অস্থিবিদ্যা কাঁধ

কাঁধে ব্যাথা হওয়ার কারণ

ছোট-খাট আঘাত, অস্বাস্থ্যকর ভঙ্গি, বা কোন শারীরিক সমস্যার কারনে কাঁধে ব্যাথা হতে পারে।

যে সব কারণে কাঁধে বা ঘাড়ে ব্যাথা হয়ঃ

ফ্রোজেন শোল্ডার (frozen shoulder)

রোটেটর কাফ ডিসঅর্ডার (rotator cuff disorders)

শোল্ডার ইন্সটাবিলিটি (shoulder instability)

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডার (acromioclavicular joint disorder)

অস্টিওয়ার্থ্রাইটিস (osteoarthritis)

হাত বা কলার-বোন ভেঙে গেলে

ফ্রোজেন শোল্ডার (Frozen Shoulder)

ফ্রোজেন শোল্ডার, যাকে এঢহেসিভ ক্যাপ্সুলাইটিস (adhesive capsulitis)-ও বলে, যাতে কাঁধের জয়েন্টে এক ধরনের স্থায়ি আড়ষ্ট ভাবের কারনে কাঁধ সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে নাড়ানো যায় না।

কাঁধের জয়েন্ট ঘিরে থাকা নমনীয় টিস্যুগুলো পুরু হয়ে গেলে, ফুলে গেলে বা শক্ত হয়ে গেলে ফ্রোজেন শোল্ডার হয়। এতে আপনার কাঁধের জয়েন্টে হাতের উপরের অংশ (humerus)-এর জন্য জায়গা কমে যায় এবং হাত নাড়াতে অসুবিধা বা ব্যাথা হয়। এতে আপনার জামা গায় দেয়া, গাড়ি চালানো এবং ঠিক ভাবে ঘুমানোর মত কাজগুলো করতে অসুবিধা হয়। কেউ কেউ এই অবস্থায় হাত নাড়াতেই পারেন না।

ফ্রোজেন শোল্ডারের উপসর্গগুলো বিভিন্ন রকম হতে পারে তবে এগুলো খুব আস্তে আস্তে বাড়ে। এগুলো কয়েক মাস বা বছর ধরে তিনটি ধাপে অনুভূত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৪০ বছরের বেশি বয়স্ক লোকেদের মধ্যে ফ্রোজেন শোল্ডার দেখা যায়। এটি পুরুষদের চাইতে মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

ফ্রোজেন শোল্ডারের সঠিক কারণ জানা যায় না। তবে কয়েকটি কারনে এটি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এগুলো হচ্ছেঃ

কাঁধে আঘাত পেলে বা সার্জারি করার কারনে হাত ও কাঁধ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় রাখলে

ডায়বেটিস থাকলে আপনার ফ্রোজেন শোল্ডার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, তবে এটা ঠিক কী কারনে হয় তা জানা যায় না

অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা – যেমন হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসের অসুখ, অতিরিক্ত কার্যকরী থাইরয়েড গ্রন্থি (hyperthyroidism) এবং ডুপুয়েট্রেন’স কন্ট্রাকচ্যুর (Dupuytren’s contracture; এতে হাতের আঙ্গুল বেঁকে তালুতে লেগে যায়)- থাকলে ফ্রোজেন শোল্ডার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

রোটেটর কাফ ডিজর্ডার (Rotator cuff disorders)

কাঁধের জয়েন্ট ঘিরে থাকা পেশি এবং টেন্ডনগুলোকে রোটেটর কাফ বলে। টেন্ডন হচ্ছে মজবুত, রাবারের মত একধরনের পেশী’তন্তু (cords) যা দিয়ে হাড়ের সাথে মাংস সংযুক্ত থাকে। রোটেটর কাফ জয়েন্টকে সঠিক অবস্থানে রাখে, যাতে এটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে নাড়ানো যায়।

একেক ধরনের রোটেটর কাফ ডিজর্ডারের কারনে একেক উপসর্গ দেখা যায়, কিন্তু সাধারন লক্ষণগুলো হচ্ছেঃ

কাঁধের উপর হাত উঠিয়ে কোন কাজ করলে (যেমনঃ চুল আঁচড়ানো) ব্যাথা বেড়ে যাওয়া

শরীরে না লাগিয়ে হাত ঘোরালে যদি ব্যাথা হয়

কাঁধের সামনে বা পাশের দিকে ব্যাথা হলে

রাতে ব্যাথা বাড়লে

বিভিন্ন ধরনের রোটেটর কাফ ডিজর্ডার এবং তাদের বিভিন্ন কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হল।

টেন্ডোনাইটিস এবং বারসাইটিস (Tendonitis and bursitis) – টেন্ডোনাইটিস হলে টেন্ডন ফুলে যায়। বারসিটিস হলে বারসা (bursa) ফুলে যায়। বারসা হচ্ছে একধরনের ছোট তরলপূর্ণ থলে যা জয়েন্টের উপর এবং টেন্ডন ও হাড়ের মাঝখানে থাকে। কাঁধ অতিরিক্ত ব্যবহার করার ফলে বা কাঁধে আঘাত পেয়ে ফুলে গেলে রোটেটর কাফ টেন্ডোনাইটিস এবং বারসাইটিস দেখা দেয়। যেমন, কেউ যদি কাঁধের উপর হাত অনেক বেশি উঠিয়ে রাখার মত কোন কাজ (বল্লম বা চাকতি নিক্ষেপ খেলা) করেন তাহলে এই অসুবিধাটা হতে পারে। কাঁধের জয়েন্টে কোন আঘাত পেলে টেন্ডন বা বারসা ফুলে যেতে পারে। এর মানে হচ্ছে জয়েন্টে টেন্ডন ও পেশি নাড়ানোর জায়গা কমে যায়। টেন্ডন, পেশি বা ঘিরে থাকা টিস্যু যদি কাঁধের হাড়গুলোর মধ্যে চাপে পড়ে থাকে তাহলে বার বার নাড়ানোর ফলে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। টেন্ডোনাইটিস ও বারসাইটিস প্রায়ই এক সাথে হয়। টেন্ডন ও বারসা হাড়ের মাঝখানে আঁটকে গেলে তাকে ইম্পিঞ্জমেন্ট সিনড্রোম (impingement syndrome) বলে। বারবার কাঁধের হাড়ের সাথে ঘষা খেলে এটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে বা ছিঁড়ে যেতে পারে।

ছিঁড়ে যাওয়া (Tears) – পেশি বা টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়ার কারনে তীব্র ব্যাথা হয় এবং এতে হাত ও কাঁধ দুর্বল হয়ে যায়। কারো কারো এই অবস্থায় হাত নাড়ালে এক ধরনের হাড় ভাঙ্গাধরনের অনুভুতি (a popping sensation) হতে পারে। টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়াটা ৪০-এর বেশি বয়সের লোকেদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এর কমবয়সীদের মধ্যে টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়াটা দুর্ঘটনার কারনে হয়। বয়স্কদের মধ্যে ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে ইম্পিঞ্জমেন্ট সিনড্রোমের কারনে। ধারনা করা হয় যে ষাটোর্ধ ব্যাক্তিদের অর্ধেকেরই রোটেটর কাফ আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে ছিঁড়ে যেতে পারে। বয়সের কারনে টেন্ডন দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারনে এটি হয়।

রোটেটর কাফ সিনড্রোম (Rotator cuff syndrome)

রোটেটর কাফের টেন্ডন সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যাওয়া সহ যেকোনো ধরনের ক্ষতি বর্ণনা করার জন্য রোটেটর কাফ সিনড্রোম কথাটি ব্যবাহার করা হয়।

শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটি (Shoulder instability)

কাঁধের জয়েন্ট হছে এক ধরনের বল-এবং-সকেট জয়েন্ট (ball-and-socket joint)। হাতের উপরের অংশ (humerus) হচ্ছে বল যা শোল্ডার ব্লেডের (shoulder blade) সকেটের সাথে সংযুক্ত থাকে।

শোল্ডার জয়েন্টের বল অংশটি সকেটের ভেতর ঠিকভাবে না নাড়ানো গেলে শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটি হয়। এসময় কাঁধে একধরনের খুলে পড়ে যাওয়ার মত অনুভূতি (slipping or “catching” feeling) থেকে শোল্ডার ডিসলোকেশনের মত ঘটনা ঘটতে পারে, যেখানে বলটি সকেট থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসে।

শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটির উপসর্গগুলো বেশ ক্ষীণ হতে পারে। শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটিতে আক্রান্ত মানুষ হাত অবশ হয়ে যাওয়া ধরনের বিভিন্ন অসুবিধার কথা বলেনঃ

ঝিঁঝিঁ ধরে যাওয়া (tingling)

দুর্বল লাগা (weakness)

অসাড় লাগা (numbness)

শোল্ডার ফ্যাটিগ (shoulder fatigue)

ক্লিক করা, আঁটকে যাওয়া বা বেরিয়ে আসার মত অনুভুতি (clicking, locking or popping sensation)

কাঁধ যদি জায়গা থেকে সরে যায় (যেখানে বলটি সকেট থেকে বেরিয়ে আসে), তাহলে নিম্নোক্ত উপসর্গ দেখা যাবেঃ

তীব্র ব্যাথা

হাতটি দেখেই বুঝা যাবে যে সেটি সঠিক অবস্থানে নেই

পেশিতে খিঁচুনি হবে

ঠিকভাবে নাড়ানো যাবে না

বিভিন্ন ধরনের শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটি

শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটিতে নিচের যেকোনো এক ধরনের হবেঃ

জোরে আঘাত লাগার কারনে কাঁধটি জায়গা থেকে সরে গেলে তীব্র বেদনা দায়ক অবস্থা তৈরি হওয়া

অনেকদিন ধরে আস্তে আস্তে জায়গা থেকে কাঁধটি সরে যাবে

অ্যাকসিডেন্টের ফলে আঘাত লেগে কাঁধ জায়গা থেকে সরে যেতে পারে। সাঁতার কাটা বা কোন কিছু ছুঁড়ে মারার জন্য বার বার হাত নাড়ানোর ফলে ধীরে ধীরে কাঁধ জায়গা থেকে নড়ে যেতে পারে। শোল্ডার ইন্সট্যাবিলিটি সাধারণত ৩৫-এর কম বয়সী লোকেদের হয়।

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডার (Acromioclavicular joint disorders)

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট হচ্ছে কাঁধের সবচেয়ে উপরে থাকা জয়েন্টটি। সম্ভাব্য এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডারগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্টের লিগামেন্টগুলো ছিঁড়ে যাওয়া বা ঢিলে হয়ে যাওয়া। লিগামেন্ট হচ্ছে একধরনের মজবুত টিস্যু যা দিয়ে দুটি হাড় সংযুক্ত থাকে।

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে জায়গা থেকে সরে যাওয়া।


এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডারের উপসর্গঃ

জয়েন্টে ব্যাথা হওয়া

জয়েন্টটি ঠিকভাবে নাড়াতে না পারা

কাঁধের উপরে ব্যাথা হওয়া

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট জায়গা থেকে নড়ে গেলে সেটি খালি চোখে দেখেও বোঝা যাবে।

এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডারের ঝুঁকিসমুহ

২০ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের এক্রোমাইওক্ল্যাভিকুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডার বেশি দেখা যায়। যারা সংঘর্ষপূর্ণ খেলাধুলা করেন তাদের এটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দুর্ঘটনার কারনে কাঁধের উপর ভর দিয়ে পড়ে গেলেও এই সমস্যাটি হতে পারে।

About the author

Maya Expert Team