অনকোলজি স্তন ক্যান্সার

স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে যা জানা উচিত

Written by Maya Expert Team

আমাদের সবার জীবনে এমন কাউকে না কাউকে আমরা চিনি, যিনি জীবনযাপনের সব নিয়ম সঠিকভাবে মেনে চলার পরেও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। স্তন ক্যান্সারের জিন যা বংশানুক্রমে আপনার শরীরে চলে আসতে পারে, তা এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে অনেক কিছুই আমরা করতে পারি। নিচে যে ব্যাপারগুলো আপনার খেয়াল রাখতে হবে এবং যে কাজগুলো আপনার করতে হবে তা দেয়া হল:

১। নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ভাবে পরীক্ষা করানো ম্যামোগ্রাম করানোর মতই জরুরী- আপনার বয়স ৪০ বছর হয়ে গেলেই প্রতি বছর ম্যামোগ্রাম করানো অত্যন্ত দরকারি। যদি আপনার পরিবারে কারো স্তন ক্যান্সার থেকে থাকে, বা আপনার স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা আছে এমন লক্ষণ দেখা দেয় তবে ৪০ হওয়ার আগেই পরীক্ষা করানো শুরু করুন। ম্যামোগ্রাম স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একেবারে আদর্শ পদ্ধতি নয়, বিশেষ করে ভারী স্তনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। তাই বাৎসরিক ভিত্তিতে চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা করানো দরকার। কিছু কিছু স্তন ক্যান্সার ম্যামোগ্রামে ধরা পড়ে না, আবার কিছু কিছু ক্যান্সার যেমন ডাক্টাল সার্সিনোমা সাথে সাথেই ধরা পড়ে। তাই ম্যামোগ্রাম এবং স্ক্রিনিং উভয়ই করানো দরকার।

২। নিজে পরীক্ষা করে দেখা- নিয়মিত নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করাটা জরুরী, বিশেষ করে প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা করা উচিত। যদিও এটা একেবারে সঠিক পদ্ধতি নয়, তবু আপনি বুঝতে পারবেন কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা অস্বাভাবিক। আর অস্বাভাবিক কিছু হলেই আপনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারবেন। আপনার শরীরে কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা অস্বাভাবিক তা চিকিৎসকের চাইতে আপনি ভাল বুঝতে পারবেন যদি আপনি ব্যাপারটা খেয়াল রাখেন।

৩। ম্যামোগ্রামে ক্যালসিফিকেশন দেখা দিলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই – ক্যালসিফিকেশন বা স্তনে ক্যালসিয়ামের স্থান পরিবর্তন বয়সের সাথে সাথে হয়ে থাকে এবং এটা তেমন ক্ষতিকর নয়। ম্যামোগ্রামে এটা সাদা চিহ্নের মত দেখায়। সাধারণত বড় হলে এরা তেমন ক্ষতিকর হয় না। ছোট কিন্তু এবড়ো-খেবড়ো চিহ্ন ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে ছোট কয়েকটি চিহ্নকে যদি রৈখিক ভাবে একসাথে দেখা যায় সেটা খুবই সন্দেহজনক। রেডিওলজিস্টদের পক্ষেই বলা সম্ভব চিহ্নটি ক্যালসিফিকেশন নাকি জমাট বাধা পিণ্ড। পিণ্ড ধরা পড়লে নিশ্চিত হওয়ার জন্যে আপনার চিকিৎসক আপনাকে বায়োপসি করতে বলবেন। প্রাথমিক এবং ফলোআপ ম্যামোগ্রামের মাঝের সময়টা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার- তাই বেশীরভাগ নারীরাই একটু সময় নিয়ে ফলোআপ ম্যামোগ্রাম করান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোন সমস্যাই হয়নি।

৪। কর্মঠ নারীদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার এবং স্তন ক্যান্সারে মৃত্যু হওয়ার আশংকা কম- রিসার্চে দেখা গেছে যে কর্মঠ নারীদের অস্ট্রোজেনের মাত্রা কম থাকে। ব্যায়াম শরীরে অস্ট্রোজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, আর এর মাত্রা শরীরে বেড়ে গেলে তা স্তন ক্যান্সারের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। যেসব নারীরা অ্যারোবিক চর্চা করেন তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্য নারীদের চাইতে ৫৫ শতাংশ কম হয়। তাই আজই ব্যায়াম শুরু করুন।

৫। ফলিক এসিড গ্রহণ- অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে যে স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তা ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের ফলে কমে যায়। যেসব নারীরা দিনে ২ বেশী অ্যালকোহল গ্রহণ করেন তাদের ২৫% এর বেশী ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপনার খাবারে যদি ফোলেট থাকে, তবে তা অ্যালকোহলের প্রভাবকে কমিয়ে দেয়। পাতাযুক্ত সবুজ সবজী, শিম, শিমের বিচি, শাক- এসব খাবারে প্রচুর ফোলেট থাকে।

৬। মেনোপজের পর অতিরিক্ত ওজন ঝুঁকিপূর্ণ- ওবেসিটি বা অতিরিক্ত ওজন সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্তন ক্যান্সারের মত রোগের কারণ। তবে স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে মেনোপজ পরবর্তী অতিরিক্ত ওজনই বেশী ক্ষতিকর কারণ এতে অতিরিক্ত অস্ট্রোজেন তৈরি হয়। অতিরিক্ত অস্ট্রোজেন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ১০ পাউন্ড ওজনও যদি কমানো যায়, তাও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।

৭। পিণ্ড থাকা মানেই ক্যান্সার নয়- প্রত্যেক নারীর স্তনেই প্রত্যেক মাসে পিণ্ড দেখা যায় যেটা আবার চলে যায়। এটা ভীতিকর হলেও ক্ষতিকর নয়। এটাকে ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ বলে, এটা সাধারণত ক্যান্সারে পরিণত হয়না, নিজে নিজেই চলে যায়। যেসব নারীদের ফাইব্রোসিস্টিক স্তন আছে তাদের উচিত নিজেই পরীক্ষা করার পাশাপাশি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানো।

৮। ব্যথা হওয়া মানেই ক্যান্সার নয়- শেষ পর্যায়ের আগে ব্যথা হওয়া কখনোই স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ নয়। হরমোনের পরিবর্তনের জন্য, ক্ষতিকর নয় এমন সিস্ট, লিগামেন্টে চাপ পড়ার ফলেও ব্যথা হতে পারে। স্তন ক্যান্সারের অন্যান্য লক্ষ্যগুলোর দিকেও খেয়াল রাখুন।

৯। ভারী স্তনের নারীদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪ গুন বেশী- ভারী স্তনের ক্ষেত্রে কোষ গঠন হয় দ্রুত । এতে অস্বাভাবিক কোষ গঠনের সম্ভাবনা থাকে, যা ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে। এক্ষেত্রে ম্যামগ্রামের পাশাপাশি আলট্রা-সনোগ্রাম করা উচিত।

১০। প্রতি ৮ জনে ১জন নারী স্তন ক্যান্সারে প্রভাবান্বিত হননি- এই পরিসংখ্যান জীবনকালের উপর নির্ভর করে। ধরে নেয়া হয় আপনার জীবনকাল ৮৫ বছর বা তার ঊর্ধ্বে হবে। ৪০ বছর বয়সে,একজন নারীর ৬৯ বারে ১ বার স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর ১০ বছর পরে, ৫০ বছর বয়সে সেই ঝুঁকিটা চলে আসে প্রতি ৪২ বারে ১ বার। ৬০ বছরে সেটা দাঁড়ায় প্রতি ২৯ বারে ১ বার। আবার ৭০ বছর বয়সে তা হয়ে যায় প্রতি ২৭ বারে ১ বার। পরিসংখ্যানে ফেললে নারীরা তাদের ৭০-৮০ বছর বয়সে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু এই সময়েই এর থেকে আরোগ্য লাভের হারও বেশী। কারণ এই সময়ে যে স্তন ক্যান্সার হয় তা সাধারণত কম ক্ষতিকর পর্যায়ে থাকে এবং এর চিকিৎসা সহজ হয়।

১১। স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস মানেই ক্যান্সার হবে এমনটা নয়- শুধুমাত্র ২০-৩০% স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস আছে। আর বিআরসিএ-১ অথবা ২ এর অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায় আরও কম সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে।

১২। দ্রুত ধরা পড়লে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ সম্ভব- একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে যেটাকে ধাপ- ০ এবং ধাপ- ১ বলা হয়, সে পর্যায়ে সনাক্ত হলে আরোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা ১০০ ভাগ, দ্বিতীয় ধাপে সেই সম্ভাবনা ৮৬ শতাংশ। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করতে নিয়মিত স্ক্রিনিং করা দরকার।

১৩। আপনার ঝুঁকি বাড়ে যেসব কারণে- পারিবারিক ইতিহাস ছাড়াও কিছু এড়ানো সম্ভব এমন এবং এড়ানো সম্ভব নয় এমন কিছু কারণ আছে যা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আপনার জীবনযাত্রা, পূর্বের রোগ সংক্রান্ত সকল তথ্য আপনার চিকিৎসককে জানানো উচিত। তবেই আপনার চিকিৎসক আপনাকে সঠিক সময়ে সঠিক স্ক্রিনিং করাতে পারবেন।

১৪। আপনার বাবার অথবা ভাইয়ের প্রোস্টেট ক্যান্সার আপনার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ- আপনার বাবা অথবা ভাইয়ের প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার মানে হচ্ছে আপনার বংশে বিআরসিএ-১ অথবা ২ এর জিন আছে। আপনার বাবার পরিবারে এই জিন থাকতে পারে, পরিবারে নারীদের স্তন ক্যান্সার ও ওভারিয়ান ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে এটা আরও নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

১৫। একই সাথে এমআরআই এবং ম্যামোগ্রাম করানোর সুবিধা- অনেক সময় ছোট ছোট পিণ্ড বা দলা ম্যামোগ্রামে ধরা পড়েনা। পরে এই পিণ্ডগুলো অস্বাভাবিক কোষ বিভাজনের মাধ্যমে বাড়তেই থাকে যা টিউমারে পরিণত হয়। যাদের স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস আছে তাদের ক্ষেত্রে এটা করাতে হতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অ তত্ত্বাবধান অনুযায়ীই এমআরআই করানো উচিত।

১৬। বিআরসিএ-১ যাদের আছে, তাদের ডিম্বাশয় অপসারণে ঝুঁকি ৫০% কমে যায়- ডিম্বাশয় থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়, তাই অপসারণের ফলে এসব হরমোন নিঃসরণ কমে যায়। যদি আপনার হিসটেরেক্টমি( গর্ভাশয় এবং ডিম্বাশয় অপসারণ) করানো হয়ে থাকে তবে আপনার ঝুঁকি একেবারেই কমে গেছে।

১৭। কিছু ঔষধ সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে- ট্যামক্সিফেন বন্ধ্যত্ব এবং স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় এমন একটি ওষুধ। এটি অস্ট্রোজেন নামক হরমোনের গ্রহণ বন্ধ করে। এতে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমে আসে। এই ওষুধগুলো ৫ বছর ধরে ব্যবহার করতে হতে পারে, এর ফলাফল পরবর্তী ১০ বছর ধরে কার্যকর থাকে। এই ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। কিন্তু স্তন ক্যান্সার রোধে এটুকু ঝুঁকি নেয়াই উচিত।

১৮। স্তন ক্যান্সার একা একটি রোগ নয়- বিভিন্ন ধরনের স্তন ক্যান্সার বিভিন্ন কারণে হয়। কোনটা অস্ট্রোজেন এর কারণে হয়, কোনটা অস্ট্রোজেনের রিসেপ্টরের অভাবে হয়। আবার কোনটা কোন বিশেষ ধরনের প্রোটিনের কারণে হয়।

১৯। স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা মানেই কেমোথেরাপি নয়- অনেক ক্ষেত্রে পিণ্ড বা জমাট বাধা দলাটি অপসারণের মাধ্যমেই চিকিৎসা সম্ভব। এরপর পিণ্ডটি পরীক্ষা করে দেখা হয়। স্তনের পেশিতেই সীমাবদ্ধ থাকলে কেমোথেরাপির প্রয়োজন নেই।

২০। ৩০ বছরের নিচে হওয়া পিণ্ড সাধারণত ক্ষতিকর হয়না এবং সার্জারি প্রয়োজন হয়না- যদি আপনি স্তনের পিণ্ডটি নড়াচড়া করে তবে একে ফাইব্রোএডেনোমা বলে। এটা সময়ের সাথে সাথে নিজেই ঠিক হয়ে যায়, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা লাগে না।

About the author

Maya Expert Team