চোখ ওঠা/কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস- চিকিৎসা

সাধারণত অ্যালার্জির কারনে বা চোখের ভেতর পাপড়ি বা এরকম কিছু ঢুকে গেলে অথবা সংক্রমণের কারণে চোখ ওঠে। চোখ ওঠার চিকিৎসা কেমন হবে তা নির্ভর করে কি কারনে চোখ উঠেছে তার উপর।

সংক্রমণের কারনে চোখ উঠলে:
এ ধরণের চোখ ওঠার আলাদা কোন চিকিৎসা নেই; সাধারণত এটি ২/১ সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়।

নিজের যত্ন

আপনি নিজে থেকেই নানা ভাবে সংক্রামনের কারনে চোখ ওঠার চিকিৎসা করতে পারেন।যেমনঃ

  • আপনার কনট্যাক্ট লেন্স খুলে ফেলুন এবং পুরোপুরি সুস্থ হবার আগ পর্যন্ত লেন্স ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন। সুস্থ হবার পর পুরনো লেন্স ব্যাবহার না করাই ভাল কারন এর থেকে আবার সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। এক দফা ট্রিটমেন্ট শেষ করার পরবর্তি ২৪ ঘণ্টা লেন্স ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • লুব্রিকেন্ট চোখের ড্রপ ব্যাবহার করুন। এগুলো আপনি যেকোনো ফার্মেসিতে পাবেন। এ ধরণের ড্রপ আপনার চোখের চটচটে ভাব এবং অস্বস্তি প্রশমিত করে। সবসময় প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাবহার করুন। আপনি প্রেস্কিপশন ছাড়াও এই ড্রপ কিনতে পারবেন।
  • যত্ন সহকারে সুতি কাপড় বা তুলা পানিতে ভিজিয়ে চোখের পাতা এবং পাপড়ি থেকে পিঁচুটির মত চটচটে পদার্থ পরিষ্কার করুন।
  • সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত হাত ধোয়া উচিত; বিশেষ করে আক্রান্ত চোখে হাত দেয়ার পর। এতে করে অন্যদের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কমে যায়।


অ্যান্টিবায়োটিক
সংক্রমণের কারনে চোখ উঠলে সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। কারন এটি অধিকাংশ সময় নিজে থেকেই সেরে যায় এবং চিকিৎসা না করালেও তেমন কোন ঝুঁকি থাকে না। তবে সংক্রমণের মাত্রা যদি অনেক বেশি হয় বা ২ সপ্তাহের বেশি সময় আক্রান্ত থাকেন তাহলে আপনার ডাক্তার আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। কিছু স্কুল এবং কিন্ডারগার্টেন আক্রান্ত শিশু কেবল অ্যান্টিবায়োটিক নেয়ার পরই ওকে স্কুলে আসতে দেয়, তবে এর প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে।

সাধারণত এই ২ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়ঃ

-ক্লোরাফেনিকল(chloramphenicol)
-ফিউসিডিক অ্যাসিড(fusidic acid)

ক্লোরাফেনিকল(Chloramphenicol)
অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হলে সাধারণত চোখের ড্রপের মাধ্যমে ক্লোরাফেনিকলই দেয়া হয়। তবে আপনার চোখের ড্রপ ব্যাবহার করতে সমস্যা হলে এর পরিবর্তে আপনাকে চোখের মলম দেয়া হতে পারে। চোখের ড্রপ ব্যাবহারের আগে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন অথবা ওষুধের সাথে দেয়া লিখিত ব্যাবহারবিধি ভালভাবে পড়ে নিন।

ফিউসিডিক অ্যাসিড(Fusidic acid)
আপনার জন্য ক্লোরাফেনিকল উপযুক্ত না হলে আপনাকে ফিউসিডিক অ্যাসিড দেয়া হতে পারে। সাধারণত শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্ক ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে ফিউসিডিক অ্যাসিড ব্যাবহার করা হয়। ক্লোরাফেনিকলের মত এটিও একটি চোখের ড্রপ।


পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া
চোখের ড্রপ ব্যাবহারের ফলে সাময়িকভাবে দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যেতে পারে; তাই ড্রপ দেয়ার সাথে সাথে গাড়ি চালানো বা কোন প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন। ক্লোরাফেনিকল এবং ফিউসিডিক অ্যাসিড ব্যাবহারের ফলে অল্প সময়ের জন্য চোখে সামান্য জ্বালাপোড়া হতে পারে।

২ সপ্তাহের বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকলে বা নিচের উপসর্গগুলোর কোনটি দেখা দিলে অনতিবিলম্বে আপনার চোখের ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন;

  • চোখে ব্যাথা
  • আলোর প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা (ফটোফোবিয়া)
  • দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়া
  • এক বা দুই চোখই অতিরিক্ত লাল হয়ে গেলে

আপনার ডাক্তার আপনাকে যৌনবাহিত সংক্রমণের (STI) পরিক্ষা করাতে বলতে পারেন। ক্ল্যামিডিয়ার মত কিছু STI-এর কারনে চোখ উঠতে পারে; সেক্ষেত্রে আপনাকে বেশ কয়েক মাস ভুগতে হতে পারে।


অ্যালার্জির কারনে চোখ ওঠা
আপনার কিসের প্রতি অ্যালার্জির কারনে চোখ উঠেছে তার ওপর নির্ভর করে আপনার চিকিৎসা কেমন হবে। সাধারনত এই চার ধরনের অ্যালারজির কারনে চোখ ওঠে;

  • পরাগ রেণুতে অ্যালার্জির কারনে (সিযোনাল কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস)
  • ধুলা বা পোষা প্রাণীর প্রতি অ্যালার্জির কারনে (পেরেনিয়াল কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস)
  • চোখের ড্রপ বা প্রসাধনীর অ্যালার্জির কারনে (কন্ট্যাক্ট কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস)
  • কন্ট্যাক্ট লেন্স এ অ্যালার্জির কারনে (জায়ান্ট প্যাপিলারি কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস)

নিজের যত্ন
অ্যালার্জির কারনে চোখ উঠলে আপনি ঘরে বসেই নিম্নলিখিত পরামর্শগুলো মেনে নিজের যত্ন নিতে পারবেন;

  • আপনার কনট্যাক্ট লেন্স খুলে ফেলুন এবং পুরোপুরি সুস্থ হবার আগ পর্যন্ত লেন্স ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • চোখ চুলকালেও চেষ্টা করুন চোখে হাত না দিতে। কারন চোখ চুলকালে আপনার চোখের অবস্থার আরও অবনতি হবে।
  • ঠাণ্ডা কিছু দিয়ে চোখ ঢেকে রাখুন।
  • ফ্লানেলের কাপড় ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে চোখে চেপে রাখলে আরাম পাবেন।
  • অ্যালার্জির উৎস এড়িয়ে চলুন।
  • সিজোনাল কঞ্জাঙ্কটিভাইটিস


পরাগ রেনু, ধুলা ও পোষা প্রাণীতে অ্যালার্জির কারনে চোখ ওঠা(Seasonal and perennial conjunctivitis)
আপনার এসব অ্যালার্জির কারনে চোখ উঠলে আপাকে নিম্নলিখিত ওষুধগুলো দেয়া হতে পারে;

  • অ্যান্টিহিস্টামিন(antihistamines)
  • মাস্ট সেল স্ট্যাবিলাইযার (mast cell stabilisers)
  • করটিকোস্টেরয়েড(corticosteroids)

অ্যান্টিহিস্টামিন
দ্রুত আরোগ্যের প্রয়োজন হলে সাধারণত ডাক্তার অ্যান্টিহিস্টামিন খেতে দেন। অ্যান্টিহিস্টামিন অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া প্রতিহত করে। আপনি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিহিস্টামিন চোখের ড্রপ হিসেবে দিতে পারেন বা ওষুধ হিসেবে খেতে পারেন। সাধারণত দিনে একবার অ্যান্টিহিস্টামিন নিলেই চলে। আপনি গর্ভবতী হলে বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে থাকলে আপনার অ্যান্টিহিস্টামিন না খাওয়াই ভাল। এ বিষয়ে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

যদিও এখনকার অ্যান্টিহিস্টামিন খেলে ঘুম আসার কথা না তবুও ঘুমঘুম লাগতে পারে। বেশি অ্যান্টিহিস্টামিন খেলে বা খাওয়ার পর মদ্যপান করলে আরও বেশি ঘুম আসবে।

মাস্ট সেল স্ট্যাবিলাইযার
মাস্ট সেল স্ট্যাবিলাইযার অ্যান্টিহিস্টামিনের মত দ্রুত স্বস্তি না দিলেও এটি লম্বা সময় ধরে কার্যকরভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি কাজ করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে; সেক্ষেত্রে এর সাথে আপনাকে অ্যান্টিহিস্টামিনও দেওয়া হতে পারে।

করটিকোস্টেরয়ড
আপনার অ্যালার্জির মাত্রা অনেক বেশি বেড়ে গেলে আপনাকে অল্প সময় বাহ্যিক ব্যাবহারের জন্য করটিকোস্টেরয়ড(ক্রিম,জেল বা অয়েন্টমেন্ট) দেয়া হতে পারে। তবে একেবারেই প্রয়োজন না হলে এগুলো দেয়া হ্য় না।


কন্ট্যাক্ট লেন্সে অ্যালার্জির কারনে চোখ ওঠা (
Giant papillary conjunctivitis)
যেহেতু এটি কন্ট্যাক্ট লেন্সের কারনে হয় তাই লেন্স পরা বন্ধ করে দিলে অনেক সময় এটি ঠিক হয়ে যায়। তবে চোখের উপরের পাতায় যে দাগগুলো হয় সেগুলো কিছুদিন থাকতে পারে। চোখে সার্জারির কিছুদিনের মধ্যে চোখ উঠলে অবিলম্বে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন যাতে তিনি আপনার চোখের অবস্থা ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং কার্যকর চিকিৎসা দিতে পারেন।


কোন প্রকার উত্তেজকের কারনে চোখ উঠলে (
Irritant conjunctivitis)
এরকম চোখ ওঠার ক্ষেত্রে সাধারণত কোন চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না কারন উত্তেজক পদার্থটি বের করে ফেলতে পারলেই অধিকাংশ সময় চোখ পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে চোখে অ্যাসিড বা ব্লিচের মত অত্যন্ত ক্ষতিকর কিছু লাগলে স্যালাইন দ্রবণ দিয়ে আপনার চোখ পরিষ্কার করানোর জন্য আপনাকে সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।