অস্থিবিদ্যা

ফাইব্রোমায়েলজিয়া- অদৃশ্য ব্যথা

ফাইব্রোমায়েলজিয়া- অদৃশ্য ব্যথা
১২ মে হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিএফএম (ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম) ও এফএম (ফাইব্রোমায়েলজিয়া) দিবস। বিশ্বব্যাপী ২০ জনের মধ্যে প্রায় ১ জন এ রোগে আক্রান্ত হোন । পুরুষদের থেকে মহিলারা ৭ গুণ বেশি আক্রান্ত হন এবং এ সমস্যা মূলত ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে দেখা দেয়। ফাইব্রোমায়েলজিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) ব্যথা, ক্লান্তি এবং অনিদ্রায় (ইনসোমোনিয়া) ভোগেন। এই অসুস্থতার কারণে অতিমাত্রায় আবেগপ্রবন হয়ে পড়া এবং তার থেকে ব্যাক্তি ও সামাজিক সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এ সমস্যায় শরীরের সব জায়গায় ব্যথা হয় যা ক্রমাগতভাবে চলতেই থাকে এবং ব্যথানাশক (পেইনকিলার) দ্বারা তা নিরাময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় । ব্যথার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর অত্যাধিক স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে, এমনকি একটু ছোঁয়া বা স্পর্শের কারনেও ব্যথা হয়ে থাকে । ব্যথা হবার কথা নয় এমন কিছুর কারনে ব্যথা অনুভূত হলে ঐ অবস্থাকে অ্যালোডিনিয়া বলে, যেমন খুবই হালকা ছোঁয়ার কারনে ব্যথা হওয়া । ফাইব্রোমায়েলজিয়ার কারনে ফ্যাটিগ (অতিরিক্ত ক্লান্তি বোধ) সৃষ্টি হয় যা শ্রান্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, ফ্লু- এর মতো অসুস্থতায় যে ধরনের অনুভুতি হয়।

পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও আক্রান্ত ব্যাক্তির ঘুম ভাঙ্গে ক্লান্তি নিয়ে, কারণ এ রোগে আক্রান্তদের ঘুম গভীর হয় না, মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এ রোগে আক্রান্তরা সব কিছু ভুলে যাওয়া এবং স্পষ্টভাবে চিন্তা করার অক্ষমতায় ভুগেন, এটিকে “ফাইব্রো-ফগ” বা “ফাইব্রো-কুয়াশা” বলা হয়। এ রোগে আক্রান্তদের কোন কিছু মনে রাখতে এবং নতুন কিছু শিখতে সমস্যা হয় এবং একই সাথে মনোযোগ ও একাগ্রতা ধরে রাখতেও তাদের কষ্ট হয় । এ সমস্যার সাথে জড়িত আরো কিছু লক্ষণ বা উপসর্গ রয়েছে যেগুলো হলোঃ

  • মাথা ব্যথা
  • আইবিএস (IBS) – পালাক্রমে ডায়রিয়া এবং কোস্টকাঠিন্য হওয়া
  • ব্যথাময় মাসিকের সময় ব্যথা
  • মাথা ঘোরা ও সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলা
  • অত্যাধিক গরম বা অত্যাধিক ঠান্ডা অনুভুত হওয়া- শরীরের তাপমাত্রা সঠিক ভাবে পরিচালিত না হওয়ার কারনে এরকম হয়ে থাকে
  • অনবরত পা নাড়ানোর তাড়না বোধ করা এবং পা নাড়ানো (পায়ের বিশ্রামহীনতা বা অস্থিরতা সিনড্রোম)
  • হাতে ও পায়ে শির শিরে অনুভুতি হওয়া, অবশ বোধ হওয়া অথবা জ্বালা অনুভব করা (প্যারায়েসথেসিয়া) ।
  • বিষন্নতা- সবসময় মন খারাপ থাকা, আশাহত ও অসহায় বোধ হওয়া এবং যেসব জিনিস বা কাজ আগে ভাল লাগত সেসবের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা

কিছু কিছু ব্যক্তি কেন ফাইব্রোমায়েলজিয়াতে আক্রান্ত হোন তা এখনো অস্পষ্ট। এর সুনিশ্চিত কারণ অজানা, তবে এর পিছনে কিছু ফ্যাক্টর বা কারন জড়িত থাকতে পারে। মস্তিষ্কে ব্যথার ভুল বার্তা যেতে পারে বা মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদান সমুহের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে ফাইব্রোমায়েলজিয়াতে আক্রান্তদের মস্তিষ্কে  সেরোটনিন, নোরাড্রেনালিন ও ডোপমিন নামক হরমোন অস্বাভাবিক কম পরিমাণে উপস্থিত থাকে।

ফাইব্রোমায়েলজিয়া সৃষ্টি হওয়ার পিছনে উক্ত হরমোনগুলোর কম মাত্রায় উপস্থিত একটি অন্যতম কারন হতে পারে, কেননা মানসিক অবস্থা, ক্ষুধা, ঘুম, ব্যবহার এবং দুঃখজনক পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া কেমন হবে প্রভৃতি এই হরমোনগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। শারীরিক এবং মানসিক চাপ তৈরি হয় এমন পরিস্থিতির কারনেও ফাইব্রোমায়েলজিয়া হতে পারে, যেমন-

  • আহত হওয়া
  • ভাইরাসগত সংক্রমণ
  • শিশু প্রসব
  • অস্ত্রোপচার হওয়া
  • সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া
  • অপমানকর কোন সম্পর্কে থাকতে বাধ্য হওয়া
  • প্রিয় মানুষের মৃত্যু


ফাইব্রোমায়েলজিয়া নির্ণয়ের
শর্তসমূহ
ফাইব্রোমায়েলজিয়া নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হতে হবে। নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শর্তসমূহ হলোঃ

  • শরীরের তিন থেকে ছয়টি পৃথক স্থানে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া, বা সাত অথবা ততোধিক স্থানে হালকা ব্যথা থাকা
  • লক্ষণ বা উপসর্গ সমূহ একই রকম ভাবে কমপক্ষে ৩ মাস থাকা
  • উপসর্গ সৃষ্টি হওয়ার পিছনে অন্য কোন কারন খুঁজে পাওয়া না যাওয়া

কিছু কিছু নির্দিষ্ট “নরম জায়গা বা স্থান”, যেখানে ব্যথা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়, সেখানে মৃদু চাপ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যথার মাত্রা বোঝার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি বর্তমান ততোটা চালু নয়।


চিকিৎসা পদ্ধতি
ফাইব্রোমায়েলজিয়ার কোন চিকিৎসা নেই, তবে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে কয়েকটি উপসর্গ নিরাময় ও জীবনের মান উন্নত করা যায় । এ সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদেরকে পেইনকিলার (ব্যাথানাশক), অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ( বিষন্নতা দূরকারী), পেশী শিথিলকারী, খিঁচুনি দূরকারী প্রভৃতি ঔষধ প্রদান করা হয়। সহায়তাকারী অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হলোঃ

  • সাঁতার কাটা, ওঠা বসার ব্যায়াম করা কিংবা উষ্ণ সুইমিং পুল বা উষ্ণ পানিতে ব্যায়াম করা, এ পদ্ধতি জল চিকিৎসা বা হাইড্রোথেরাপি বা ব্যালনিওথেরাপি নামে পরিচিত।
  • আক্রান্ত ব্যাক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা শরীরচর্চার প্রোগ্রাম
  • কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি)- এটি একটি থেরাপি যা কথা বলার মাধ্যমে পরিচালনা করা হয় । এ থেরাপির মাধ্যমে ব্যক্তির চিন্তা, মনমানসিকতার পরিবর্তন আনয়ন করা হয়, যাতে বিভিন্ন সমস্যা ইতিবাচকভাবে সমাধান করতে আক্রান্ত ব্যক্তি সক্ষম হোন ।
  • সাইকোথেরাপি- কথা বলার মাধ্যমে পরিচালিত একটি থেরাপি যা ব্যক্তির চিন্তা, অনুভব বুঝতে এবং এগুলোর সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে ।
  • আরাম বা শরীর শিথিলকরণ পদ্ধতি
    ফিজিওথেরাপি – পেশীর কাঠিন্য বা দুর্বলতা প্রভৃতি শারীরিক সমস্যা নিরাময়ের জন্য ম্যাসাজ গ্রহণ করা যেতে পারে ।
    সাইকোলজিক্যাল বা মানসিক সহায়তা- ফাইব্রোমায়োলোজি সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে যেকোন ধরনের কাউন্সেলিং গ্রহণ।
  • নিজেকে নিয়ন্ত্রণ
    যদি আপনি ফাইব্রোমায়েলজিয়াতে আক্রান্ত হোন, তাহলে আপনাকে কাজ এবং বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য আনা শিখতে হবে। এর অর্থ হলো আপনি কতটুকু কাজ করতে পারবেন, নিজেকেই সেই সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং নিয়মিত বিরতিতে বিশ্রাম নিয়ে সেই কাজ করতে হবে। কোনভাবেই নিজের কাজের সীমা অতিক্রম করা যাবে না বা অতিরিক্ত কাজ করা যাবে না

যদি আপনি কাজের পরিমাণ কমাতে না পারেন, তা দীর্ঘ মেয়াদে আপনার নিরাময়কে ব্যাহত করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে কাজের পরিমাণ আপনি বাড়াতে পারেন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম গ্রহণের মাধ্যমে কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

যদি আপনি ফাইব্রোমায়েলজিয়াতে আক্রান্ত হোন, মাঝে মাঝে এমন সময় আসবে যখন আপনার উপসর্গ গুলো অন্যদের তুলনায় অনেক কম থাকবে, এই সময়টাতে অতিরিক্ত কাজ করতে যাবেন না। কাজের পরিমাণ না বাড়িয়ে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন, নিজের শরীর কি বলে তার কথা শুনুন, শরীরের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করুন এবং শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিন। যেকোন ধরনের ব্যায়াম বা কাজ, যা আপনার ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয় তা করা থেকে বিরত থাকুন। কেননা এগুলো আপনার উপসর্গ আরো বাড়িয়ে দিবে। আপনার সুবিধা অনুসারে কাজ করার পরিমাণ ঠিক করে নিন এবং স্বল্প সময়ে যতটুকু সম্ভব কাজ করার চেষ্টা বাদ দিন, তাহলে আপনি দ্রুত সুস্থ হতে পারবেন ।

About the author

Maya Expert Team