টিকা বাল্যরোগ চিকিৎসা শিশুর যত্ন

শিশুর টিকা নিয়ে প্রচলিত প্রশ্নসমূহ

শিশুকে টিকা প্রদানের পূর্বে যেসব প্রশ্নের উত্তর আপনি জানতে চান তা নিম্নে বর্ণিত হলোঃ

কেন টিকা প্রদান প্রয়োজন?

শরীরের ইমিউন সিস্টেম হলো রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইমিউন সিস্টেম থেকে অ্যান্টিবডি নামক এক ধরণের পদার্থ উৎপন্ন হয়, যা সংক্রমণ ও রোগকে দমন করে রাখে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ইমিউন সিস্টেমের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। যেসব রোগ শিশুর স্বাস্থ্যহানি বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে, টিকা গ্রহণ সেসব রোগের বিপক্ষে শিশুর ইমিউন সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করে তোলে।

টিকা কীভাবে কাজ করে থাকে?

রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস অথবা সেসব ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস কর্তৃক সৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থের একটি ক্ষুদ্র অংশ টিকায় উপস্থিত থাকে। এই প্রক্রিয়াজাত বিশেষ ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস অথবা তাদের দ্বারা সৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থেরর ক্ষতিকর উপাদান গুলো বিশেষ প্রক্রিয়ায় দূর করে ফেলা হয়। তারপর টিকা আকারে শরীরে প্রবেশ করানো হয়। শরীরের ইমিউন সিস্টেমের কাছে যখন এইগুলো প্রকাশিত হয় তখন ইমিউন সিস্টেম এইসব ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি ও স্মৃতি কোষ তৈরি করতে শুরু করে।

প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে এমন কোনো জীবাণু শিশুর সংস্পর্শে আসলে, স্মৃতি কোষ সেটা চিনে নিবে এবং সেই সংক্রমণ দমনের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

 

উদাহরণরূপে যদি পোলিওকে ধরি, বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত হয়ে পড়েছে। তাহলে তারপরও কেন এই রোগ প্রতিরোধী টিকা এখনো প্রদান করা হয়?

উচ্চ টিকা প্রদানের হারের মাধ্যমে এই রোগটি থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছে। একটি পুরো সমাজ বা দেশকে এই টিকা সংক্রমণমুক্ত করে তোলে। বিশ্বব্যাপী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে যার মধ্যে অর্ধেকই থাকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।

টিকা প্রদান শুধুমাত্র আপনার শিশুকে সুরক্ষিত করে না, এটি একই সাথে আপনার পরিবার এবং পুরো সমাজকে নিরাপদ করে তোলে। বিশেষ করে সেইসব শিশুকে সুরক্ষিত করে যারা অসুস্থ বা স্বাস্থ্যগত কারণে টিকা গ্রহণ করতে পারে না।

 

টিকাগুলো নিরাপদ কী না তা কীভাবে বুঝতে পারব?

লাইসেন্স (অনুমতি পত্র) প্রদানের পূর্বে টিকাসহ সকল ধরণের ঔষধের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা ঠিক আছে কী না তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। লাইসেন্স প্রদানের পরও টিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

কোনো বিরল পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে পরবর্তীতে তার কারণ নিরুপণ করা হয়। সকল ধরণের ঔষধ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে কিন্তু এগুলোর মধ্যে টিকা সবচেয়ে নিরাপদ।

 

টিকা গ্রহণে কী শিশু চুপচাপ থাকবে?

টিকা গ্রহণের পর কিছুক্ষন শিশু কাঁদতে পারে। তবে আদর করলে, কোলে নিলে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।

টিকা গ্রহণের কী কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া আছে?

যেভাবে সবাই মনে করে সেরকম  পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সাধারণত হয় না আর হলেও সেটি হালকা পর্যায়ে থাকে। কোনো কোনো শিশুর ইনজেকশন গ্রহণের জায়গা ফুলে লাল হয়ে যেতে পারে কিন্তু এটি দ্রুত সেরে যায়। আবার অনেকে বিরক্ত বা অসুস্থ বোধ করতে পারে অথবা হালকা জ্বর অনুভব করতে পারে।

 

টিকা প্রদানের পর শিশুকে সাঁতারে নিয়ে যাওয়া কী নিরাপদ?

হ্যাঁ, টিকা প্রদানের পরবর্তী ও পূর্ববর্তী যেকোন সময়ে শিশুকে সাঁতারে নিয়ে যেতে পারেন।

অ্যালার্জি আক্রান্ত শিশুদের জন্য টিকা গ্রহণ কী নিরাপদ?

হ্যাঁ, অ্যাজমা, একজিমা, হে ফিভারে আক্রান্ত ও খাদ্য, ঔষধের অ্যালার্জিতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য টিকা গ্রহণ নিরাপদ। এসম্পর্কে যেকোন তথ্যের জন্য ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

কোনো কোনো শিশুর কী টিকার কারনে অ্যালার্জি হতে পারে?

টিকা গ্রহণের পর অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বিরল। এক্ষেত্রে সাধারণত শরীরের কিছু অংশে অথবা সারা শরীরে র‍্যাশ ও চুলকানি দেখা দেয়। এ প্রতিক্রিয়া টিকা উৎপাদনে ব্যবহৃত কোনো উপাদান বা কাচাঁমালের কারণে হতে পারে, টিকায় উপস্থিত জীবানু বা তাদের শরীরে তৈরি হওয়া রাসায়নিক পদার্থের কারণে হয়না। কর্তব্যরত নার্স যিনি টিকা দেন তিনি এর চিকিৎসা পদ্ধতি বলে দিবেন।

আরো বিরল ঘটনায় দেখা যায় যে শিশুর শরীরে টিকা গ্রহণের কয়েক মুহূর্ত পরেই অ্যানাফিল্যাকটিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যা শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে এবং কিছু ক্ষেত্রে অজ্ঞানও হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রদানকৃত ১ লাখ টিকার মধ্যে মাত্র একটি ক্ষেত্রে অ্যানাফিল্যাকটিক প্রতিক্রিয়া হওয়ার প্রমাণ মিলে। যেসব ব্যক্তি টিকা প্রদান করে থাকেন, অ্যানাফিল্যাকটিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কী করা উচিত সে সম্পর্কে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যদি দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা যায়, তবে শিশু সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করবে।

 

শিশুকে টিকা প্রদান না করানোর পিছনে কী কোনো যুক্তি আছে?

 

শিশুকে টিকা প্রদান না করানোর খুব অল্প কারণ আছে। একটি নির্দিষ্ট টিকা বা টিকায় উপস্থিত উপাদানের কারণে পূর্বে ডোজ গ্রহণে কোনো শিশুর মধ্যে নিশ্চিত অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা গেলে তাকে ঐ টিকা আর প্রদান করা যাবে না।

সাধারণত দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন শিশুদেরকে যে সমস্থ টিকায় জীবন্ত জীবাণু ব্যবহার করা হয় সে টিকা গুলো প্রদান করা উচিত না। স্বাস্থ্যগত জটিলতা, যেমন অঙ্গ প্রতিস্থাপিত হয়েছে বা ক্যান্সারে আক্রান্ত এমন শিশু কিংবা ইমিউন সিস্টেমের ক্ষতি করে এমন স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যেমন গুরুতর প্রাথমিক ইমিউনোডিফিসিয়েন্সি-তে আক্রান্ত শিশুদের টিকা প্রদান করা যাবে না। যদি আপনার শিশুর অবস্থা এমন হয়ে থাকে, তাহলে টিকা গ্রহণের পূর্বে সবসময় কর্তব্যরত নার্স বা ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। এমএমআর কিংবা বিসিজির টীকা যাতে দুর্বল, জীবন্ত ভাইরাস ব্যবহার করা হয়- এগুলো দেয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

    

টিকা প্রদানের দিন যদি শিশু অসুস্থ থাকে তাহলে কী করা উচিত?

যদি শিশু জ্বর ব্যতীত অন্যান্য সাধারণ অসুখ, যেমন সর্দিতে আক্রান্ত থাকে, তাহলে তাকে সাধারণভাবেই টিকা প্রদান করা উচিত। যদি শিশুর শরীরে জ্বর থাকে, তাহলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত টিকা প্রদানে বিরত থাকুন। টিকা প্রদানের জন্য পরবর্তী তারিখ ঠিক করে রাখুন যাতে টিকা প্রদানে বিরত থাকার সময় ১ সপ্তাহ অতিক্রান্ত না হয়ে যায়।

শিশুর পরবর্তী টিকা প্রদান এখনো বাকি আছে তা কীভাবে বুঝব?

জন্ম পরবর্তী সময়েই শিশুকে বিসিজি টিকা প্রদান করা হয়। যদি না দেয়া হয়, তাহলে পরবর্তী টিকা ৬ সপ্তাহ বয়স থেকে প্রদান করতে হবে। পরবর্তী কোন কোন টিকা প্রদান বাকি আছে সে সম্পর্কে আপনার ডাক্তার আপনাকে বলবেন এবং আপনাকে টিকা প্রদানের সময়সূচী সম্বলিত একটি কার্ড দিবেন, যেখানে বাকি টিকা ও সেগুলো কখন প্রদান করতে হবে তা চিহ্নিত করা থাকবে।

টিকা প্রদানের তারিখে যদি যেতে না পারি তাহলে কী করা উচিৎ?

যদি টিকা প্রদানের কোনো তারিখে টিকা প্রদান করতে না পারেন বা টিকা প্রদানে দেরি হয়ে যায়, তাহলে প্রদানের জন্য পরবর্তী তারিখ ঠিক করে নিন। পুনরায় প্রথম থেকে শুরু না করে টিকা প্রদানের সময় যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু করুন।

অকালে জন্ম নেয়া শিশুকে কী টিকা প্রদানের সাধারণ সময়সূচী অনুসারে টিকা প্রদান করব না কী শিশুর আরো বয়স বৃদ্ধির পর টিকা প্রদান করব?

অকালে জন্ম নেয়া শিশু বিভিন্ন রোগে সংক্রামিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। তাই অসময়ে জন্ম গ্রহণ করা সত্ত্বেও তাদেরকে সময়মত টিকা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরী। এই বয়সে ছোট বাচ্চাকে টিকা প্রদান যথাসময়ের পূর্বে হচ্ছে বলে মনে হতে পারে, তবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে সময়ের পূর্বে জন্মগ্রহণকারী শিশুকে টিকা প্রদানের জন্য তখনি সবচেয়ে ভালো সময়। বয়স বৃদ্ধির অপেক্ষা করে টিকা প্রদানে বিরত থাকলে শিশুর শরীরে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

About the author

Maya Expert Team