খাদ্য এবং পুষ্টি বাল্যরোগ চিকিৎসা শিশুর যত্ন

খাদ্যের প্রকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা

দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য

সম্পূর্ণ দুধ ও পূর্ণ ননীযুক্ত দুগ্ধজাত দ্রব্য ভিটামিন ‘এ’ এর একটি ভালো উৎস। ভিটামিন এ শরীরকে রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে ও ত্বক ও চোখকে সুস্থ রাখে।

এক বছর বয়স থেকে আপনি শিশুকে বুকের দুধ বা কৌটার দুধের পরিবর্তে গরুর দুধ খাওয়ানো শুরু করতে পারেন অথবা বুকের দুধ পান করানো চালিয়ে যেতে পারেন। শিশুর হাড় ও দাঁতকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম প্রতিদিন তিনবার দুধ পানের মাধ্যমে পাওয়া যায়। সরাসরি দুধ পান করাতে পারেন অথবা দুধ থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, যেমন পনির, দই, ইত্যাদি শিশুকে খাওয়াতে পারেন।

যদি আপনার শিশু ভালোভাবে খেতে পারে এবং তার বয়স অনুসারে বৃদ্ধি ঠিক থাকে তাহলে ২ বছর বয়স থেকে তাকে অর্ধ-ননীযুক্ত দুধ খাওয়ানো শুরু করতে পারেন। অর্ধ-ননীযুক্ত দুধে পর্যাপ্ত পরিমাণ চর্বি থাকে না তাই ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এটি উপযুক্ত নয়।

শ্বেতসার সমৃদ্ধ খাদ্য

শর্করা বা শ্বেতসার যুক্ত খাদ্য কাজ করার শক্তি যোগায়, সেই সাথে পুষ্টি ও কিছু পরিমাণ আঁশেরও যোগান দেয়। রুটি, সিরিয়াল, আলু, মিষ্টি আলু, ভাত কিংবা কসকস (সুজি থেকে তৈরি এক ধরণের খাদ্য), যাই হোক না কেন, এজাতীয় খাদ্য খেতে শিশুরা খুব পছন্দ করে।

আপনার শিশুকে আপনি শস্য দানা (চাল, গম, ভুট্টা ইত্যাদি) থেকে তৈরি খাবার যেমন, ভাত, রুটি, পাস্তা, ব্রেড খেতে দিতে পারেন। কিন্তু শুধুই শশস্য দানার খাবার প্রদান করা উচিত নয় কেননা প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণের পূর্বেই এজাতীয় খাবার শিশুর ক্ষুধা কমিয়ে দেয়।

সিরিয়ালে ব্রান (তুষ) যোগ করবেন না কিংবা তুষ জাতীয় সিরিয়াল শিশুকে খাওয়াবেন না কারণ এগুলো শিশুর শরীরে ক্যালসিয়াম, আয়রন প্রভৃতি খনিজ পদার্থ শোষণ হতে দেয় না। আয়রন শিশুর শরীরের জন্য অত্যাবশ্যক উপাদান। আয়রনের অভাবে রক্তশূণ্যতা হতে পারে, যা শিশুর শারিরীক ও মানসিক বিকাশে বাধা দান করে। যেসব শিশু অতিরিক্ত দুধ পান করে তারা রক্তশূণ্যতায় আক্রান্ত হওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

মাছ, মাংসতে থাকা আয়রন খুব সহজেই শরীরে শোষিত হয়ে যায়। এমনকি অল্প পরিমাণ মাছ কিংবা মাংস গ্রহণও উত্তম কেননা এগুলো অন্যান্য খাদ্য উৎস থেকে আয়রন শোষণে শরীরকে সাহায্য করে। আপনার শিশু যদি মাংস বা মাছ না খেয়ে থাকে, তাহলে শরীরে প্রয়োজনীয় আয়রনের জন্য নিম্নোক্ত খাদ্য প্রদান করতে পারেনঃ

সকালের নাস্তায় সিরিয়াল

গাঢ় সবুজ শাকসবজি

পাউরুটি

মটরশুঁটি, ডাল এবং

শুকনো ফল, যেমন কিসমিস, খেজুর এবং আলুবোখারা

ফল ও শাকসবজি

ফল ও শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, মিনারেল (খনিজ পদার্থ) ও আঁশ থাকে। তাজা, হিমায়িত, কৌটার বা শুকনো যে ধরণেরই ফল ও শাকসবজি হোক না কেন, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে এগুলো খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যদি সম্ভব হয়, পাঁচমিশালি সবুজ সবজি (যেমন ফুলকপি ও বাধাকপি) এবং মিশ্রিত হলুদ ও কমলা রঙের সবজি (যেমন মিষ্টি কুমড়া, গাজর ও স্কোয়াশ) এবং ফলের মিশ্রণ (যেমন আম ও পাকা পেপে) ইত্যাদি খেতে দিন।

বিভিন্ন জাতের ফল ও শাকসবজিতে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে, তাই আপনার শিশু যতই বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি খাবে ততই উত্তম। তবে শিশু যদি শুধু এক বা দুই ধরণেরই ফল ও শাকসবজি খায়, তাতে দুশ্চিন্তা করবেন না। অনেক শিশুই রান্না করা সবজি খেতে পছন্দ করে না কিন্তু আপনি রান্না করার সময় কাঁচা সবজি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেতে চেষ্টা করবে। পাকোড়া বানিয়ে বা পিজ্জার উপরে সাজিয়ে কিংবা সসের সাথে মিশিয়ে শিশুকে সবজি খাওয়াতে পারেন।

মাছ, মাংস ও অন্যান্য প্রোটিন

বর্ধন ও বিকাশের জন্য শিশুদের প্রয়োজন প্রোটিন ও আয়রন। মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম, ডাল (যেমন মটরশুটি, মসুর ও মটর) এবং ডাল থেকে তৈরি খাবার, (যেমন টফু, হুমাস ও সয়া মিন্স) ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য প্রোটিন ও আয়রনের চমৎকার উৎস। আপনার শিশুকে এই জাতীয় খাদ্য এক বা দুই অংশ দেয়ার চেষ্টা করুন।

মাছ ও মাংসে আরো রয়েছে জিংক, যা ক্ষত নিরাময় ও শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে।

ফ্যাট বা চর্বি

বিশেষ করে ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্যে চর্বি থেকে প্রাপ্ত শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে কিছু ভিটামিন আছে যা শুধু চর্বিতেই মিলে, সেজন্য পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ, দই, পনির, এবং তেলযুক্ত মাছ এসব খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার শিশুর বয়স ২ বছর পুর্ণ হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার খাদ্যতে চর্বির পরিমাণ কমিয়ে ফেলুন। কিছু খাদ্য রয়েছে যা শিশুর খাদ্যে সম্পৃক্ত বা ক্ষতিকারক চর্বি এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সস্তা বার্গার, চিপস, বিস্কুট, কেক ও তেলে ভাজা খাবারগুলোতে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ খুবই বেশি থাকে। যদিও এধরণের খাবার শিশু ও বয়স্ক উভয়দের কাছেই জনপ্রিয়, পরিবারকে সুস্থ রাখতে এসব খাবার সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। যদি আপনার শিশু প্রধান ৪ ধরণের খাবার ভালোভাবে খেয়ে নেয় তাহলে এই ধরণের খাবারকে ‘অতিরিক্ত’ খাবার হিসেবে ধরে নিতে পারেন।

আপনার পরিবারের সদস্যরা কতটুকু চর্বি গ্রহণ করছে সেদিকে নজর রাখুন এবং তা কমানোর চেষ্টা করুন। নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলি আপনার পরিবারে গৃহীত খাদ্যে চর্বির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করবেঃ

ভাজার পরিবর্তে গ্রিল অথবা বেক করা খাবার গ্রহণ করুন।

মাংস রান্নার সময় কিমা বা কারি এর মতো করে চর্বি সরিয়ে ফেলুন।

চর্বিহীন মাংস অথবা কম চর্বিযুক্ত মাংসজাত পণ্য, যেমন কম চর্বিযুক্ত সসেজ, বার্গার প্রভৃতি ক্রয় করুন।

পোল্ট্রি মাংসের চামড়াতে সবচেয়ে বেশি চর্বি থাকে তাই রান্নার পুর্বে চামড়া আলাদা করে ফেলুন।

২ বছরের অধিক বয়সী বাচ্চার জন্য কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাদ্য যেমন হ্রাসকৃত চর্বির পনির ব্যবহার করুন।

যতটুকু সম্ভব রান্নার তেল কম ব্যবহার করুন এবং উচ্চ পরিমাণে ওমেগা-৩ পলি আনস্যাচুরেটেড আছে এমন তেল, যেমন রাইসরিষা, সয়াবিন ও জলপাই তেল বা অলিভ ওয়েল এগুলো ব্যবহার করুন।

চিনি

আপনার শিশুর দাঁত সুস্থ ও সুন্দর রাখার জন্য, নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পাশাপাশি শিশুর চিনি খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিন। পানীয়, জুস, মিষ্টি, কেক ও জ্যাম বা ফলের আচারে অতিরিক্ত চিনি থাকে। শিশুকে এজাতীয় খাদ্য খাওয়ালে তা হালকা নাস্তার পরিবর্তে আহারের সময় দিন।

শিশুকে চিনিযুক্ত পানীয় ও মিষ্টি বেশি খেতে দিবেন না। দাঁতের সাথে চিনির সংস্পর্শ যত বেশি থাকবে, দাঁতের ক্ষতির সম্ভাবনা ততই বাড়বে।

লবণ

শিশুর খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ দেয়ার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ খাদ্যেই পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ থাকে। খাবারের সাথে অতিরিক্ত লবণ যোগ করলে তা শিশুর খাদ্যকে নোনতা বা লবণাক্ত করে তুলবে এবং পরবর্তী জীবনে এই অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ধীরে ধীরে রান্নায় লবণের পরিমাণ কমালে আপনার পুরো পরিবার উপকৃত হবে।

১ বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক ১ গ্রামের অধিক লবণ গ্রহণ উচিত নয়। ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য লবণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২ গ্রাম এবং ৪ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুর জন্য গৃহীত লবণের পরিমাণ হলো সর্বোচ্চ ৩ গ্রাম।

About the author

Maya Expert Team