এসটিআই এসটিডিএস যৌনবাহিত রোগসংক্রান্ত সকল জিজ্ঞাসা

সাধারণ যৌন বাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) সমূহ

যৌন বাহিত সংক্রমণ (এসটিআই) অনিরাপদ শারীরিক মিলন অথবা যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির দেহ থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে ছড়ায়।

গনোরিয়া

গনোরিয়া একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণ বা এসটিআই যা যৌন মিলনের সময় সহজে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৫০% মহিলা ও ১০% পুরুষের ক্ষেত্রে এর কোন লক্ষণ প্রকাশিত হয় না এবং তারা সংক্রমিত হওয়া সম্পর্কে অবগত থাকে না।

মহিলাদের ক্ষেত্রে, গনোরিয়ার কারনে মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা ও জ্বালা, স্রাব (প্রায়ই হলুদ বা সবুজ তরল থাকে), যৌন মিলনের সময় ও পরে তলপেটে ব্যথা ও রক্তপাত হওয়া, মাসিকে রক্তপাত এবং অনেক সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হয়ে থাকে ।

পুরুষদের ক্ষেত্রে, গনোরিয়ার কারণে মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা অথবা জ্বালা অনুভব, শিশ্ন থেকে সাদা, হলুদ বা সবুজ স্রাব, অন্ডকোষ ব্যথা বা ভঙ্গুরতা অনুভব হতে পারে।

গনোরিয়ার কারণে মলদ্বার, কন্ঠ অথবা চোখও সংক্রমিত হতে পারে।

মূত্র পরীক্ষা অথবা আক্রান্ত স্থানের টিস্যু বা কোষ নিয়ে পরীক্ষা করার মাধ্যমে গনোরিয়া সহজেই নির্ণয় করা যায়। অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা সংক্রমণ সহজেই নিরাময় করা যায়, তবে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে বন্ধ্যাত্বের মতো দীর্ঘ মেয়াদী জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্ট হতে পারে।

গনোরিয়া আক্রান্ত মায়ের দেহ থেকে সেটি শিশুর দেহেও ছড়িয়ে পড়ে।

সিফিলিস

সিফিলিস হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া সৃষ্ট সংক্রমণ যার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথামুক্ত কিন্তু উচ্চ সংক্রমিত ক্ষতের (শরীরের ব্যথাময় স্থান) সৃষ্টি হয়, যা যৌনাঙ্গে ও মুখের পার্শ্ববর্তী স্থানে হয়ে থাকে। এই ক্ষত নিরাময় হওয়ার পূর্বে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে।

অন্যান্য প্রকাশিত লক্ষণসমূহ হলো র‌্যাশ (ফুসকুড়ি) ফ্লু- এর ন্যায় অসুস্থতা অথবা অস্বাভাবিকভাবে চুল কমে যাওয়া। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব উপসর্গ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে এবং পরবর্তীতে উপসর্গহীন পর্যায় শুরু হবে। বিলম্বিত অথবা তৃতীয় পর্যায়ে সাধারণত বহু বছর পর হয়ে থাকে এবং অনেক জটিল সমস্যা, যেমন হৃদরোগ, প্যারালাইসিস, অন্ধত্ব প্রভৃতি সৃষ্টি করতে পারে।

সিফিলিসের উপসর্গসমূহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেকোন পর্যায়েএটি নির্ণয়ের জন্য শুধুমাত্র একটি রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা এর চিকিৎসা করা হয় যা সাধারণত পেনিসিলিন ইনজেকশন হয়ে থাকে। সঠিকভাবে সিফিলিসের চিকিৎসায় এর পরবর্তী পর্যায়ের সংক্রমন থেকে নিরাপদ থাকা যায়।

সিফিলিসে আক্রান্ত মা থেকে তা শিশুতে সংক্রমিত হয়।

 

এইচআইভি

এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিগুলো হলোঃ

অনিরাপদ শারিরিক সম্পর্ক

জীবাণুযুক্ত সুঁই, সিরিঞ্জ অথবা ইঞ্জেকশনের মত অন্যান্য উপাদান ব্যবহার

গর্ভাবস্থা, জন্ম অথবা স্তন্যপানের সময় আক্রান্ত মা হতে সন্তানের দেহে সংক্রমণ

ওরাল সেক্স বা যৌন মিলনে ব্যবহৃত খেলনা বা উপাদান ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা, যদিও এ পদ্ধতি অ্যানাল সেক্স এবং যোনিপথে মিলনের চেয়ে অনেকাংশে ঝুঁকিমুক্ত

এইচআইভি ভাইরাসের আক্রমণে ইমিউন সিস্টেম বা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর কোনো চিকিৎসা নেই তবে তবে কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে যা গ্রহণে অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ জীবন বা অন্য কথায় স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে পারে।

এইচআইভি সংক্রমণের সর্বশেষ পর্যায় হলো এইডস। এই অবস্থায় জীবনের প্রতি হুমকি স্বরুপ সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না।

এইচআইভি আক্রান্ত অধিকাংশ ব্যক্তি সুস্থবোধ করে থাকেন, তাদেরকে দেখে অসুস্থ মনে হয় না এবং কোন লক্ষণও প্রকাশিত হয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার পর ফ্লু-এর ন্যায় অসুস্থতার সাথে জ্বর, গলা ভাঙা বা র‌্যাশ (ফুসকুড়ি) হতে পারে। একে বলা হয় সেরোকনভার্সন অসুস্থতা। 

এইচআইভি সংক্রমণ পরীক্ষা করার জন্য সাধারণত শুধুমাত্র একটি রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। কোন কোন ক্লিনিকে দ্রুত  পরীক্ষা করার জন্য আঙুলে ফুটো করে রক্ত পরীক্ষা বা লালা পরীক্ষা করানো হয়।

ক্লামিডিয়া

যৌন মিলনের সময় ক্লামিডিয়া ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ব্যক্তির মধ্যেই এর কোন লক্ষণ প্রকাশিত হয় না, তাই আক্রান্ত হওয়া সম্পর্কে তারা অবগত থাকেন না ।

মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্লামিডিয়ার কারণে মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা বা জ্বালা অনুভূত হওয়া, স্রাব, যৌনমিলনের সময় ও পরে তলপেটে ব্যাথা ও মাসিকের সময় রক্তপাত (অনেক সময় অতিরিক্ত রক্তপাত) হতে পারে।

ক্লামিডিয়ায় আক্রান্ত পুরুষদের মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা বা জ্বালা অনুভূত হওয়া, শিশ্ন থেকে সাদা, ঘোলাটে তরল পদার্থ নিঃসৃত হওয়া, এবং অন্ডকোষে ব্যথা বা ভঙ্গুরতা অনুভব করতে পারেন।

ক্লামিডিয়া মলদ্বার, কন্ঠ অথবা চোখেও সংক্রমিত হতে পারে।

মূত্র পরীক্ষা অথবা আক্রান্ত স্থানের টিস্যু বা কোষ নিয়ে সহজেই ক্লামিডিয়া  নির্ণয়ের পরীক্ষা করা যায়। অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা এর চিকিৎসা করা হয়, তবে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে বন্ধ্যাত্বের মতো দীর্ঘস্থায়ী জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

জেনিটাল ওয়ার্টস (যৌনাঙ্গে আঁচিল বা স্ফীতি)

যৌনাঙ্গ বা মলদ্বারে ছোট মাংসল বৃদ্ধি, ফুলে যাওয়া বা ত্বক পরিবর্তিত হওয়াকে জেনিটাল ওয়ার্টস বলে। হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)-এর কারণে এগুলো হয়ে থাকে।

আঁচিল বা স্ফীত স্থানে কোন ব্যথা অনুভূত হয় না, তবে এতে চুলকানি বা আক্রান্ত স্থান লাল হয়ে যেতে পারে। কিছু কিছু সময় এ থেকে রক্তপাতও হতে পারে।

ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমে এইচপিভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তাই এর জন্য যোনী-অভ্যন্তরে যৌনমিলনের (penetrative sex) প্রয়োজন হয় না ।

জ়েনিটাল ওয়ার্টসের বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে যার মধ্যে ক্রীম ও ক্রাইয়োথেরাপি (স্ফীত স্থানকে শীতলকরণ) অন্তর্ভূক্ত ।

জেনিটাল হার্পিস

জেনিটাল হার্পিস হচ্ছে হার্পিস সিম্পেক্স ভাইরাস (এইচএসভি) সৃষ্ট একটি সাধারন সংক্রমণ। ঠান্ডায় কালশিটে পড়াও একই ভাইরাসের কারনে হয়ে থাকে। ভাইরাস সংস্পর্শে আসার কয়েকদিনের মধ্যে কিছু কিছু ব্যক্তির মধ্যে এইচএসভি- এর লক্ষণ প্রকাশিত হয়। ক্ষুদ্র, ব্যথাময় ফোস্কা বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়, যাতে চুলকানি, যন্ত্রণাবোধ অনুভূত হয় কিংবা মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা হয়।

সংক্রমিত হওয়ার পরে ভাইরাস দীর্ঘ সময় ধরে সুপ্ত (নিষ্ক্রিয়) অবস্থায় থাকে। তবে, বিভিন্ন কারণে ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হতে পারে, যার ফলে ফোস্কা আবার দেখা দেয়, যদিও সাধারণত এগুলো আকারে ছোট এবং কম ব্যথাময় হয়।

উপসর্গ পরিলক্ষিত হলে এইচএসভি নির্ণয়ের পরীক্ষা করা সহজ। যদিও জেনিটাল হার্পিসের কোন চিকিৎসা নেই, তবে অ্যান্টিভাইরাল (ভাইরাসরোধী) ঔষধ গ্রহণের মাধ্যমে উপসর্গগুলো সাধারণত নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজিনালিস

এক জাতীয় ক্ষুদ্র পরজীবী দ্বারা ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজিনালিস (টিভি)-এর সংক্রমণ হয়।

এই সংক্রমণের কারণে নারীদের ফেনসদৃশ হলুদ অথবা তরল স্রাব হয়ে থাকে, যাতে বিকট গন্ধ থাকে। সেই সাথে যোনির পার্শ্ববর্তী স্থানে ক্ষত অথবা চুলকানি হয়ে থাকে এবং মুত্রত্যাগের সময় ব্যথা অনুভূত হয়।

টিভির কারণে পুরুষদের ক্ষেত্রে খুব কমই উপসর্গ প্রকাশিত হয়। মূত্রত্যাগের সময় ব্যথা বা জ্বালা অনুভূত হওয়া, সাদাটে স্রাব অথবা লিঙ্গত্বক পোড়ার মত হয়ে থাকে।

কিছু কিছু সময় এ সংক্রমণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যেতে পারে এবং মূত্র ও লালা পরীক্ষা করানোর জন্য বিশেষায়িত ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য ডাক্তার পরামর্শ দিতে পারেন। নির্ণয় করা হয়ে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা সাধারণত চিকিৎসা প্রদান করা হয় ।

শ্রোণীচক্রের উকুন

যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে শ্রোণীচক্রের উকুন (ক্র্যাব) সহজেই অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রোণীচক্রের চুলে এজাতীয় উকুন পাওয়া যায় তবে বগল, শরীরের লোম, দাড়ি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ভ্রু ও চোখের পাতার লোমে এটি দেখতে পাওয়া যায়।

একই ব্যক্তির শরীরের চুল থেকে লোমে উকুন চলে যায় তবে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে লাফ দিয়ে বা উড়ে চলে যায় না। এর কোন লক্ষণ অনুভূত হতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। অধিকাংশ ব্যক্তি চুলকানি অনুভব করতে পারেন এবং লোম অথবা চুলে উকুন বা ডিম দেখা যেতে পারে। অধিকাংশ ফার্মেসিতে এবং ডাক্তারের কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ ক্রীম অথবা শ্যাম্পু ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রোনীচক্রের উকুন সহজেই দূর করা যায়। শরীরের লোম বা শ্রোনীচক্রের লোম কামানোর প্রয়োজন পড়ে না।

স্ক্যাবিস

অতি ক্ষুদ্র পরজীবী কীটবিশেষ দ্বারা স্ক্যাবিস সৃষ্টি হয়, যাতে এ জাতীয় কীট ত্বকে গর্ত বা ক্ষত সৃষ্টি করে। শরীরের নৈকট্যে বা যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে স্ক্যাবিস অন্য ব্যক্তির দেহে ছড়িয়ে পড়ে; একইভাবে সংক্রমিত কাপড়, বিছানার চাদর অথবা তোয়ালে থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে ।

স্ক্যাবিস সংক্রমন হলে তীব্র চুলকানি হয়ে থাকে যা রাতে প্রচুর পরিমাণে বাড়ে। যৌনাঙ্গতে এ চুলকানি হতে পারে, তবে অধিকাংশ সময়ে আঙুলের মধ্যবর্তী জায়গায়, কব্জি এবং গোড়ালি, বগল, শরীর অথবা বুকে বেশি চুলকানি হয়ে থাকে ।

শরীরে র‌্যাশ অথবা ক্ষুদ্র দাগ পরিলক্ষিত হয়। কিছু কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে, স্ক্যাবিসকে একজিমা মনে হয়, কেননা কীটকে দেখতে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

অধিকাংশ সময় বিশেষ ধরণের ক্রীম ও শ্যাম্পু, যা অনেক সময় ফার্মেসিতে ও ডাক্তারের কাছে পাওয়া যায়, তা গ্রহণের মাধ্যমে স্ক্যাবিস সফলতার সাথে চিকিৎসা করা যায়। কার্যকর চিকিৎসার পরও চুলকানি কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য অব্যাহত থাকতে পারে।

About the author

Maya Expert Team