এজমা বাল্যরোগ চিকিৎসা শিশুর যত্ন শৈশবকালীন অসুস্থতা

শিশুর হাঁপানী রোগ নির্ণয়

Written by Maya Expert Team

হাঁপানী হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী অসুখ যার কারনে কাশি হয়, শ্বাস ফেলার সময় সাঁ সাঁ শব্দ এবং শ্বাসকষ্ট হয়। এর তীব্রতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসুখটি নিয়ন্ত্রন যোগ্য।

হাঁপানী কি?

হাঁপানী হলো এমন একটি অসুখ যা আমাদের শ্বাসনালীকে আক্রান্ত করে। শ্বাসনালী বাহির থেকে আমাদের ফুসফুসে বাতাস পৌছে দেয় আবার ফুসফুস থেকে দুষিত বাতাস বের করে দেয়। যাদের হাঁপানী থাকে তাদের শ্বাসনালী অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী স্পর্শকাতর থাকে।

শিশুরা যখন এমন কিছুর সংস্পর্শে আসে, যা তাদের ফুসফুসকে উত্যাক্ত (Irritate) করে, তখন তাদের শ্বাসনালীর ভেতরের আবরনে প্রদাহ (Inflamation) তৈরী হয়, যার ফলে ভেতরের আবরনটি ফুলে উঠে, শ্বাসনালীতে চক্রাকারে যে মাংসপেশী থাকে তা সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং একই সংগে শ্বাসনালীর ভিতরে এক ধরনের আঠাল তরলের (Mucus) নিঃস্বরন ঘটে। সব মিলিয়ে শ্বাসনালীর ভিতর বাতাস চলাচলের যে জায়গাটুকু থাকে তা সংকুচিত হয়ে যায়। যার পরিনতিতে শ্বাসের সমস্যা তৈরী হয় এবং নিন্মলিখিত সমস্য দেখা দেয়।

শ্বাস ফেলার সময় সাঁ সাঁ শব্দ

কাশি

বুকভরে শ্বাস নিতে না পারা

বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করা।

কাদের হাঁপানী হবার ঝুকি বেশী?

যাদের মা অথবা বাবার বংশে আন্যান্যদের হাঁপানী ছিল বা আছে, অথবা আলার্জি জনিত অসুখ যেমন একজিমা, হে-ফিভার অথবা খাবার জনিত আ্যালার্জির ইতিহাস আছে

যে সমস্ত শিশুদের কিছু কিছু খাবারে আ্যলার্জি আছে অথবা একজিমা বা হে-ফিভার আছে

যে সমস্ত শিশুদের ভাইরাস জনিত ফুসফুসেরর সংক্রমন (Bronchitis) হয়েছে

যে সমস্ত শিশুদের সামনে ধুমপান করা হয়

যে সমস্ত শিশু মেয়াদ পূর্ণ হবার পূর্বে (Premature) জন্ম গ্রহণ করেছে

যে সমস্ত শিশুর ওজন জন্মের সময় ২ কেজির কম ছিল

কখন হাঁপানী শুরু হয়?

ফুসফুসে অথবা শ্বাসনালীতে সংক্রমন (Infection) হলে, সাধারনত ঠান্ডাজনিত অথবা ভাইরাসজনিত কারনে এমনটা হয়ে থাকে

যে সমস্ত জিনিস অ্যালার্জি তৈরি করে তাদের সংস্পর্শে আসলে যেমন, ধুলা, ফুলের রেনু, পাখির পালক অথবা পশুর লোম

বাতাসে মিশে থাকে এমন কিছু জিনিস যা হাঁপানির রোগীর ফুসফুসকে উত্যাক্ত করে যেমন, সিগারেটের ধোঁয়া, রাসায়নিক পদার্থের বাস্প (Chemical fume) এবং বাতাসের অন্যান্য দূষন (Aznospheric Pollution)

এক ধরনের বেদনা নাশক ঔষধ (Non-steroidal anti-inflammatory drugs) যেমন, এসপিরিন, আইব্রুপ্রুফেন সেবন করলে।

আবেগ সংক্রান্ত বিষয়ঃ- যেমন- মানসিক চাপ, অত্যাধিক হাসি

সালফাইট সমূদ্ধ খাবারঃ- যেমন, ফলের রস, জ্যাম, চিংড়ি মাছ এবং যে কোন প্রক্রিয়াজাত খাবার

আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ঃ- যেমন, হঠাৎ করে তাপমাত্রার বড় পরিবর্তন হওয়া, ঠান্ডা বাতাস, ঝড়ো বাতাস, বাতাসের তাপমাত্রা ও আদ্রতা বেড়ে যাওয়া, দুষিত বাতাস ইত্যাদি

ঘরের ভিতরের পরিবেশঃ- যেমন, স্যাতস্যাতে ঘর, ধুলাযুক্ত কার্পেট, রাসায়নিক দ্রব্য, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা-মাকড়ের উপস্থিতি

ব্যায়ামঃ- ব্যায়াম করার সময় যখন শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বৃদ্ধি পায় তখন হাঁপানীর প্রকোপ বৃদ্ধি পেতে পারে

খাবারে আ্যলর্জিঃ- বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম খাবারে অ্যালার্জি হতে পারে। অ্যালার্জি বেশী হলে হাঁপানীর তীব্র আক্রমন ঘটতে পারে।

কি ভাবে হাঁপানী রোগ নির্ণয় করা হয়ঃ

শিশুদের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করে হাঁপানী বলাটা কঠিন, কারন হাঁপানীর প্রধান যে লক্ষন শ্বাস কষ্ট ও বুকের মধ্যে সাঁ সাঁ শব্দ এসব হওয়া অন্যরোগেও যেমন, ঠান্ডা লাগা অথবা ফুসফুসের যে কোন সংক্রমনেও হতে পারে। শিশুদের সাধারনত বছরে ০৬ থেকে ৮ বার ঠান্ডা জ্বর হয়। শীতের সময় বসন্তের শুরুতে কখনো কখনো হেমন্ত কালে শিশুদের এ ধরনের ঠান্ডা, কাশি, সর্দি হয়ে থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো হাঁপানী জনিত হয় না। আর এসবে আক্রান্ত হবার ঘটনা যদি বারবার ঘটতে থাকে এবং সেই সংগে যদি হাঁপানীর পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তবে হাঁপানী বলে সন্দেহ করা যেতে পারে।

৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে হাঁপানী বলা যাবে এমন কোন পরীক্ষা আবিস্কৃত হয় নি। ফলে বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে হাঁপানী রোগ নির্ণয় করা বেশ কঠিন। শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষন দেখে এবং ঔষধ (যে সমস্ত ঔষধ শ্বাসনালীকে সম্প্রসারিত করে) (Bronchodilators) গ্রহনের পর তার ফলাফল দেখে হাঁপানী নির্নয় করতে হয়। ৬ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা আছে, যেমন স্পাইরোমেট্রি টেষ্ট (Spirometry test).

নবজাতক ও ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে হাঁপানীর লক্ষন

সব শিশুদের লক্ষন সবসময় একরকম হয় না, তবে সব ক্ষেত্রেই সাধারনত কাশি, শ্বাস কষ্ট ও বুকের মধ্যে সাঁ সাঁ শব্দ থাকে। এ ক্ষেত্রে যা লক্ষনীয়

ঘনঘন বা প্রতি বৎসরই হচ্ছে কিনা

রাতে এবং ভোরে প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে কিনা

যে সমস্ত কারনে হাঁপানী শুরু হয় যেমন, শারিরীক পরিশ্রমের পর, আবেগে আক্রান্ত হওয়ার পর, অত্যাধিক হাসির পর অথবা স্যাঁতসাঁতে পরিবেশে অবস্থান করার পর কিংবা পোষা জীবজন্তুর সংস্পর্শে আসার পর হাঁপানী শুরু হচ্ছে কিনা

শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কাশিই একমাত্র লক্ষন হতে পারে।

হাঁপানীর আক্রমন

হাঁপনী হঠাৎ করে তীব্র আকারে শুরু হতে পারে। যাদের দীর্ঘমেয়াদী হাঁপানী আছে তাদের মধ্যে হঠাৎ করে এর তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এটাকে বলা হয় তীব্র হাঁপানী (Asthma attack)। এটা অনেক সময় জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ন হয়ে উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয়।

সাধারনত হাঁপানী থেকে তীব্র হাঁপানী হতে ৬-৪৮ ঘন্টা সময় লাগে। তবে কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এটা আরো কম সময়েও হতে পারে।

আপনার শিশুর যদি হাঁপানী থেকে থাকে, তবে তা তীব্র হাঁপানীতে পরিনত হচ্ছে কিনা, আপনাকে তা সবসময় লক্ষ্য রাখতে হবে। যে সব বিষয় আপনি লক্ষ্য রাখবেন-

শিশুর শ্বাস কষ্ট, বুকের সাঁ সাঁ শব্দ বেড়ে গেছে কিনা, বুকের মধ্যে চাপ লাগছে এমটা বলছে কিনা

যে ঔষধ সব সময় ব্যবহার করে (ইনহেলার) তাতে যখন কোন কাজ হয় না

যখন আপনি টের পাবেন আপনার শিশুর হাঁপানীর তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন দেরী না করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

তীব্র হাঁপানীর অন্যান্য লক্ষন

নিয়মিত ব্যবহার্য ঔষধে (ইনহেলার) উপশম হচ্ছে না

হাপানীর লক্ষন যেমন, শ্বাসকষ্ট , কাশি, বুকের মধ্যে সাঁ সাঁ শব্দ তীব্র হয়ে যাবে এবং সময়ের সাথে সাথে না কমে একই রকম থাকবে

শ্বাস প্রস্বাসের হার বেড়ে যাবে। কথা বলার সময় একটি বাক্য বলতে গিয়ে একাধিক বার শ্বাস নিতে হবে

নাড়ী (Pulse) দ্রুত হয়ে যাবে

খুব অস্থির ও বিরক্ত বোধ করবে

কখনও কখনও ঠোট ও আঙ্গুলের ডগা নীল হয়ে যাবে

হাপানী নির্নয়ের জন্য সে সমস্ত পরীক্ষা করা হয়

স্পাইরোমেট্রি (Spirometry test)

এটি একটি শ্বাসের পরীক্ষা যার মাধ্যমে ফুসফুস শ্বাসযন্ত্র হিসেবে কতটা কার্যকরী অবস্থায় আছে তা নির্নয় করা হয়। ৫ বৎসরের অধীক বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করানো যায়।

এই পরীক্ষায় রোগীদের একটি যন্ত্রের মধ্যে জোর শ্বাস ফেলতে বলা হয়। কখনও কখনও স্বাভাবিক অবস্থায় একবার এই পরীক্ষা করা হয় তারপর রোগীকে ঔষধ দিয়ে আবার পরীক্ষা করানো হয়। যদি ঔষধ দেয়ার পরের পরীক্ষাটিতে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বেশি দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে শিশুটির হাঁপানী আছে। এই পরিক্ষায় খরচ গড়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং বিশেষায়িত সব হাসপাতালেই এই পরীক্ষা করানো হয়।

অ্যালার্জীর পরীক্ষা

রক্ত পরীক্ষা অথবা ত্বকে এক ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয় শিশুর কোন খাবারে অথবা অন্যান্য কিছুতে যেমন- ধূলা, পোকা-মাকড়, ফুলের রেনু ইত্যাদিতে অ্যালার্জি আছে কিনা। হাঁপানীটি অ্যালার্জি জনিত কিনা তা বুঝার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়।

সর্বোচ্চ শ্বাস ফেলার মাত্রা নির্ণয়ের পরীক্ষা (Peak expiratory flow rate test)

হাতে ধরা যায় এমন একটি ছোট যন্ত্রের মাধ্যমে এই পরীক্ষা করা হয়। শ্বাস নালী সরু হয়ে পড়েছে কিনা, এই পরীক্ষার মাধ্যমে তা নির্ণয় করা হয়।শ্বাস ফেলার সময় একবারে সর্বোচ্চ কি পরিমান বাতাস আমরা ফুসফুস থেকে বের করতে পারি, এই যন্ত্রের মাধ্যমে তা নির্ণয় করা হয়।

অনেক সময় রোগীকে এমন একটি যন্ত্র দিয়ে দেয়া হয়, যাতে বাড়ীতে সে নিযমিত পরীক্ষঅটি করতে পারে এবং ফলাফল লিখে রাখতে পারে। হাঁপানরি মাত্রা তীব্রতার দিকে যাচ্ছে কিনা, এই লিখে রাখা ফলাফল থেকে ধারনা পাওয়া যায়।

এই পরীক্ষাটি শুধুমাত্র ৫ বৎসরের অধিক বয়সী শিশুদের জন্য কার্যকর।

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment