়ে ঢুকানোর সময় এবং প্রক্রিয়াটি শেষ হবার পর, মাসিকের সময় তলপেটে যে রকম সামান্য ব্যথা হয় সেরকম হতে পারে। কখন এই পদ্ধতিতে চেষ্টা করা হয়

  • বীর্যে শুক্রানুর সংখা কম থাকলে, বা শুক্রানুর চলন ক্ষমতায় সমস্যা থাকলে
  • পুরুষের যৌন ক্ষমতার সমস্যা থাকলে যেমন, পুরুষাঙ্গ উত্থান রহিত (erectile dysfunction) হলে, যৌনমিলনের সময় পুরুষাঙ্গ যোনিতে প্রবেশের আগেই বীর্যপাত হয়ে গেলে (premature ejeculation)
  • মেয়েদের ক্ষেত্রে এন্ডোমেট্রিয়সিস (endometriosis) থাকলে
  • যখন বন্ধ্যত্বের কোন কারন খুজে পাওয়া যায় না

সফলতার হার
যদি শুক্রানু সুস্থ থাকে এবং ডিম্বনালীতে প্রতিবন্ধকতা না থাকে, তবে ৩৫ বৎসরের কম বয়সীদের মধ্যে প্রতিবার চেষ্টায় সফলতার সম্ভবনা শতকরা ১৫ ভাগ। এক মাসিক চক্রে একবারই চেষ্টা করা যায়। এভাবে সর্বোচ্চ ৬ বার চেষ্টা করা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।


দেহের বাইরে নিষিক্ত করনের পর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন (
in-vitro fertilisation)
এই প্রক্রিয়ায় দেহের বাইরে ডিম্বাণু এবং শুক্রানুর নিষিক্তকরন করা হয়। ওষুধের মাধ্যমে বেশি পরিমান ডিম্বস্ফুটন করানো হয়, তারপর ডিম্বাশয় থেকে সেই ডিম্বানু সংগ্রহ করা হয়। ল্যবোরেটোরিতে ডিম্বানু শুক্রানুর মিলন ঘটানো হয় এবং নিষিক্ত ডিম্বানুটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় জরায়ুতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়।

কোথায় হয় এবং সফলতার হার কত

শুধুমাত্র বিশেষ কিছু হাসপাতালে এই ব্যবস্থা আছে। যেমন, Infertility Care and Research Center (ICRC), Dhaka, CARe Hospital, Iqbal Road, Mohammadpur, Dhaka, Apollo Hospital, Dhaka, Square Hospital, Dhaka, Lab Aid Hospital Dhaka। ৩৫ বৎসরের কম বয়সীদের মধ্যে প্রতিবার চেষ্টায় এর সফলতার সম্ভবনা শতকরা ৩২ ভাগ।

About the author

Maya Expert Team