বাল্যরোগ চিকিৎসা বোতলে খাওয়ানো শিশুর যত্ন

ফর্মুলা মিল্ক তৈরির পদ্ধতি

ফর্মুলা মিল্কে থাকা ব্যাকটেরিয়া

বায়ু নিরোধক প্যাকেট বা টিনের কৌটায় থাকার পরও ফর্মুলা মিল্কে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যেমন, ক্রনোব্যাক্টের সাকাজাকি (Cronobacter sakazakii), যেটিকে আগে এন্টারোব্যাক্টের সাকাজাকি (Enterobacter sakazakii) বলা হত, এবং কখনো কখনো স্যালমোনেলা (Salmonella), থাকতে পারে। যদিও এগুলো বিরল তবু এদের সংক্রমনে শিশুর জীবন বিপন্ন হতে পারে।

সংক্রমনের ঝুঁকি কমাতে প্রতিবার খাওয়ানোর আগে ৭০º সেলসিয়াস বা তার অধিক তাপমাত্রায় ফুটানো পানি ব্যবহার করে বাচ্চার খাবার তৈরি করুন। এই তাপমাত্রায় পানি যেকোনো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলবে।

আপনার শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিবার খাওয়ানোর আগে দুধ তৈরি করুন।

বাচ্চার খাবার তৈরির জন্য সবসময় ৭০º সেলসিয়াস বা তার অধিক তাপমাত্রায় ফুটানো পানি ব্যবহার করুন এবং বাচ্চাকে খাওয়ানোর আগে সেটি ঠাণ্ডা করে নিন।

ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে। এমনকি বাচ্চার খাবার ফ্রিজে রাখলেও, ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে এবং ধীরে হলেও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। সময় বাড়ার সাথে সাথে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, তাই যখন আপনার বাচ্চা খেতে চাইবে শুধু তখনই তার খাবার তৈরি করুন।

প্রস্তুতি ও পরিচ্ছন্নতা

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের মত শক্তিশালী নয়। এর মানে হচ্ছে বাচ্চারা খুব দ্রুত অসুখ বা সংক্রমনে আক্রান্ত হতে পারে। এ কারনে বাচ্চার খাবার তৈরির সময় পরিচ্ছন্ন থাকা খুবই জরুরী।

বাচ্চাকে খাওয়ানোর কাজে ব্যবহৃত সব জিনিস অবশ্যই জীবাণুমুক্ত করে নিবেন। খাওয়ানোর আগে ফীডারের বোতল, নিপল, এবং অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস জীবাণুমুক্ত করে নিলে আপনার বাচ্চার অসুস্থ হওয়া বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কমে যায়।

বাচ্চার খাবার তৈরির জন্য কলের পানি ফুটিয়ে নিয়ে ব্যবহার করা সবচেয়ে ভাল। আগে থেকে ফুটিয়ে রাখা পানি ব্যবহার করবেন না।

বোতলজাত পানি

বাচ্চার খাবার তৈরির জন্য বোতলজাত পানি ব্যবহার না করাই ভাল, কারন এটি সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত (sterile) নয় এবং এতে অতিরিক্ত পরিমানে লবন (সোডিয়াম) অথবা সালফেট (sulphate) থাকতে পারে। যদি বোতলজাত পানি ব্যবহার করতেই হয় তাহলে বোতলের গায়ের লেবেল দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন যে প্রতি লিটার পানিতে সোডিয়াম (Na হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়)-এর মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম, এবং সালফেট (SO বা SO4 হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়)-এর মাত্রা ২৫০ মিলিগ্রামের কম । যেহেতু বোতলজাত পানি সম্পূর্ণরূপে জীবাণুমুক্ত হয় না, তাই খাবারে ব্যবহারের আগে এটি ফুটিয়ে নিতে হবে।

ধাপে ধাপে ফর্মুলা মিল্ক তৈরির প্রক্রিয়া

১ম ধাপঃ একটি কেটলি কমপক্ষে এক লিটার কলের পানি দিয়ে ভর্তি করুন (আগে ফুটিয়ে রাখা পানি ব্যবহার করবেন না)

২য় ধাপঃ পানি ফোটান, তারপর সেটি ঠাণ্ডা করার জন্য রেখে দিন, কিন্তু ৩০ মিনিটের বেশি রাখবেন না। খেয়াল রাখবেন পানির তাপমাত্রা যেন ৭০ º সেলসিয়াসের চাইতে কমে না যায়

৩য় ধাপঃ যেখানে রেখে দুধ বানাবেন সেই জায়গাটি পরিস্কার ও জীবাণুমুক্ত করুন

৪র্থ ধাপঃ আপনার হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা খুবই জরুরী

৫ম ধাপঃ যদি ঠাণ্ডা পানিতে জীবাণু ধ্বংসকারী পদার্থ ব্যবহার করে ফীডার পরিস্কার করে থাকেন, তাহলে বোতল বা নিপলের গায়ে লেগে থাকা জীবাণু ধ্বংসকারী পদার্থ ভাল করে পরিষ্কার করে, বোতল ও নিপলটি কেতলির ফোটানো পানি দিয়ে (কলের পানিতে নয়) ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন

৬ষ্ঠ ধাপঃ ফীডারের বোতলটি পরিস্কার করে রাখা স্থানটিতে রাখুন

৭ম ধাপঃ ফীডারের নিপল ও ঢাকনা পানি গরমে ব্যবহৃত উলটিয়ে রাখা ঢাকনার উপর রাখুন। কাজের স্থানে রাখবেন না

৮ম ধাপঃ ফর্মুলা মিল্কের প্যাকেটের গায়ে লেখা নির্দেশনা মেনে চলুন এবং সঠিক পরিমানে পানি ফীডারের বোতলে ঢালুন। পানির পরিমান ঠিক আছে কিনা তা ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নিন। সবসময় প্রথমে বোতলে গরম পানি নিবেন, তারপর তাতে ফর্মুলা মিল্ক মেশাবেন

৯ম ধাপঃ দুধ তোলার চামচ বা স্কুপ (scoop)-এ ফর্মুলা মিল্ক নিন এবং একটি পরিস্কার, শুকনো ছুরি অথবা দুধের কৌটার ভেতরে দেয়া লেভেলার (leveller) ব্যবহার করে চামচের উপরিতলের গুঁড়ো দুধ ফেলে দিয়ে সমান করে নিন। বিভিন্ন ফর্মুলা মিল্ক প্রস্তুতকারক বিভিন্ন ধরনের স্কুপ দিয়ে থাকে। যে স্কুপটি ব্যবহার করছেন সেটি যে ফর্মুলা মিল্ক ব্যবহার করছেন তার প্যাকেটের সাথে এসেছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিন

১০ম ধাপঃ ফীডারের নিপলটির কিনারায় ধরে সেটি বোতলের ওপর রাখুন, তারপর সেটি আটকানর জন্য ব্যবহৃত রিংটি প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বোতলের সাথে লাগিয়ে দিন

১১শ ধাপঃ ঢাকনা দিয়ে ফীডারের নিপলটি ঢেকে দিন এবং দুধের গুঁড়ো ভালোভাবে না মেশা পর্যন্ত ঝাঁকাতে থাকুন

১২শ ধাপঃ বাচ্চাকে খাওয়ানোর আগে মনে করে ফীডারের বোতলটির নিচের অংশ কলের নিচে ঠাণ্ডা পানিতে ধরে রেখে ঠাণ্ডা করে নিন। খেয়াল রাখুন যাতে এসময় পানি ফীডারের নিপলটি ঢেকে রাখা কভারের গায়ে না লাগে

১৩শ ধাপঃ বাচ্চার মুখে দেয়ার আগে তৈরি দুধের তাপমাত্রা আপনার হাতের তালুর নিচে কব্জির সাথে লাগিয়ে পরিক্ষা করুন। ফীডারের তাপমাত্রা গায়ের তাপমাত্রার মত হওয়া উচিত, অর্থাৎ এটি আপনার হালকা উষ্ণ বা শীতল মনে হওয়া উচিত কিন্তু কখনই বেশি গরম নয়

১৪শ ধাপঃ খাওয়ানো শেষ হয়ে যাবার পরে তৈরি দুধ বাকি থেকে গেলে ফেলে দিন

কী করবেন এবং কী করবেন না

যেহেতু বিভিন্ন কোম্পানির ফর্মুলা মিল্ক বানানোর জন্য গুঁড়ো দুধ ও পানি বিভিন্ন পরিমানে মেশানোর নির্দেশনা দেয়া থাকে, তাই সে সব নির্দেশনা যত্নসহকারে মেনে চলা উচিতত

ফর্মুলা মিল্ক তৈরির সময় বাড়তি গুঁড়োদুধ মেশাবেন না। দুধ বানাবার সময় বাড়তি দুধ মেশালে আপনার শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে এবং পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। কম মেশালে তা আবার আপনার শিশুর পুষ্টির চাহিদা পুরনে ব্যর্থ হতে পারে

ফর্মুলা মিল্কের সাথে সিরিয়াল (cereal) বা চিনি মেশাবেন না

বাচ্চার জন্য তৈরি ফর্মুলা মিল্ক কখনোই মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করবেন না, এতে তৈরি খাবারটি অসমানভাবে গরম হয়ে আপনার বাচ্চার মুখ পুড়িয়ে দিতে পারে

আরও তথ্য জানতে

বাচ্চাকে ফীডারে দুধ খাওয়ানো এবং এর সাধারন সমস্যাগুলোর সমাধান বিষয়ে আরও জানুন।

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment