অনকোলজি জরায়ুমুখ ক্যান্সার

জরায়ু মুখের কান্সারের প্রতিষেধক টিকা

জরায়ু মুখের কান্সারের প্রতিষেধক টিকা

বাংলাদেশে মেয়েদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারন জরায়ু মুখের কান্সার। ‘সারভাইকাল স্মেয়ার টেস্ট’ (cervical smear test) নামক স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব। VIA নামক পরীক্ষার মাধ্যমে আরো নিশ্চিত ভাবে রোগটি নির্ণয় করা যায়। জরায়ু মুখের কান্সার হলো সেই ধরনের ক্যান্সার যা ছড়িয়ে পড়লে পরিনতি ভয়াবহ, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যা নির্ণয় করা সম্ভব এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ হয়ে যায়।

স্ক্রিনিং টেস্টে জরায়ু মুখ থেকে কোষ নিয়ে মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা হয় তাতে কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা।

VIA পরীক্ষায় জরায়ু মুখকে ভিনেগার দিয়ে ভিজিয়ে তার রং পরিবর্তন দেখা হয়। জরায়ু মুখের কোষ সুস্থ স্বাভাবিক থাকলে কোন রং পরিবর্তন হবে না, কিন্তু কোষে যদি কোন অস্বাভাবিকতা থাকে অর্থাৎ ক্যান্সার বা কান্সার এর পূর্বাবস্থা (pre-cancer) থাকে তবে তা সাদা রং ধারন করবে।

জরায়ু মুখের কান্সারের প্রতিষেধক টিকা যখন প্রথম আবিষ্কার হয়, তখন খুব হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। এর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং এই টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে বিখ্যাত মানুষেরা প্রচারণায় নেমেছিলেন। যদিও জরায়ু মুখের কান্সার প্রতিরোধে এই প্রতিষেধক টিকা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, তবুও এ ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে এর সম্পর্কে আরো জেনে নেয়া ভাল।

সারভ্যরিক্স (Cervarix) নামক টিকাটি ৯ থেকে ২৫ বৎসর বয়সী মেয়েদের মধ্যে ব্যাবহারের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত। প্রায় ১৫ প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী। তাদের মধ্যে দুটি প্রজাতি সবচেয়ে বিপদজনক, সে দুইটি হলো, HPV-16 এবং HPV-18। প্রতি ১০টি জরায়ু মুখের ক্যান্সারের মধ্যে ৭টিই এই দুই প্রজাতির সংক্রমনের কারনে হয়ে থাকে। এই টিকা এই দুই প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। এই দুই প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের কারনে সৃষ্ট অসুখগুলো হলো-

  • জরায়ু মুখের ক্যান্সার – সব ধরনের জরায়ু মুখের ক্যান্সারের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ এই দুই প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসের কারনে সৃষ্ট
  • জরায়ু মুখের আবরনের ভিতরে টিউনার (cervical intraepithelial neoplasia -CIN), গ্রেড-২ বা তার চেয়েও খারাপ গ্রেড এবং এডেনোকারসিনোমা (adenocarcinoma)
  • জরায়ু মুখের আবরনের ভিতরে টিউনার (cervical intraepithelial neoplasia -CIN), গ্রেড-১

কিন্তু আরো যে ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ প্রজাতি থেকে ক্যান্সার হতে পারে – তাদের বিরুদ্ধে এই টিকা কোন কাজ করে না।

যে সমস্থ মেয়েরা ইতিমধ্যে যৌনমিলনের মাধ্যমে যে কোন প্রজাতির হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই টিকা কোন কাজ করে না। যারা এই টিকা নিয়েছেন, তাদেরকেও নিয়মিত স্ক্রিনিং টেস্ট করানোর জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কারন শুধু টিকা জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। টিকা নেয়ার পর এটি কার্যকরী হতে ৫ বৎসরেরও বেশি সময় লাগে।

এই টিকার ৩টি ডোজ মাংসপেশীতে দেয়া হয়। প্রথম ডোজ নেয়ার ১ মাস পর ২য় ডোজ এবং ৬ মাস পর ৩য় ডোজ। এই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, মাথা ব্যথা, অবসাদ, বদহজম, মাংসপেশীতে ব্যথা এবং হাড়ের জোড়ায় ব্যথা।

সারভ্যরিক্স (Cervarix) নামক টিকাটি নিজেই কোষের গঠনগত পরিবর্তন (mutation) এবং ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য কতটুকু দায়ী তা এখনও মূল্যায়ন করা হয়নি। মেয়ে ইঁদুরের মধ্যে এই টিকাটির প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট এন্টিবডি তৈরিতে এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করে (immunogenic) এবং প্রজনন ক্ষমতার উপর এর কোন প্রভাব নেই।

গর্ভাবস্থায় হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাস এর টিকা দেয়া নিষেধ। যদিও এটা নিয়ে কোন গবেষণা নাই, কিন্তু দেখা গেছে গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে এই টিকা নিলে গর্ভপাতের সম্ভবনা বেশি থাকে। গর্ভাবস্থায় এই টিকা নিলে, এর ইমিউনিটি (immunity), গর্ভস্থ শিশুর মধ্যে চলে যেতে পারে, তবে এর বিপদজনক দিকটি হলো এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শিশুর গলায় ওয়ারটস (warts) হতে পারে যা তার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা করতে পারে। যদি আপনি এই টিকাটি নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে গর্ভাবস্থা শেষ হবার পর নিন। যে সমস্থ মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তারা এই টিকাটি নিতে পারেন, কারন এটি বুকের দুধের মধ্য দিয়ে শিশুর শরীরে যায় না।

কেউ হিউমেন প্যাপিলমা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকলে, কোনরকম চিকিৎসা ছাড়া শতকরা ৭০ ভাগ ১ বৎসরের মধ্যে তা ভাল হয়ে যায়, আর ২ বৎসরের মধ্যে ভাল হয়ে যায় শতকরা ৯০ ভাগ। বাকী ১০ ভাগের অর্ধেকের জরায়ু মুখের ক্যান্সার হয়। এতে এটাই প্রমানিত হয়, এই রোগ প্রতিরোধে টিকা দেয়ার উপযোগিতা খুবই কম।

সুতরাং এই প্রশ্ন থেকেই যায়, মেয়েদের বা মহিলাদের এই টিকা নেয়া কতটুকু প্রয়োজন?

সিদ্ধান্ত আপনার, তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আপনাকে সমস্থ কিছু জানতে হবে, বুঝে নিতে হবে। জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে নিয়মিত জরায়ু মুখের স্ক্রিনিং, এর টিকার বিকল্প হতে পারে যা টিকার চেয়ে বেশি কার্যকর। নিয়মিত স্ক্রিনিং করালে, জরায়ু মুখের কোষের যে কোন অস্বাভাবিক পরিবর্তন খুব প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, যা জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ নিশ্চিত করে। জরায়ু মুখের স্ক্রিনিং এর সময় ডাক্তার আপনার আরো সব ঝুঁকিপূর্ণ অঙ্গ যেমন, জরায়ু, শ্রোণিদেশের যে কোন টিঊমার, স্তন ইত্যাদি পরীক্ষা করবেন, যা আপনাকে সামগ্রিক ভাবে বাড়তি সুরক্ষা দেবে। জরায়ু মুখের কান্সারের প্রতিষেধক টিকা এবং আপনার শরীরে এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরো জানতে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

মায়া বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে মায়া এন্ড্রয়েড এপ ডাউনলোড করুন এখান থেকে: https://bit.ly/2VVSeZa

About the author

Maya Expert Team