এজমা বাল্যরোগ চিকিৎসা শিশুর যত্ন শৈশবকালীন অসুস্থতা

হাঁপানীর চিকিৎসা ও হাঁপানী প্রতিরোধ

Written by Maya Expert Team

হাঁপানী চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে হাঁপানীকে নিয়ন্ত্রনে আনা এবং তারপর এটি যেন নিযন্ত্রনে থাকে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া। বেশরিভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় হাঁপানী ভালো থাকে এবং শিশুরা লক্ষন মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

অনেক সময় আমরা ঔষধের পাশ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু হাঁপানীর ক্ষেত্রে সে চিন্তা বাদ দিয়ে হাঁপানীর আক্রমন যেন প্রতিহত করা যায় সেদিকেই বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত। মায়েরা অনেক সময় পাশ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে বাচ্চাদের নেবুলাইজার দিতে চান না, কিন্তু বাস্তবতা হলো হাঁপানী যদি নিয়ন্ত্রনে না থাকে, তবে ক্ষতি হয় অনেক বেশী। বাচ্চাদের শারিরীক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। হাঁপানী নিয়ন্ত্রনে না থাকলে শিশুরা মোটা হয়ে পড়তে পারে। বুদ্ধি কমে যেতে পারে, দৈহিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি হৃদরোগ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

হাঁপানীর চিকিৎসা

লক্ষনের উপর ভিত্তি করে ডাক্তাররা হাঁপানী চিকিৎসায় বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগ করে থাকেন। হাঁপানীর প্রাথমিক অবস্থায় অনেক সময় ঔষধ না দিয়ে অপেক্ষা করেন। যখন ঔষধ দেন, সাধারনত সেটা শুরু হয় ইনহেলার দিয়ে।

হাঁপানী উপশমের প্রথম ঔষধ হলো “ইনহেলার”। এটা দুরকমের হয়, স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী। শ্বাস কষ্টের তাৎক্ষনিক উপশমের জন্য কয়েক রকম ঔষধ ইনহেলারের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়, যেমন, সালবুটামল (Salbutamol), সালমেটেরোল (Salmeterol), এবং ফোরমোটেরোল (Formoterol)। এই ধরনের উপশমকারী ইনহেলার গুলো সাধারনত নীল রংয়ের হয়।

হাঁপানীর আক্রমন যেন না হয় তার জন্য ব্যবহার করা হয় স্টেরয়েড (Costicosteroid) ইনহেলার। সাধারনত ফ্লুটিকাস্ন (Fluticasone) ও বুডিসোনাইড (Budesonide) স্টেরয়েড ইনহেলার হিসাবে পাওয়া যায়। হাঁপানীর চিকিৎসায় স্টেরয়েড ইনহেলার অপরিহার্য। উপশমকারী দীর্ঘ মেয়াদী ঔষধ ও প্রতিরোধকারী স্টেরয়েড এক সংগে একই ইনহেলারে বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়

হাঁপানী প্রতিরোধক হিসাবে অন্য যে ঔষধটি ব্যবহার করা হয় তার নাম মন্টিলুকাষ্ট (Montilucast)। এটি শ্বাসনালীর প্রদাহ (Inflammation) কমিয়ে হাঁপানী আক্রমনের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়

থিওফাইলিন (Theofilin)- এই ঔষধটি শ্বাসনালীর মধ্যে চক্রাকারে যে মাংশপেশী থাকে, হাঁপানীর আক্রমনের সময় যা সংকুচিত হয়ে পড়ে, সেটিকে শিথিল করে দেয়, ফলে শ্বাসনালীর ভেতরের প্রসস্থতা বৃদ্ধি পায়

মুখে খাবার স্টেরয়েড- এটি ট্যাবলেট অথবা সিরাপ আকারে পাওয়া যায়। হাঁপানীর তীব্র আক্রমনের সময় এটি কয়েকদিন ব্যবহার করতে হয়

পাঁচ বৎসরের অধিক বয়সী শিশু যারা ইনহেলার ব্যবহার করতে পারে, তাদেরকে ইনহেলারের সাথে একটি স্পেসার (Spacer) লাগিয়ে ব্যবহার করতে দেয়া হয়। স্পেসারটি (Spacer) থাকলে শিশুরা সহজে ইনহেলার ব্যবহার করতে পারে। আর যারা ইনহেলার ব্যবহার করতে পারে না তাদেরকে নেবুলাইজারের (Nebuliser) সাহায্যে ঔষধ দেয়া হয়

হাঁপানী প্রতিরোধ

যে সমস্ত কারনে হাঁপানীর আক্রমন ঘটে সেগুলো প্রতিহত করাই হাঁপানী প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। যেমন,

অ্যালার্জি উদ্রেগকারী জিনিস

১। ধুলার মধ্যে থাকা পোকা-মাকড় (Dust mites) – এগুলো সাধারনত সব বাসাতেই কার্পেট, বিছানার তোষক, বালিশ, বিছানার চাদর, জামা কাপড়, খেলনা পুতুল এবং অন্যান্য আসবাবপত্র যা কাপড় বা অন্যান্য কিছু দিয়ে ঢাকা থাকে এবং কম পরিস্কার করা হয় সেখানে থাকে।

এসব থেকে মুক্ত থাকার উপায়

বিশেষ ধরনের প্লাষ্টিকের কিছু কার্পেট কাভার পাওয়া যায় এর ব্যবহারের মাধ্যমে কার্পেটকে এসব থেকে মুক্ত রাখা যায়।

একইভাবে বালিশকেও বিশেষভাবে তৈরি বালিশ কভার দিয়ে ঢেকে দিয়ে এটা থেকে মুক্ত রাখা যায়।

বিছানার চাদর বালিশের কাভার কম্বলের কাভার এগুলোকে সপ্তাহে অন্তত ০১ দিন গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এই পোকা-মাকড় ধ্বংস করতে হলে গরম পানির তাপমাত্রা অবশ্যই ১৩০ºF এর বেশী হতে হবে।

ঘরের আদ্রতা ৬০% এর নীচে রাখতে হবে (আদর্শ আদ্রতা হলো ৩০% – ৫০%)। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে এটা করা সম্ভব

শোবার ঘরে কার্পেট ব্যবহার না করাই ভালো

বাচ্চাদের খেলার পুতুলগুলো শোবার ঘরে রাখা যাবে না এবং এগুলোকে সপ্তাহে অন্তত ১ দিন ধুয়ে নিতে হবে।

২। পশুর পশম (Animal fur)

অনেকেরই পশুর পশমে অ্যালার্জি থাকে। সে ক্ষেত্রে যা করনীয়

পশমযুক্ত জীবজন্তুকে ঘরের বাইরে রাখতে হবে। একান্তই যদি ঘরে রাখতে হয় তবে শোবার ঘর থেকে দূরে রাখতে হবে এবং সবসময় দরজা বন্ধ রাখতে হবে।

কাপড় দিয়ে মোড়ানো কার্পেট ও অন্যান্য আসবাবপত্র ঘরের বাইরে রাখতে হবে। একান্তই সম্ভব না হলে পোষা জীবজন্তুকে এসব থেকে দুরে রাখতে হবে।

৩। তেলাপোকা

হাঁপানী আক্রান্ত অনেকেরই তেলাপোকার বিষ্ঠা ও তার অঙ্গ-প্রতাঙ্গে অ্যালার্জি হয়। এক্ষেত্রে করনীয় হলো

সব সময় খাবার ঢেকে রাখতে হবে

তেলাপোকা ধ্বংসের ঔষধ নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে

তেলাপোকা ধ্বংসের জন্য যদি কোন স্প্রে ব্যবহার করা হয়, তবে গন্ধ মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকতে হবে।

৪। ঘরের ভিতরের স্যাতস্যাতে ছত্রাকপূর্ণ জায়গা

ঘরের ভিতরের পাইপ বা অন্যান্য জিনিস যেখান থেকে পানি চুইয়ে স্যাতস্যাতে হয়ে পড়তে পারে সেগুলোকে মেরামত করে রাখতে হবে।

স্যাতস্যাতে জায়গাগুলো নিয়মিত পরিস্কার রাখতে হবে

৫। ঘরের বাইরের ফুলের রেনু ও বিভিন্ন ছত্রাকের রেনু

ঘরের জানালা বন্ধ রাখতে হবে

দিনের বেলায় বাতাসে এগুলোর পরিমান বেশী থাকে, তাই দিনের বেলায় যতটা সম্ভব দরজা জানালা বন্ধ রাখতে হবে

অনেক সময় যে ঋতুগুলোতে অ্যালার্জি বৃদ্ধি পায়, সেই ঋতুর শুরুতে ডাক্তারের পরামর্শ মতো প্রতিরোধক ঔষধ সেবন শুরু করা যেতে পারে

উত্যাক্তকারী দ্রব্যাদী (Irritants)

সিগারেটের ধোঁয়াঃ

ধুমপায়ীকে সিগারেট ছাড়তে হবে এবং বাসায় যেন কেউ সিগারেট না খায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে

যে কোন ধরনের ধোঁয়া, তীব্র গন্ধ ও স্প্রে এড়িয়ে চলতে হবে

আরো যে কারনে হাঁপানী তীব্র আকার ধারন করতে পারে

সালফাইট যুক্ত খাবার যেমন, শুকনো ফল, প্রক্রিয়াজাত আলু অথবা চিংড়ি, এগুলোতে যদি কারো অ্যালার্জি থাকে তবে তা খাওয়া বন্ধ করতে হবে

শীতল বাতাস, ঠান্ডা ও ঝড়ো হাওয়ার সময় মাফলার দিয়ে নাক-মুখ ভালো করে ঢেকে রাখতে হবে

About the author

Maya Expert Team

Leave a Comment