অনকোলজি জরায়ুমুখ ক্যান্সার

জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জটিলতা

Written by Maya Expert Team

জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জটিলতা দুই ধরনের হতে পারে

  1. ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার কারনে তার থেকে সৃষ্ট জটিলতা
  2. ক্যান্সারের চিকিৎসা থেকে সৃষ্ট জটিলতা

নিচে এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হলো

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

  • নির্দিষ্ট বয়সের আগেই মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া (early menopause)

জরায়ু মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসায় যদি অপারেশনের সময় আপনার ডিম্বাশয় কেটে বাদ দেয়া হয় বা রেডিয়থেরাপি দেয়ার কারনে যদি ডিম্বাশয় ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তাহলে নির্দিষ্ট বয়সের আগেই আপনার মাসিক বন্ধ হয়ে যাবে। প্রাকৃতিক নিয়মে সাধারণত ৫০ বৎসরের পর মাসিক বন্ধ হয়, এক্ষেত্রে আপনার বয়স যাই হোক, চিকিৎসার পর পরই আপনার মাসিক বন্ধ হয়ে যাবে।

এস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন নামক দুইটি হরমোন ডিম্বাশয় থেকে তৈরি হয়, এই হরমোন দুইটি মাসিক নিয়ন্ত্রন করে, এদের অভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। এই হরমোন দুইটির অভাবে যে সমস্থ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তা হলো-

  • মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘ বিরতিতে অনিয়মিত হয়ে পড়া
  • যোনিপথ শুকিয়ে যাওয়া
  • হট ফ্লাস (hot flushes) – এতে হটাৎ করে অস্বাভাবিক গরম লাগতে শুরু করে, বিশেষ করে মুখমণ্ডলে, ঘাম হয়, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়, বুক ধড়ফড় করে, কারো কারো মনে হয় এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে – ২/৩ মিনিট স্থায়ী হয়।
  • মেজাজের দ্রুত পরিবর্তন
  • যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
  • হাঁচি কাশির সময় কিছুটা প্রস্রাব হয়ে যাওয়া
  • রাতের বেলা ঘাম হওয়া
  • হাড় পাতলা হয়ে ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া

ওষুধের মাধ্যমে এই লক্ষণগুলোকে প্রশমিত করা যায়। এই ওষুধ শরীরকে এস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোন তৈরি করতে উদ্দীপ্ত করে। এই চিকিৎসাকে বলা হয়, হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (hormone replacement therapy বা HRT)।

 

  • যোনিপথ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া

জরায়ু মুখের ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি ব্যবহারের কারনে অনেক সময় যোনিপথ সংকীর্ণ হয়ে যায়, যার কারনে অনেকসময় যৌনমিলন কষ্টকর ও বেদনাদায়ক হয়ে পড়ে।

যোনিপথ সংকীর্ণ হয়ে পড়লে এর চিকিৎসার দুইটি বিকল্প রয়েছে।

  • প্রথমটি হলো যোনিপথে হরমোন ক্রিম ব্যবহার করা, এতে যোনিপথ আদ্র থাকে এবং যৌনমিলনকে সহজতর করে।
  • দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো যোনিপথে ডাইলেটর ব্যবহার করা। এটি যোনিপথের মাপে তৈরি প্ল্যাস্টিকের একটি বস্তু, দিনের বেলা এটি কয়েকবার যোনিপথে ঢুকিয়ে রাখতে হয়, প্রতিবার ৫ থেকে ১০ মিনিট সময় ভিতরে রাখতে হয়, এভাবে ৬ মাস থেকে ১ বৎসর ব্যবহার করতে হয়। এটি ব্যবহারে যোনিপথ প্রসস্ত হয়।

অনেকেই ডাইলেটর ব্যবহারে অস্বস্তি বোধ করেন। তবে এটি একটি স্বীকৃত বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা। স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞরা এটির ব্যবহার শিখিয়ে দেন।

অনেকসময় দেখা যায়, নিয়মিত যৌনমিলনে কিছুদিন পর মিলনের সময়ের ব্যথা কমে আসে। তবে এটাও ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে যৌন ইচ্ছা ফিরে আসতেই কয়েকমাস সময় লেগে যায়।

  • লিম্ফোএডেমা (lymphoedema)

অনেকসময় জরায়ু মুখের কান্সার অপারেশনের সময় শ্রোণিদেশের কিছু লিম্ফ গ্রন্থিও কেটে বাদ দেয়া হয়। এতে শরীরের স্বাভাবিক লিম্ফ পরিবহনতন্ত্রের সমস্যা তৈরি হয়। লিম্ফ পরিবহনতন্ত্রের একটি কাজ হলো শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করে দেয়া। লিম্ফ গ্রন্থি কমে যাওয়ার কারনে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে যায়, জরায়ু মুখের কান্সারের ক্ষেত্রে পায়ে অতিরিক্ত তরল জমে, পা ফুলে যায়। একে লিম্ফোএডেমা বলে।

 

আবেগজনিত সমস্যা

জরায়ু মুখের কান্সার নিয়ে বেচে থাকা মানুষের মধ্যে আবেগের ব্যপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। যখন প্রথম ক্যান্সার সনাক্ত হয়, তখন সংগত কারনেই ভয়াবহ বিষাদ পেয়ে বসে, আবার যখন চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠে তখন প্রবল আনন্দ হয়। কিন্তু আবার যখন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কষ্ট শুরু হয় তখন সেটা মেনে নেয়াও কঠিন হয়ে যায়।

আবেগের এই চড়াই-উৎরাইের কারনে অনেক সময় হতাশা পেয়ে বসে। তখন জীবনের প্রতি আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়, কিছুই ভাল লাগে না, অসুখের আগে যেসব কিছুতে আনন্দ হত, সেগুলোও আনন্দহীন হয়ে যায়।

ওষুধের মাধ্যমে এই হতাশার চিকিৎসা সম্ভব, সাথে সাইকোথেরাপিরও প্রয়োজন হয়।

ছড়িয়ে পড়া জরায়ু মুখের কান্সার

এক্ষেত্রে যে সমস্থ জটিলতা দেখা দেয়, তা হলো

  • ব্যথা

যদি ক্যান্সার স্নায়ুপ্রান্তে, হাড়ে বা মাংসপেশিতে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তীব্র ব্যথা হতে পারে। ব্যথা কমানোর জন্য এক্ষেত্রে বেশ কিছু ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ব্যথার তীব্রতার উপর নির্ভর করে কোন ধরনের ব্যথানাশক ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রুফেন জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়, ব্যথা তীব্র আকার ধারন করলে অপিওয়েড গ্রুপের কোডিন বা মরফিন ব্যবহার করা হয়।

আপনার যদি ব্যথানাশক ওষুধে ব্যথা না কমে, তাহলে ডাক্তারকে জানান, তিনি হয়তো তখন আরো শক্তিশালী ওষুধ দিবেন। অনেক সময় স্বল্পমেয়াদী রেডিওথেরাপিও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

  • কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়া (kidney failure)

কিডনির কাজ হলো শরীর থেকে দূষিত পদার্থ মুত্রের সাথে বের করে দেয়া। কিডনি ঠিকমত কাজ করছে কিনা তা রক্তে ক্রিয়েটিনিন (serum creatine) এর মাত্রা দেখে বুঝতে পারা যায়। কিডনিতে যে মুত্র তৈরি হয় তা ইউরেটার (ureter) নামক দুইটি নালী দিয়ে মুত্রথলিতে এসে জমে, সেখান থেকে মুত্রনালী দিয়ে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ক্যান্সার বড় হয়ে যদি ইউরেটারের উপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে ইউরেটার বন্ধ হয়ে যায় এবং কিডনি থেকে মুত্র মুত্রথলিতে যেতে পারে না, কিডনিতেই জমতে শুরু করে, ফলে কিডনি ফুলে যায় এবং ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারায়। কিডনির এই ফুলে যাওয়াকে হাইড্রোনেফ্রোসিস (hydronephrosis) বলে।

কিডনি কর্মক্ষমতা হারালে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়-

  1. ক্লান্ত বোধ করা
  2. পানি জমে যাওয়ার কারনে পায়ের গোড়ালী, পায়ের পাতা বা হাত ফুলে যাওয়া
  3. শ্বাসকষ্ট
  4. অসুস্থ বোধ করা
  5. প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া
  • রক্ত জমাট বাধা

অন্যান্য ক্যান্সারের মতো জরায়ু মুখের ক্যান্সারেও রক্ত আঠালো হয়ে যায়, ফলে সহজেই জমাট বেধে যেতে পারে। অপারেশনের পর দীর্ঘসময় শুয়ে থাকার কারনে এবং কেমোথেরাপি নিলেও রক্ত জমাট বাধার সম্ভবনা বেড়ে যায়।

জরায়ু মুখের ক্যান্সার থেকে সৃষ্ট টিউমার বেশি বড় হয়ে গেলে, সেটি শ্রোণিদেশের বড় শিরার উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, ফলে রক্ত প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়, যার কারনে পায়ে রক্ত জমাট বাধতে পারে।

  1. পায়ে রক্ত জমাট বাধলে যে লক্ষণগুলো তৈরি হয়-
  2. যেকোন এক পা বিশেষকরে পায়ের গোছা ফুলে যাওয়া, ব্যথা এবং চাপ দিলে ব্যথা বোধ হওয়া
  3. আক্রান্ত অংশে তীব্র ব্যথা
  4. আক্রান্ত অংশের ত্বক গরম হয়ে থাকা
  5. আক্রান্ত অংশের ত্বক লাল হয়ে যাওয়া বিশেষকরে হাটুর নিচের পিছনের দিকের ত্বক

এই রক্ত জমাট বাধার বড় বিপদ হলো এই জমাট রক্ত, রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে ফুসফুসের সরু রক্তনালীতে আটকে যেয়ে সেই রক্তনালীকে বন্ধ করে দিতে পারে, একে বলা হয় পালমোনারী এম্বোলিজম (pulmonary embolism), যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

রক্ত জমাট বাধার চিকিৎসায় ওষুধ এবং বিশেষভাবে তৈরি মোজা ব্যবহার করা হয় যা আক্রান্ত অংশে চেপে বসে থাকে এবং রক্ত প্রবাহে সাহায্য করে। ওষুধ হিসাবে রক্তকে পাতলা করে এমন ওষুধ যেমন, হেপারিন বা ওয়ারফারিন (heparin or warfarin) ব্যবহার করা হয়।

  • রক্তক্ষরণ

জরায়ু মুখের ক্যান্সার যদি যোনিপথে, অন্ত্রে বা মুত্রথলিতে ছড়িয়ে পরে, তখন সেগুলোতে ক্ষত তৈরি হয়ে সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এই রক্ত যোনিপথে, পায়ুপথে বা মুত্রের সাথে বের হয়ে আসতে পারে।

রক্তক্ষরণ কম হলে ওষুধ যেমন, ট্রানেক্সামিক এসিড (tranexamic acid) ব্যবহার করে তা নিয়ন্ত্রন করা যায়। এই ওষুধ রক্তকে জমাট বাধিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। রেডিওথেরাপিও রক্তক্ষরণ বন্ধে খুবই কার্যকর।

রক্তক্ষরণ বেশি হলে আগের ওষুধের সাথে রক্তচাপ কমিয়ে দেয় এমন ওষুধও দেয়া হয়। রক্তচাপ কমে গেলে রক্তপ্রবাহ কমে যায়, ফলে রক্তক্ষরণও কমে যায়।

  • ফিস্টুলা (fistula)

জটিল আকার ধারন করা জরায়ু মুখের ক্যান্সার আক্রান্তদের প্রতি ৫০ জনে ১ জনের মধ্যে ফিস্টুলা দেখা যায়।

ফিস্টুলা হলো একটি অস্বাভাবিক পথ যা শরীরের দুইটি অংশ বা অঙ্গের মধ্যে তৈরি হয়। জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে যোনিপথ এবং মুত্রথলির মধ্যে এ ধরনের অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়, যার কারনে মুত্রথলি থেকে মুত্র যোনিপথ দিয়ে বের হয়ে আসে। কখনো কখনো যোনিপথ এবং মলাশয়ের মধ্যেও এ ধরনের অস্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হয়।

অপারেশনের মাধ্যমে এই ফিস্টুলা ঠিক করতে হয়, তবে জটিল আকার ধারন করা অনেক জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অপারেশন করা সম্ভব হয় না।

সেক্ষেত্রে ওষুধ, বিভিন্ন ধরনের ক্রিম বা লোশন ব্যবহারের মাধ্যমে নিঃসরণ কমিয়ে যোনিপথ এবং তার আশেপাশের টিস্যুকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা হয়।

  • যোনিপথের স্রাব

জরায়ু মুখের ক্যান্সারের আরেকটি বিব্রতকর এবং যন্ত্রনাকর জটিলতা হলো দুর্গন্ধ যুক্ত যোনিপথের স্রাব।

এটি বিভিন্ন কারনে হতে পারে, যোনিপথের টিস্যু নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারনে, ফিস্টুলা থেকে যোনিপথে মুত্র বা মল এসে গেলে বা কোন সংক্রমনের কারনে।

দুর্গন্ধ যুক্ত যোনিপথের স্রাবের চিকিৎসায় ব্যাকটেরিয়া নাশক জেল (antibacterial gel) যেমন, মেট্রোনিডাজল এবং চারকোল মিশ্রিত অন্তবাস ব্যবহার করতে পরামর্শ দেয়া হয়। চারকোল এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা দুর্গন্ধ শুষে নেয়।

  • প্যালিয়াটিভ কেয়ার (Palliative care)

যদি আপনার ক্যান্সার খুব বেশি অগ্রসর পর্যায়ের হয় এবং তা নিরাময়যোগ্য অবস্থায় না থাকে, তাহলে ডাক্তার চেষ্টা করবেন ওষুধের মাধ্যমে আপনার লক্ষণগুলোকে যতটুকু সম্ভব নিয়ন্ত্রনে রাখতে এবং শারীরিক কষ্ট সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। এটাকে বলা হয় প্যালিয়াটিভ কেয়ার।

প্যালিয়াটিভ কেয়ারে শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া হয়।

ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের চিকিৎসায় আপনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে পারেন বা হাসপাতালেও ভর্তি থাকতে পারেন। হাসপাতালে থাকলে আপনার দৈনন্দিন সমস্যাগুলো নিয়ে ডাক্তারের সাথে আলাপ করার সুযোগ থাকবে।

 

মায়া বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে মায়া এন্ড্রয়েড এপ ডাউনলোড করুন এখান থেকে: https://bit.ly/2VVSeZa

About the author

Maya Expert Team