বাল্যরোগ চিকিৎসা শিশুর যত্ন শিশুর যত্ন

বাচ্চাকে হাসিখুশি রাখতে নিয়মানুবর্তিতার গুরুত্ব

যারা প্রথমবারের মত সন্তান লাভ করেন তারা বাচ্চার যত্ন নিতে গিয়ে মাঝেমধ্যে হিমশিম খেয়ে যেতে পারেন। বাচ্চার কখন খাওয়া দরকার আর কখন ঘুমানো দরকার তা কিভাবে বোঝা যায়? এসবের জন্য একটা রুটিন বানিয়ে নিলে তা বাবা-মা ও সন্তান সবারই খুব উপকারে আসবে।

শিশুরা কখন সকাল আর কখন সন্ধ্যে তা আলাদা করতে পারে না। একটা রুটিন মেনে চললে দিন ও রাতের পার্থক্য (circadian rhythm) নির্ণয় করার শরীরবৃত্তিও ছন্দ (biological clock) সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশুদের জীবন নতুন নতুন জিনিসের অভিজ্ঞতায় ভর্তি থাকে, তবে তারা নিস্তরঙ্গ জীবন যাপন, যেখানে প্রতিদিনের কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের পুনরাবৃত্তি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত থাকা যায়, তা পছন্দ করে। একটা রুটিন মেনে চললে শিশুরা শৈশবের বিক্ষিপ্ত অভিজ্ঞতার ভেতরেও একধরনের নিরাপত্তাবোধ নিয়ে বড় হতে পারে। হাসিখুশি শিশুই স্বাস্থ্যবান শিশু।

শিশুদের জন্য করা রুটিন একটা কাঠামো মাত্র, তাও কোন নির্দিষ্ট বই দেখে তৈরি করা নয়। প্রথম প্রথম এতে সবকিছু ঘড়ি ধরে করার চাইতে কেবল দৈনন্দিন কাজকর্মের একটা অনুক্রম (খাওয়া, খেলা, ঘুম, আবার খাওয়া, খেলা, ঘুম,) অনুযায়ী করার উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়। এটি হয়ত সবসময় একভাবে কাজ করবে না তবে এটি মেনে চললে শিশুদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট একজনের সাথে একই ধরনের কাজকর্ম করার অভ্যেস তৈরি হয়। বিভিন্ন কাজকর্মের এই দৈনিক পুনরাবৃত্তি শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে থাকার সময় (যেমনঃ মা চাকরিতে বা কাজে ফিরে গেলে) অথবা শিশুর দেখাশোনার ভার নতুন কারও উপর পড়লে তখন শিশুদেরকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। একটা রুটিন থাকলে বাবা-মায়েরা দিনে কী কী করবেন তার একটা সাধারন ধারনা বা নক্সা নিয়ে দিনটি শুরু করতে পারেন, এবং এটা কোন রকম পরিকল্পনা ছাড়া দিন শুরু করার চাইতে ভাল।

শিশুর জন্য একটা হাসিখুশি দিনের রুটিন বানানোর কোন ধরা-বাঁধা নিয়ম নেই। একেক পরিবার একেক রকমের হয়, তাই একই ধরনের রুটিন সবার জন্য উপযুক্ত নয়। সবচেয়ে ভাল রুটিন হচ্ছে সেটি যেটিকে পরিবারের ও শিশুর চাহিদা অনুযায়ী সাময়িকভাবে পরিবর্তন করা যায়।

ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখবেন যে জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ শিশুর খাওয়া, খেলা এবং ঘুমানোর একটা ঢিলেঢালা প্যাটার্ন আছে। উদাহরনসরূপঃ আপনি হয়ত খেয়াল করে দেখবেন যে নবজাতক শিশু খাওয়ার পর ৩০-৪০ মিনিট খেলা করে তারপর ঘুমাতে যায়। কখনো কখনো খাওয়া-খেলা-ঘুমের এই পুরো চক্রটি সম্পন্ন হতে দু ঘণ্টা কখনো তিন-চার ঘণ্টা লাগতে পারে। এইভাবেই দৈনিক কাজকর্মের রুটিনের একটা কাঠামো গড়ে ওঠে। শিশুকে নিয়মিত এই চক্রের মধ্যে বড় করতে থাকলে তাদেরকে একটা রুটিনের মধ্যে আনা সহজ হয়। আস্তে আস্তে এই রুটিনের মধ্যে তেল মালিশ করা, বাইরে হাঁটতে নিয়ে যাওয়া এবং গোসল করানোর মত অন্যান্য কাজগুলো নিয়ে আসলে তা শিশুর জীবনে ধিরে ধিরে একধরনের স্থিতিশীলতা নিয়ে আসে।

কোন শিশু তাদের দিনের রুটিনের ব্যতিক্রম পছন্দ করে না, আবার অনেক শিশুর এতে কোন সমস্যা হয়না। রুটিন তৈরির সময় শিশুর মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা কতটুকু তা মাথায় রাখতে হবে। যেসব বাচ্চার রুটিনের ব্যতিক্রম হলে সমস্যা হয় তারা এরকম হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।

বাবা-মা হিসেবে পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারাটা কাজ চালানোর মত একটা রুটিন তৈরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রুটিনের এদিক ওদিক হতে পারে। বিয়ে বা জন্মদিনের অনুষ্ঠান এগুলো চলতেই থাকবে। বাচ্চারাও বদলাবে- তাদের অসুখ হবে, দাঁত উঠবে, হাঁটতে শিখবে, তারপর দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাবে। হয়ত দেখা যাবে আপনি যখন নির্দিষ্ট রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তখন সে কিছু জিনিস নিজের মত করে করতে চাইছে। জন্মের পর প্রথম কয়েক বছর শিশুদের অনেক রকম পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তাই যদি দেখেন খেলার সময় আপনার শিশু ক্লান্ত হয়ে আছে তাহলে, তাকে শুইয়ে দিন এবং আপনাকে রুটিনে কিছু পরিবর্তন আনুন। ১২ থেকে ১৮ মাসের শিশুর সারাদিনে কি কি হবে সে বিষয়ে বেশ ভাল ধারনা হয়ে যায়।

একটি দিন কখনই আরেকটি দিনের সাথে মিলবে না। ভাল রুটিন হচ্ছে যেগুলো ক্রমশ ধীরে ধীরে বদলানো যায় এবং যেগুলোতে মাঝেমধ্যে দম নেয়ার অবকাশ পাওয়া যায়। রুটিনের কারনে কখনই বাবা-মায়ের কাজের চাপ বা পরিশ্রম কমার পরিবর্তে বেড়ে যাওয়া উচিত নয়।

By Lail Hossain

As published in the Daily Star on 20/08/2013

About the author

Maya Expert Team